সরকার কথা না শুনলে প্রয়োজনে প্রতিরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ করে বলেন, সংবিধানে সংস্কারের কথা নাই, তাহলে আপনারা ৩১ দফায় লিখেছিলেন কীভাবে? গণভোট চাইলেন কেন? হ্যাঁ ভোটে জনগণকে আহ্বান জানালেন কেন? এসব দ্বিচারিতা, নিজেদের ওয়াদার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং জনগণের রায়কে অস্বীকার, অগ্রাহ্য ও অপমান করা।
শনিবার বিকেলে ঢাকা-১৫ আসনে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব বলেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফার মধ্যে সংস্কার কমিশন গঠন করে সংবিধানের যে আইনগুলোর কারণে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় সেগুলো সংশোধন করবে বলে ঘোষণা করেছে। আমরা এখন যখন সংস্কারের কথা বলি সরকারি দল তখন বলে সংবিধানে তো কোনো সংস্কারের কথা নাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঘরে ও বাইরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আমাদের দায়িত্ব। এটিই সরকারের কাজ। সরকারি দল যারা আছেন তাদের প্রধান দায়িত্ব। বিরোধী দলে যারা আছি তাদের কাজ দেখিয়ে দেওয়া। জনগণের অধিকারের পাহারাদারি করা আমাদের দায়িত্ব। বিরোধী দলের দ্বারা জনগণের অধিকার লঙ্ঘিত হয় না। লঙ্ঘিত হয় সরকারের দ্বারা।
বিজ্ঞাপন
জামায়াত আমির বলেন, সরকার যদি কোনো জায়গায় জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করে, সেই জায়গা ইতিবাচকভাবে ধরিয়ে দিয়ে আমরা সহযোগিতা করব। আমাদের সহযোগিতা যদি সরকার গ্রহণ করে, ধন্যবাদ দেবো। যদি সরকার আমাদের সহযোগিতা গ্রহণ না করে, সংশোধন না হন, মানুষের অধিকার ও ক্ষতি করতেই থাকে, অধিকার কেড়ে নেয়, আমরা তখন প্রতিবাদ করবো, প্রয়োজনে প্রতিরোধ করব। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ইতোমধ্যে জাতীয় জীবনে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বিএনপি বলছে, জনগণ তাদের ৫১ শতাংশ ভোট দিয়েছে। কিন্তু গণভোটে সংবিধানের যেসব আইনের কারণে এতদিন জনগণ অধিকারহারা ছিল, ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, সেই জায়গাগুলো পরিবর্তন করে সংস্কার করার পক্ষে রায় দিয়েছে ৬৮.১ শতাংশ জনগণ। সেই গণভোটের গণরায় ইতোমধ্যে সরকারি দল অস্বীকার করেছে।
সংসদে আলোচনার বিষয় তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘স্পিকার আমাকে নোটিশ দিতে বলেছিলেন। আমি নোটিশ দিয়েছি। গ্রহণ করে ২ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। আশা করেছিলাম আমরা যেভাবে হ্যাঁ ভোট চেয়েছি, তারেক রহমানও সেভাবে চেয়েছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন। আমরা সমর্থন করেছি। ভোটের দিন পর্যন্ত আমরা এক ছিলাম। ভোটের রেজাল্ট হওয়ার পর তারা বদলে গেছে। যখনি তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা যেভাবেই হোক, যে মেকানিজমে হোক লাভ করেন তারপরই তারা অতীতের সব ওয়াদা ভুলে গেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা আশা করেছিলাম স্পিকার সিদ্ধান্ত দেবেন গণভোটের রায় গ্রহণ করা হলো। তা না বলে তিনি বললেন এটি এখানে সমাপ্ত করা হলো। এতে জাতি কষ্ট পেয়েছে। আমরা জাতিকে বলেছিলাম আমরা নির্বাচিত হলে গণভোটে আপনারা যে রায় দেবেন, তা আমরা বাস্তবায়ন করব। যেহেতু সংসদে আমাদের দাবি গ্রাহ্য হয়নি, সেহেতু আবার জনগণের দাবির কথা নিয়ে জনগণের সাথে একাত্ম হয়েছি। আজকে থেকে আন্দোলন শুরু করেছি।
বিজ্ঞাপন
জামায়াত আমির বলেন, বায়তুল মোকাররম থেকে আমাদের দাবি আদায়ে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আমরা চাই না বাংলাদেশে আবার ফ্যাসিবাদ কায়েম হোক। দেশের একজন নাগরিকও চায় না। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।
ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্বর আক্রমণের কারণে বিশ্বে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশেও জ্বালানির উপর প্রভাব পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী আজ নিশ্চয়ই দেখেছেন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাজারো গাড়ির মিছিল। মিছিলে সবগুলো সেখানে স্থবির হয়ে আছে। চাকাগুলো এখন আর ঘুরছে না। কোনো কোনো জায়গায় গাড়িতে তেল নাই, মানুষ দিয়ে টেনে নেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা বিষয়টি যখন জাতীয় সংসদে জানতে চেয়েছি, বলেছি এটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। আমরা এই সমস্যা নিরসনে অবদান রাখতে চাই। খোলামেলা আলোচনা করুন, সত্য কথা বলুন। সমস্যগুলো তুলে ধরুন। আমরা সবাই মিলে সমাধান করবো। তারা না শুনে এমনভাবে বিবৃতি দেন, যেন বাংলাদেশ তেলের উপর ভাসছে।
ডা. শফিক বলেন, বাংলাদেশ ভাসছে না, কিছু লোক যারা বিভিন্ন যুগে এবং এখনো সরকারকে তেল মারে, তারাই তেলের সংকটটি দেখতে দিচ্ছে না। অতীতে অনেকে এই তেলে পিছলে কোমড় ভেঙেছে। আমরা চাই না তারা দেশকে নিয়ে কোনো বিপদে পড়েন। কারণ, দেশের মানুষের কষ্ট আমাদের সবার কষ্ট। আমরা এটির আশু সমাধান চাই। আমরা চাই বহুদলীয় সংলাপ হোক। আমরা সবাই মিলে সহযোগিতা করব।
‘এই সমস্যা সমাধানে সবার আগে আমাদের শিশুদের গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে তিন দিন স্কুল বন্ধ করে ঘরে বসে তারা ডিজিটাল শিক্ষা নেবে। চতুর্থ শ্রেণির একটি শিক্ষার্থী এর জবাব দিয়েছে, আমাদের জবাব দেওয়ার দরকার নেই।’ বলেন জামায়াত আমির।
ডা. শফিক বলেন, আমরা চাই না এক দিনের জন্য ডিজিটাল ক্লাস শুরু হয়ে যাক। তবে বাস্তবতার আলোকে যদি কোনো তেল পাওয়া না যায়, রাস্তার সবকিছু যদি অচল হয়ে যায়, সবশেষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার ব্যাপারে, আগে নয়। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, করোনার সময় একবার মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আবার ভেঙে দেবেন- তা আমরা মানবো না। এজন্য সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মিরপুর পূর্ব থানা আমীর ও ঢাকা-১৫ আসনের সদস্য সচিব শাহ আলম তুহিনের সভাপতিত্বে এবং মো. ইউসুফ আলীর পরিচালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, শরিফ আব্দুর রাজ্জাক, আলহাজ্ব হাফেজ ইউনুচ খানসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা।
টিএই/ক.ম

