বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

সরকার জাতিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভুলিয়ে দিতে চায়: মামুনুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

সরকার জাতিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভুলিয়ে দিতে চায়: মামুনুল হক
আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ‘সরকার জনগণকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভুলিয়ে দিতে চায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকস্মিকতায় তারা প্রথমে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তখন তাদের কেন্দ্রীয় নেতারা মিডিয়ার সামনে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন— ‘এই মাসুম মাসুম বাচ্চারাই আজ আমাদের মুক্ত করেছে।’ 
 
‘কিন্তু ৫ আগস্ট রাত পেরোতেই তাদের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করে। তারা তখন উপলব্ধি করে যে এই আন্দোলনে তাদের কোনো কৃতিত্ব নেই; ফলে ছাত্র-জনতার হাতে সেই কৃতিত্ব চলে যাচ্ছে। সেই কারণেই সেদিনের পর থেকে ধীরে ধীরে তারা তাদের অবস্থান বদলাতে থাকে এবং আজ এসে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।’ বলেন মামুনুল হক। 

আজ বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীতে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব বলেন মামুনুল হক। সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা: উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এতে সভাপতির বক্তব্য রাখছিলেন মামুনুল হক। সঞ্চালক ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ।


বিজ্ঞাপন


আলোচনায় অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, এবি পার্টির চেয়ারম্যান জনাব মজিবুর রহমান মঞ্জু, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট শিশির মুনির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশীর প্রমুখ।

বিএনপির উদ্দেশে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সখ্যতার ইতিহাস রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে,  ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধে রেখে আন্দোলন করেছি। প্রতিটি আন্দোলনে তাদের সঙ্গে  একসাথে থেকেছি। একসাথে নির্বাচন করেছি। বিগত নির্বাচনেও একসাথে নির্বাচন করার চিন্তায় ছিলাম একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি থেকে আমরা বিএনপির সাথে না গিয়ে বিপরীত অবস্থান করলাম, এটা এখন জনগণের নিকট স্পষ্ট। 

WhatsApp_Image_2026-03-11_at_4.37.42_PM_(1)
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আলোচনায় সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন। ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

মামুনুল হক বলেন, আমাদের কাছে মনে হয়েছে এত মানুষের রক্ত, কষ্ট, তাদের পঙ্গুত্ব, অসহায়ত্ব বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। এই চিন্তা, এই চেতনা থেকেই আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়েছি।
তিনি বলেন, যখনই দেখলাম বিএনপি গণভোট আগে হোক—এর পক্ষে সম্মত না, তখনই আমাদের মনে সন্দেহ জেগেছিল বিএনপি নির্বাচনের পরে কোনো দূরবীসন্ধি আঁটবে। আজ সেই সন্দেহ বাস্তবে পরিণত হলো। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর যে বিএনপি পুলিশের সামান্য বাঁশির ফুঁ শুনে পালিয়ে গিয়েছিল—সেই বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে এখন কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে?


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, বিএনপিকে বলতে চাই, জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদেশি শক্তির উপর নির্ভর করার কারণে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কী পরিণতি হয়েছিল—সে পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন। আপনারা ৬৮% মানুষের ভোটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। মনে রাখবেন, জনগণের বিপক্ষে গেলে জনগণ আবার পিআর পদ্ধতির জাতীয় নির্বাচনের জন্য মাঠে নামবে। আবারও বলছি, বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখালে বাঙালি রাজপথ দেখাবে আপনাদেরকে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রহস্যজনকভাবে কেন বর্তমান সরকার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত দিকে হাঁটছেন, সেই রহস্য আমাদের উদঘাটন করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে—আপনারা জনগণের সামনে এই রহস্য, সেই সত্যটা তুলে ধরুন। 

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ৫০ শতাংশ ভোট পেলে অবশ্যই গণভোট জয়যুক্ত হবে। কেন আইনমন্ত্রীর জায়গায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? ৫ আগস্ট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে—যারাই জনগণের বিরুদ্ধে যাবে, তারাই ৫ আগস্টের পরিণতির মতো পরিণত হবে।

ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ঐকমত্য কমিশনের প্রত্যেকটি মিটিংয়ে সালাউদ্দিন আহমেদ নিজে উপস্থিত ছিলেন। গণভোটে একমত হয়েছেন এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। জুলাই সনদ একটি মীমাংসিত বিষয়, এখানে বিতর্কের কোনো কিছু নেই। জুলাই সনদের যারা বিরোধিতা করবে, জাতি কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবে না। তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে, কিন্তু এই ক্ষমতায় চিরদিন থাকবে না।

মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আমরা যে মুহূর্তে রাষ্ট্রটাকে নতুন করে গড়ে তোলার অপেক্ষা করছিলাম—যেখানে আমরা দেখছিলাম আমরা ভালো থাকব—সেখানে আমরা নানা ধরনের তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ছি। 

মঞ্জু বলেন, এই নতুন তর্ক-বিতর্ক শেষ কোথায়? আমরা সবাই সংবিধান সংস্কারের উপর ঐক্যমত্য হয়েছিলাম। জনগণ দেখেছে, সকলে কিছুদিন আগেও ঐক্যমত্য ছিল। জনগণ দেখেছে এরা সবাই কয়েকদিন আগেও নির্যাতিত, নিপীড়িত, গুম-খুনের শিকার হয়েছে। জনগণ দেখেছে দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন রঙের পোস্টার, অমুকের মুক্তির দাবি, অমুকের নির্যাতনের শিকারের ছবি। জনগণ এসব কিছু দেখেছে। আবার এই জনগণই বর্তমানে দেখছে যে, এই সকল লোকেরা বর্তমানে বিভক্ত।

WhatsApp_Image_2026-03-11_at_4.37.42_PM_(2)
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আলোচনায় সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন। ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

 

এবি পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কোনো সাংবিধানিক আওতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়নি। সালাউদ্দিন আহমেদকে যে ভারতে পাচার করা হয়েছিল, সেটা কোন আইনের ভিত্তিতে পাঠানো হয়েছিল? কিংবা তিনি ফেরত এসেছিলেন কোন আইনের ভিত্তিতে? বেগম খালেদা জিয়া ৫ আগস্ট রাতে মুক্তি পেয়েছেন কোন সাংবিধানিক আইন অনুসারে? মুক্তির আদেশে রাষ্ট্রপতি সই করেছেন কোন আইনের ভিত্তিতে? আইনের ভিত্তিতে সবকিছুকে বিচার করা যাবে না। যদি বিচার করেন, তাহলে সবকিছুতেই আপনারাই আটকে যাবেন।

আইনজীবী শিশির মুনির একটি ভিডিও ক্লিপ শুনিয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সরকার গঠনের আগের বক্তব্য এবং পরের বক্তব্য দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। জুলাই সনদ, গণভোট—এগুলো আইনের বিষয়, অথচ আইনমন্ত্রী এই বিষয়ে কথা বলেননি। কেন? আইনমন্ত্রীর বিষয়ে কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলছেন? 

এই আইনজীবী বলেন, আমার মনে হচ্ছে বিএনপি একেবারেই বেমালুম ভুলে গেছে যে ২৪-এর জুলাইয়ে দেশে একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল এবং এই সরকারটা জুলাই-পরবর্তী জনগণের সমর্থন দিয়ে বৈধতা পাওয়া সরকার। তারা মনে করছে এটা সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সরকার। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে ঐক্যমত্য হয়েছিল, সেগুলোতেই তারা বিতর্ক করছে—এটা নেতৃত্বের দুর্বলতা। জনগণ ও এই প্রজন্মের সবাই এই সরকারের ধোঁকাবাজি ধরে ফেলেছে। এ সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, একটা ফ্যামিলি কার্ড আপনি দেবেন কি দেবেন না—এর মাধ্যমে আপনার অর্থনৈতিক সমস্যা দূর হবে না। কিন্তু আপনি যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে জনগণ আপনাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবে না। তিনি বলেন, আমাদের যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জুলাই সনদকে আইনের আওতায় এনে তাকে জয়যুক্ত করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।

শিশির মুনির বলেন, আমাদের ধারণা, পর্দার আড়ালে কেউ একজন এই খেলাটা খেলছে। আপনারা সেই পর্দাকে উন্মোচন করুন, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
 
ক.ম/ 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর