- মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি
- চালু আছে হটলাইন ৩৩৩
- আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক থাকবেন প্রায় ৩৩০ জন
- অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এটিই প্রথম নির্বাচন
- ব্যবহার হবে ২৫ হাজার ৭০০ বডিওর্ন ক্যামেরা
ভোটাধিকারবঞ্চনার দীর্ঘ অবসান কাটিয়ে আজ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে হবে রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটও। নির্বাচনকে ঘিরে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি ভোট নয়; বরং বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা বিতর্কিত নির্বাচন সংস্কৃতির পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক অগ্নিপরীক্ষা।
বিজ্ঞাপন
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা এখনো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের জোটের বর্জনের মধ্যে। সে নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটগ্রহণ হয় ১৪৬টি আসনে। দেশের ভেতরে ও বাইরে সেই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়। সে সময় বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে অনিয়মের খবর আসে। ফল ঘোষণার পর অনেক কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোটের হার দেখা যায়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তোলে, ভোটের আগেই ফল নির্ধারিত ছিল। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এসব অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দেন। আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনে ২৬৬ আসনে প্রার্থী দেয়। পাশাপাশি দলটির বহু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা নির্দিষ্ট আসনে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী দলগুলোর বড় অংশ তখন ভোটে ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের অধীনেই আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর এটি দেশের প্রথম প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচন। অতীতের নির্বাচনগুলো প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না; এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে একযোগে ভোটগ্রহণ হবে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট চলবে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত গণভোট হওয়ায় ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন। মোট ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবার ভোটের মাঠে নেই। এবারের নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর প্রায় ২০ দিন ধরে দেশজুড়ে প্রচারণা চলে। সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, পথসভা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে নিজ নিজ এলাকায় ভোট দিতে ছুটে যান লাখো মানুষ।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন একাধিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চালু করা হয়েছে হটলাইন ৩৩৩। প্রায় ২৫ হাজার ৭০০টি বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। সব কেন্দ্রেই সিসিটিভি স্থাপনের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এসব ব্যবস্থার ফলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং ভোটারদের আস্থা বাড়বে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও এবারের নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি আসছেন। এছাড়া প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। দেশীয় পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি বিদেশি উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; বরং একটি রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অবিশ্বাস ও সংঘাতের পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে গণভোট যুক্ত হওয়ায় ভোটারদের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা বলেছেন, অতীতের তিনটি নির্বাচনকে ঘিরে যে বিতর্ক জমেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসাই এখন মূল লক্ষ্য। ২০১৪ সালে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। ২০১৮ সালে রাতের ভোটের অভিযোগ জনমনে সন্দেহ তৈরি করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে একদলীয় প্রাধান্য ও সমঝোতার রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কতটা আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং ফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের অংশগ্রহণও হবে একটি বড় সূচক। উচ্চ ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনকে আরও বৈধতা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট আয়োজনের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আশা করছি, দেশের জনগণ সচেতনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন এবং নির্বাচনে ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ধারাকে এগিয়ে নেবেন।
রাজনৈতিক দলগুলোও বলছে, জনগণের রায় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিরোধী কণ্ঠ দমন বা প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ যেন আর না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন অনেকে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সক্রিয় রয়েছে।
এএইচ/এআর

