বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

একসময়ের মিত্র এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

একসময়ের  মিত্র এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট। নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। একসময়ের দুই মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে। অতীতের জোট-রাজনীতির ধারাবাহিকতা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আসন বণ্টনের কৌশল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ভোটের সমীকরণে এসেছে নতুন মাত্রা।
 
ভোটের আগে আওয়ামী লীগের ঘোষিত “নো বোট–নো ভোট” কর্মসূচির প্রভাব পড়বে না বলে বিভিন্ন মহলের পর্যবেক্ষণ। বরং ভোট দিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামমুখী হয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চঘাটে ছিল অতিরিক্ত চাপ ও দীর্ঘ অপেক্ষার চিত্র। যানবাহনের সংকটে কেউ কেউ ট্রাক ও পিকআপে যাত্রা করেছেন। অনেকের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন ব্যাপক উপস্থিতি ভোটের উৎসবমুখর আবহের ইঙ্গিত বহন করে।
 
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জোটের চিত্র
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অভিজ্ঞতার পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এলেও, এবার দুই দল পৃথক জোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যুক্ত হয়েছে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল ও জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের সংগঠন এনসিপি। অন্যদিকে বিএনপি গড়েছে পৃথক নির্বাচনী সমঝোতা, যেখানে রয়েছে কয়েকটি ছোট দল। বিশ্লেষকদের মতে, জোটভিত্তিক আসন সমঝোতা এবং স্থানীয় প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
 
আসন বণ্টনে কৌশল
তথ্যানুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে জামায়াত নিজেদের প্রার্থীদের প্রাধান্য দিয়েছে। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র চারটি শরিকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে তিনটি এবং খুলনার ৩৬টির মধ্যে ৩৫টিই নিজেদের প্রার্থীর জন্য রাখা হয়েছে। সীমান্তবর্তী আসনগুলোতেও দলটির বিশেষ গুরুত্ব লক্ষ্য করা গেছে।
 
অন্যদিকে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ আসনে শরিকদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি এলাকাতেও প্রায় অর্ধেক আসনে সমঝোতার চিত্র দেখা গেছে। জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, শরিকদের দেওয়া আসনগুলো দুর্বল নয়; বরং কৌশলগত বিবেচনায় বণ্টন করা হয়েছে।
 
জামায়াতের দলীয় জরিপে রংপুর ও রাজশাহীর কয়েকটি আসনে আশাবাদের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রেইন, ইনোভেশন ও ন্যারেটিভসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপেও উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯১ সালে ১২.১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ আসন এবং ২০০১ সালে জোট শরিক হিসেবে ১৭ আসন ছিল জামায়াতের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তবে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে দলটির জয় সীমিত ছিল।
 
বিএনপিতে বিদ্রোহীর চাপ
এবারের নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যু। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে দাঁড়ানো অনেককে শেষ পর্যন্ত সরানো যায়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত ৭৯টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে থাকায় ভোট ভাগাভাগির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় অন্তত ১৩ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের মতে, একাধিক প্রার্থী থাকলে মূল প্রার্থীর ভোট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
 
নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ
নির্বাচনী প্রচারণায় এবার নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায়। বিভিন্ন দলের নারী কর্মীদের মাঠে অংশগ্রহণকে অনেকেই ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তবে কয়েকটি স্থানে নারী কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ রাজনৈতিক পরিবেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
 
ঢাকা-৪ আসনের ভোটার সুমাইয়া রহমান বলেন, নারীরা মাঠে কাজ করছে, এটা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রামের ভোটার মাহবুব আলমের মত, ভোটের পরিবেশে সহনশীলতা থাকতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে।
 
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর পর এবারই সবচেয়ে বেশি দল ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ মোট ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে লড়ছেন মোট ২,০২৮ জন প্রার্থী।
 
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ভোটাররা এবার ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলিসহ মোট ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে, যা এবারের নির্বাচনে আলাদা গুরুত্ব যোগ করেছে।
 
বর্তমানে ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এছাড়া নিবন্ধিত আরও আটটি দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। ইসির চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী— সাম্যবাদী দল (এম.এল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (বিডিবি), তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং তরিকত ফেডারেশনের কোনো প্রার্থী নেই।
 
২০২৪ সালের বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ২৮টি দল এবং ভোট হয়েছিল ৬৯টি প্রতীকে। সেই তুলনায় এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রতীকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ, যা প্রতিযোগিতার পরিসর ও বৈচিত্র্য দুটোই বাড়িয়েছে।
 
ইসির তথ্য বলছে, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৮৮ জন প্রার্থী। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখায় ২৫৩ জন এবং জাতীয় পার্টির (জাপা) লাঙল প্রতীকে ১৯২ জন প্রার্থী রয়েছেন। অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে— গণ অধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে ৯০ জন, সিপিবির কাস্তে প্রতীকে ৬৫ জন, বাসদের মই প্রতীকে ৩৯ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকে ৩৪ জন, এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকে ৩২ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ঈগল প্রতীকে ৩০ জন, খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়িতে ২১ জন, গণফোরামের উদীয়মান সূর্যে ১৯ জন, গণসংহতি আন্দোলনের মাথালে ১৭ জন, এলডিপির ছাতায় ১২ জন এবং নাগরিক ঐক্যের কেটলিতে ১১ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন।
 
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর ছয়জন প্রার্থীর নাম দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে জাসদের দাবি, দলীয়ভাবে তারা নির্বাচন বর্জনেই রয়েছে।
 
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবারের প্রধান আলোচ্য বিষয়। অনেক ভোটারই দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্থানীয় প্রার্থীর কাজ, ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, পুরোনো জোট-সমীকরণ, নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব এবং নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই বহুমাত্রিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন নেতৃত্ব ও কোন বার্তার ওপর আস্থা রাখেন।
 
এমআর/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর