দুর্নীতির কাঠামো ফিরিয়ে আনতে সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা নির্বাচনের মাঠে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নেমে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনি ভাষণে এই অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেইনসাফি বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।’
বিজ্ঞাপন
গত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে ভাষণে তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘শেখ হাসিনা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে; বিশেষ করে পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এসব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়লেও এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফ্যাসিবাদের দোসররা লুকিয়ে থেকে অন্তর্ঘাত চালাচ্ছে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।’
তিনি দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিগত শাসনামলে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই অর্থ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে। এনসিপি ক্ষমতায় আসলে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনবে এবং চিহ্নিত লুটেরাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ গঠন করবে। কোনো অপরাধীকেই দায়মুক্তি দেওয়া হবে না।’
ভাষণে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের ওপর ‘অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা’ কাটিয়ে ওঠার ওপরও জোর দেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের নীতি ছিল দিল্লির নির্দেশ পালন করা, যার ফলে বিএসএফ সীমান্তে বাংলাদেশি মারলেও সরকার নিশ্চুপ থাকত।’
বিজ্ঞাপন
এসময় সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি প্রতিরক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। নাহিদ বলেন, ‘শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাহিনীকে শক্তিশালী করা হবে। এ ছাড়া ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সকল সক্ষম নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালুর প্রস্তাব দেন তিনি, যাতে একটি জনভিত্তি সম্পন্ন জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।’
এ সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সিন্ডিকেট ভাঙা এবং পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
পরিবর্তনের রাজনীতি নাকি পুরোনো রাজনীতি বেছে নেবে- ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের সামনে সে সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আপনারা পরিবর্তন ও সংস্কার চান।’
তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। সেই হতাশা ও ক্ষোভ আমাদের আছে। আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি। সবকিছু স্বীকার করে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকটিবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’
তিনি আরও বলেন, ‘১১-দলীয় জোট আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা পরিবর্তন ও ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। আমরা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করব। জুলাইয়ের খুনিদের আমরা বিচার নিশ্চিত করব। গণভোটে আপনারা অবশ্যই “হ্যাঁ”-এর পক্ষে ভোট দেবেন।’
ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি। সবকিছু স্বীকার করে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকটিবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’
এসময় এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের ১৮টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাষণে তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এতক্ষণ যা বললাম, তা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। যদি আপনারা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা সক্ষম হব, ইনশা আল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা গত দেড় বছরে দেখেছেন কারা সংস্কারের বিরোধিতা করেছে, কারা নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছে, কারা পুরোনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। আমরা পরিবর্তন ও সংস্কারের রাজনীতি চাই।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাই আমাদের উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যে আমরা ১১টি দল এবার ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এনসিপির শাপলা কলি মার্কায় ৩০ জন প্রার্থী বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আমার আহ্বান ও অনুরোধ, আপনারা তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ দিন।’
দেশবাসীর উদ্দেশে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচন হচ্ছে, এ কথা কেউ যেন ভুলে না যান।’
তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি দেশের তরুণসমাজকে আবারও দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবার কাছে আমার আহ্বান, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে আসবেন। আপনাদের ভোটাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে থাকব। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটাধিকার কেউই হরণ করতে পারবে না।’
এএম

