- ধানের শীষ নিয়ে মাঠে কাঁপাচ্ছেন তারা, পাচ্ছেন সাড়া
- ১০ নারী প্রার্থী দিয়ে বিএনপি রাজনীতিতে নতুন বার্তা
- প্রধান চ্যালেঞ্জ বিদ্রোহী ও জামায়াতের প্রার্থীরা
- মরহুমা খালেদা জিয়াও ছিলেন ৩ আসনে প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে, তখন আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বিএনপির নারী প্রার্থীরা। দলীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীকে সরাসরি মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ২৯২টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার মধ্যে ১০টি আসনে নারী প্রার্থীদের মাঠে নামিয়েছে দলটি। মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, এই নারী প্রার্থীদের বেশির ভাগই নিজ নিজ আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাদের এগিয়ে রেখেছে। এদের কেউ কেউ এর আগে প্রার্থী হলেও বিজয়ী হয়ে সংসদে যেতে পারেননি। তবে এবার সুষ্ঠু ভোট হলে তারা ভালো করবেন বলে আশার কথা জানালেন।
অবশ্য নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিক আসনে প্রার্থী করা হয়েছিল। মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করলে সেই আসনে অন্য নেতাদের প্রার্থী করা হয়।
বিএনপির নারী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, প্রচারণায় বেশ সাড়া পেলেও তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। অন্যদিকে এসব আসনে একাধিক দলের প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে হবে, এটা অনেকটা স্পষ্ট।
বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সরাসরি সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের হালচাল নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সিলেট-২: তাহসিনা রুশদীর লুনা
গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা এবার সিলেট-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী। জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতা ইলিয়াস আলীর কারণে এই আসনটি ‘ইলিয়াস আলীর আসন’ হিসেবে ধরা হয়। স্বামীর অনুপস্থিতিতে আসন ধরে রাখতে দিনরাত প্রচারণা, জনসংযোগ চালাচ্ছেন লুনা।
জানা গেছে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী, জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও ইসলামী আন্দোলনের মো. আমির উদ্দিন। মাঠের বাস্তবতায় তিনি ভালো অবস্থানে আছেন বলে জানা গেছে।
ফরিদপুর-২: শামা ওবায়েদ
নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বাবার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মাঠে রয়েছেন। তার পিতা কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী। ১১ দলীয় জোটের মাওলানা আকরাম আলী (ধরা হুজুর) এবং ইসলামী আন্দোলনের শাহ মো. জামাল উদ্দিনসহ কয়েকটি ছোট দলের প্রার্থী থাকলেও মাঠপর্যায়ে শামা ওবায়েদকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ ঢাকা মেইলকে বলেন, সার্বিকভাবে পরিবেশ ভালো থাকলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কিছু উদ্বেগ আছে। কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দল আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মসজিদ ও ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ভোট চাইছে। কেউ কেউ বেআইনিভাবে বাসায় গিয়ে ভোটার আইডি ও বিকাশ নম্বর চাচ্ছে। তবে আশা করছি, কমিশন নিশ্চিত করবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, যাতে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়।
প্রচারণার সাড়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার বাবার রাজনৈতিক কাজের কারণে মানুষ আমাকে ভালোবাসেন। আগের দুই মেয়াদের নির্বাচন সুষ্ঠু হলে সংসদে যাওয়ার সুযোগ হতো। এবার আশা করছি সুষ্ঠু ভোটের মধ্য দিয়ে মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন পাব।
ফরিদপুর-৩: নায়াব ইউসুফ কামাল
বিএনপির কেন্দ্রীয় মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নায়াব ইউসুফ কামাল সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কন্যা। শিক্ষা, যোগাযোগ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নকে সামনে রেখে তিনি মাঠে রয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি বাবার ডামি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, পরে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
এই আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের মো. আবদুত তাওয়াব ও জেএসডির আরিফা আক্তার বেবী।
নায়াব ইউসুফ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার বাবা এ আসন থেকে পাঁচবার এমপি হয়েছেন।মন্ত্রী ছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তিনি বিএনপির রাজনীতি করেছেন এবং বিএনপিকে শক্তিশালী করেছেন। ফরিদপুরে মেডিক্যাল কলেজ করেছেন। বিভিন্ন চরে দাদা ও বড় বাবার নামে যেসব স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার জন্য মানুষ শিক্ষিত হয়েছে। বিশ্বাস করি এখানকার মানুষ আমাকেও বাবার মতো ভালোবাসেন।
ঝালকাঠি-২: ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো
সাবেক এমপি ও প্রয়াত বিএনপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর স্ত্রী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ঝালকাঠি-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী। অতীতে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুকে পরাজিত করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এবারের নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর শেখ নেয়ামুল করিম। অন্য প্রার্থীরা মাঠে তেমন প্রভাব রাখছেন না।

মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খানম রিতা
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আফরোজা খানম রিতা এই আসনে প্রার্থী। তার মূল চ্যালেঞ্জ বিএনপির বহিষ্কৃত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আতাউর রহমান আতা। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য প্রার্থীরাও আছেন, কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন রিতা ও বিদ্রোহী প্রার্থী।

নাটোর-১: ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল
সাবেক যুব, ক্রীড়া ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের কন্যা ব্যারিস্টার পুতুল নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ এবং বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত তাইফুল ইসলাম টিপু।

ঢাকা-১৪: সানজিদা ইসলাম তুলি
‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি ঢাকা-১৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী। মানবাধিকার, গুম-খুন ও নাগরিক নিরাপত্তা ইস্যু তার প্রচারণার মূল বিষয়। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মীর আহমাদ বিন কাসেম ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু।

শেরপুর-১: ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা
২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা আবারও শেরপুর সদর আসনে প্রার্থী। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তিনি সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

যশোর-২: সাবিরা সুলতানা
যশোর জেলা বিএনপির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক এবং ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি প্রয়াত নাজমুল ইসলামের স্ত্রী সাবিরা সুলতানা এই আসনের বিএনপির প্রার্থী। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং যশোর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।
এই আসনে ছয়টি দলের সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। অবশ্য সেখানে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ইমরান খান বাসদের প্রার্থী হিসেবে মই প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর ২০২১ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন ইমরান খান। বর্তমানে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন।
মাদারীপুর-১ (শিবচর) : নাদিরা আক্তার
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা আক্তার। কয়েক বছর আগে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন। তার প্রয়াত স্বামী নাজমুল হুদা মিঠু চৌধুরী শিবচরের পরিচিত বিএনপি নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করে ছিলেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সরোয়ার হোসেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আকরাম হোসেন।
নাদিরা আক্তার বলেন, শিবচরের মানুষের ভালোবাসা আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে। বিভেদ ভুলে দলের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। শিক্ষা, নারী উন্নয়ন ও অবহেলিত মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছি।’
বিইউ/জেবি/এমআই

