- এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী এই আসনে
- ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন এলাকাবাসী
- এলাকাবাসীর কাছে পরিচিতমুখ বিএনপির বিদ্রোহী
- একই নামে তিন প্রার্থী হওয়ায় বিভ্রান্ত ভোটাররা
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরে বাংলানগর ও রমনা থানার বেশ কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন। রাজধানীর ব্যবসায়িক হাব হিসেবে পরিচিত কারওয়ান বাজার এই নির্বাচনি এলাকার অন্তর্গত। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ও পড়েছে ঢাকা-১২ আসনে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের দিকে নজর রয়েছে দেশবাসীর। সারাদেশের মতো এই আসনেও জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা। সারাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এই আসনে।
বিজ্ঞাপন
তবে আসনটি এবার দেশবাসীর নজর কেড়েছে ভিন্ন কারণে। সেটা হলো, এই আসনে প্রধান যে তিন প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের প্রত্যেকেরই নাম সাইফুল। এজন্য কেউ কেউ মজা করে বলছেন, এই আসনের ফলাফল চূড়ান্ত। ‘সাইফুলই হচ্ছেন’ এই আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য। তবে এক নামে প্রধান তিন প্রার্থী হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তিও রয়েছে। ফলে আলোচিত এই আসনে তিন সাইফুলের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন সেটা নিয়ে জনমনে রয়েছে কৌতূহল।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার এই আসনে রয়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারের বড় অংশ, পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ফলে যিনি ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কে কোন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন
এই আসনে তিন সাইফুল নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দারা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল আলম নীরব ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি ছাড়াও বিএনপির জোট সমর্থিত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে কোদাল মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন সাইফুল হক। এই দুই সাইফুল ছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. সাইফুল আলম।
জোটপ্রার্থী সাইফুল হক কোদাল মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি এই এলাকার উন্নয়ন ও ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরছেন। তার দাবি, গত কয়েক বছরে এলাকায় রাস্তা, ড্রেনেজ, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। ভোটারদের কাছে তিনি সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা মার্কা নিয়ে মো. সাইফুল আলম প্রচার চালাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নাগরিক সুবিধার ঘাটতির বিষয় তুলে ধরে তিনি পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন। তার বক্তব্য, ভোটাররা এবার নতুন মুখ ও নতুন রাজনীতির পক্ষে রায় দেবেন।
এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির সাবেক নেতা সাইফুল আলম নীরব। যিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে দলীয় রাজনীতির বাইরে এসে স্থানীয় সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া নাগরিকদের কাছে তিনি আলাদা আবেদন তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
এই তিন সাইফুল ছাড়াও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে কাস্তে মার্কা নিয়ে কল্লোল বণিক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি মার্কা নিয়ে মোহাম্মাদ শাহজালাল মোমবাতি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন -এনডিএম থেকে মোমিনুল আমিন সিংহ মার্কায়, আমজনতার দল থেকে প্রজাপতি মার্কায় মো. তারেক রহমান, জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল মার্কায় সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা মার্কা নিয়ে মাহমুদুল হাসান, জনতার দল থেকে কলম মার্কা নিয়ে ফরিদ আহমেদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপেল মার্কা নিয়ে মোছা. সালমা আক্তার, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) থেকে ছড়ি মার্কায় মুনতাসির মাহমুদ, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) থেকে ট্রাক মার্কা নিয়ে আবুল বাশার চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলন থেলে মাথাল মার্কা নিয়ে তাসলিমা আখতার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি থেকে কাঁঠান মার্কা নিয়ে মোহাম্মদ নাঈম হাসান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থী নিয়ে কী বলছেন স্থানীয়রা
ঢাকা-১২ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ২৮ হাজার ৮৩০ জন। এই আসনের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ৮০-৯০ জন স্থানীয় ভোটারে সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে মুখিয়ে আছেন এখানকার বাসিন্দারা। তেজগাঁও তেজতুরী পাড়া এলাকার বাসিন্দা আহমেদ আলী বলেন, গত কয়েকদিন যাবৎ প্রার্থীদের প্রচারণায় কিছুটা বিভ্রান্ত হচ্ছি। প্রার্থীদের পক্ষ থেকে মাইক ও মিছিল নিয়ে আসছে নেতাকর্মীরা। তবে, যখন ‘সাইফুল ভাইকে ভোট দিন’, ‘সাইফুল ভাইয়ের পক্ষ থেকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা’- এমন মিছিল আসছে তখন আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি। আসলে কোন সাইফুলের মিছিল সেটা বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কা বলে গেলেও আমাদের তা মনে থাকে না। অনেকে এতে বিভ্রান্ত হচ্ছে।
একই কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা রহমান উদ্দিন। তিনি বলেন, আমরা আসলে কাকে ভোট দেব তা নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অন্যান্য প্রার্থীদের সাথে সাইফুল নামে তিন প্রার্থী আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। কে কোন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন, তা মনে করা সমস্যা হচ্ছে। কারণ, সবার ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক থাকলেও নাম একই। যার ফলে, আমরা নামগুলো জানলেও প্রার্থীদের তেমন না চেনায় বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সাইফুল আলম নীরবকে আগে থেকে চিনলেও নতুনভাবে দুজন প্রার্থী একই নামে যুক্ত হওয়ায় সবার প্রতীক মনে রাখা যাচ্ছে না।
আগারগাঁও শেরেবাংলা নগর এলাকার একাংশ এই আসনের আওতাভুক্ত। এই এলাকার বাসিন্দা সবুর মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা সাইফুল আলম নীরব ভাইকে ভোট দেব। কারণ, সাইফুল ভাই স্বতন্ত্র হলেও তিনি আন্দোলন সংগ্রাম করে এই এলাকায় দীঘদিন যাবত বিএনপির রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি আমাদের মতো বিএনপি কর্মীদের সুখে দুঃখে সবসময় পাশে ছিলেন। আমরা তার বিকল্প কাউকে দেখছি না। তাকে আমরা ভোট দিয়ে জয়ী করে সংসদ সদস্য করতে চাই।
হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা গফুর মিয়া বলেন, এ আসনে নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনজন প্রার্থী একই নামে হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্ত দেখা দিয়েছে। ধানের শীষ না থাকায় কে আসলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তা বোঝা যাচ্ছে না। শুনেছি সাইফুল আলম নীরব নামে বিএনপির একজন নেতা দাঁড়িয়েছেন। যিনি স্বতন্ত্র থেকে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়াও, সাইফুল নামে আরও দুজন আছে। আমরা চাই যেকোনো একজন ভালো মানুষ আসুক আমাদের এই আসনে। যিনি আমাদের দুঃখ কষ্টে সব সময় পাশে থাকবেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোটপ্রার্থী সাইফুল হক এলাকায় তেমন পরিচিত নন। বিএনপির সমর্থন পেলেও স্থানীয় বিএনপির বড় অংশ তার সঙ্গে নেই। তাছাড়া তার দলের প্রতীক ততটা পরিচিত না হওয়ায় সমর্থকদের মধ্যেও তেমন সাড়া ফেলতে পারছেন না। ফলে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবে মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
কী বলছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা
ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল আলম নীরব ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি শতভাগ আশাবাদী এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করব ইনশাআল্লাহ। নিয়মিত মাঠে নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে ভোটারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি নির্বাচনের দিন ভোটের মাধ্যমে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জবাব দেব। এ এলাকার ব্যবসায়ীদের মূল সমস্যা চাঁদাবাজি। আমি বিজয়ী হলে সেটা বন্ধ করব। পাশাপাশি এ এলাকায় শিক্ষিতের হার বৃদ্ধিসহ মাদক নির্মূলে কাজ করব।
জামায়াতের প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলামও জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে ঢাকা মেইলকে বলেন, এবারের সংসদ নির্বাচনে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। এবার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। সকল ভোটার দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে জয়যুক্ত করবে। প্রতিদিন ঢাকা-১২ আসনের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনি প্রচারে ভোটারদের অনেক ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি বিপুল ভোটে জয়লাভ করব। সব চাঁদাবাজি বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সুন্দর এলাকা গড়তে চাই। এছাড়া এই এলাকায় মাদক ব্যবসা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমি তা পুরোপুরি নির্মূল করব।
বিএনপি জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে। বিএনপি এ আসন থেকে আমাকে মনোনীত করেছে। এ নির্বাচনে আমি শতভাগ বিজয়ী হওয়ার আশাবাদী। এ এলাকায় ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমি নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের সকল সমস্যা সমাধানসহ এ এলাকার মাদক নির্মূল করব। পাশাপাশি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের পড়াশোনার মান উন্নয়নসহ শিক্ষিতের হার শতভাগ নিশ্চিত করা হবে।
একেএস/জেবি

