* যারা নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, তারা দেশকেও নিরাপত্তা দিতে পারবে না
* যশোরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হবে
* জামায়াত কারও কাছ থেকে চাঁদা নেয়নি
* মায়েদের জন্য সন্ধ্যাকালীন বাস চালু হবে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা শফিকুর রহমান বলেছেন, সবাইকে জনগণের ভোটের পাহারাদার হতে হবে। আপনারা প্রত্যেকটি নর-নারীর ভোটাধিকার পাহারা দেবেন। ভোট যার যেখানে ইচ্ছা সেখানে দেবে। কিন্তু আমরা ব্যালট বাক্স পর্যন্ত ভোটারকে পৌঁছে দিতে চাই। ১৩ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশ চাই।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দিনব্যাপী যশোর খুলনা সাতক্ষীরা অঞ্চলের জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে কাউকে প্রভুর মতো আচরণ করতে দিব না উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রতিবেশী বন্ধুর সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে চাই। কিন্তু আল্লাহর কসম, কাউকে প্রভুর মতো আচরণ করতে দেব না। প্রভু আমাদের একজনই-আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
সাতক্ষীরা
আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তিনি বক্তৃতা করেস। রাষ্ট্রের সকল মানুষের জন্য বাঁচার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সরকার যেদিন থেকে শপথ নেবে, সেদিন থেকে কেউ কালো টাকার দিকে হাত বাড়াতে পারবে না। যারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করবে, তাদের বেতন হবে সম্পূর্ণ আলাদা। যে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পরিশ্রম করেন আর যে ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন- উভয়ের মজুরি সমান হওয়া চরম বে-ইনসাফি। ইনসাফ কায়েমের মানে এটা নয় যে, সবাইকে সমান দিতে হবে। ইনসাফ মানে হলো- সবাইকে ন্যায্য পাওনা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জুলুম করা হয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। একটি জেলায় এত বেশি মানুষকে আর কোথাও হত্যা করা হয়নি। বিচার আমরা দুনিয়ায় পাব কি না জানি না, তবে আখিরাতে পাব ইনশাআল্লাহ। তিনি জনতার অভিমত তুলে ধরে বলেন, বিগত সরকার এই জেলাকে দেশের অংশ বলে স্বীকার করেনি। তাই কোনো উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়নি। তারা মনে করেছিল আজীবন ক্ষমতার চেয়ারে থাকতে পারবে। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা চূড়ান্ত। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, এই দুনিয়াটি আমি সৃষ্টি করেছি। সেখানে আমার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কিছু মানুষকে সুযোগ দিই। যারা আমাকে স্মরণ করে আমার প্রতিনিধিত্ব করে, আমি তাদের সম্মানিত করি। আর যারা আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিই।
আরও পড়ুন: ঢাকা-১৫ আসন: জমে উঠেছে দুই শফিকের লড়াই
জামায়াত আমিরের অভিযোগ করে বলেন, সাতক্ষীরার সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে। একটি দ্বীনদার শাসন কায়েম করতে, মদিনার মতো সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সাতক্ষীরার আসনগুলো আমাদের উপহার দেবেন। আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ দিলে আপনাদের ঋণ পরিশোধে জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করা হবে, ইনশাআল্লাহ। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা হবে। আমরা সরকার গঠন করতে পারলে কোনো শিক্ষিত দুর্বৃত্তকে জনগণের সম্পদ লুট করতে দেব না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে ২৮ হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তা বের করে আনব।
পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে আমরা দুটি ভোট দেব। একটি দেব বস্তাপচা রাজনীতি ও জুলুমের বিরুদ্ধে এবং মা-বোনদের ইজ্জতের পক্ষে। এটা বুঝতে পেরে একটি পক্ষের মাথা গরম হয়ে গেছে। আরে ভাই, মাঘ মাসে এত গরম হলে চৈত্র মাসে কী করবেন? ঠান্ডা থাকুন। বাংলাদেশের যুবকরা জানিয়েছে- তারা পরিবর্তনের পক্ষে।
নারীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, কিছু লোক আমাদের মায়েদের ইজ্জতে হাত দিয়েছে। তাদের বলব- মায়েদের ইজ্জত দিতে শিখুন। মনে রাখবেন, আমাদের ইজ্জতের চেয়েও আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মূল্য বেশি। কোথাও মায়েদের ইজ্জতের হানি হলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাবেন। মায়েদের বলি- যেদিন ইনসাফের দেশ কায়েম হবে, সেদিন আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। একদিকে বলেন ফ্যামিলি কার্ড দেবেন, আবার নির্যাতন করবেন-সতর্ক হয়ে যান, এমন দ্বিচারিতা জনগণ মানবে না।
তিনি বলেন, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা দেব না। যুবকরা কারও ভাতা চায় না। তারা সম্মানের সঙ্গে দেশ গড়তে চায়। তাদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দিতে চাই। এই জেলায় কাজী শামসুর রহমানের মতো নেতা ছিলেন, মাওলানা অবদুল খালেক (রহ.)-এর মতো নেতা ছিলেন, মাওলানা রিয়াসত আলীর মতো নেতা ছিলেন। আপনাদের গর্বিত ছেলে মোস্তাজি- তাকে একটি ম্যাচ খেলতে দেয়নি ভারত। সে বলেছে, আমরা সেই খেলাটা শ্রীলঙ্কায় খেলব। কোনো দল নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করলে অন্য জায়গায় গিয়ে খেলার ইতিহাস আছে। কিন্তু আইসিসি এই দাবি মানেনি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য কমানো যায়নি দুটি কারণে- চাঁদাবাজ ও সিন্ডিকেট। আমরা কঠোর হাতে চাঁদাবাজি উৎখাত করব এবং সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। আজাদি নিশ্চিত করার জন্য আমাদের প্রথম ভোট হবে ‘হ্যাঁ’। আমরা সবাইকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানাব। দ্বিতীয়ত দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেব, কারণ এটি ইনসাফের প্রতীক। আমরা বিভক্ত বাংলাদেশ চাই না। তাই আমরা ১১ দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমাদের মা-বোনেরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। ইনসাফের ভিত্তিতে এই দেশ গঠন করা হবে। মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন মত আছে। ইনশাআল্লাহ, সবাইকে নিয়ে বসে দেশকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যশোর:
জেলার ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক জনসভায় জামায়াতের আমির বলেছেন, একটি দল একদিকে নারীদের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার কথা বলছে, অথচ অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত তুলছে। যারা এখনই মা-বোনদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, তাদের হাতে বাংলাদেশের কোনো নারীই নিরাপদ নয়। তারা নিজেদের আদর্শ প্রচার করতে পারে, অথচ আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি প্রচারে বাধা দেয়-এটা কোন ন্যায়বিচার? কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কে আপনি, একজন মায়ের গায়ে হাত দেওয়ার? এটি পুরো জাতির মায়ের ওপর আঘাত, যা আমরা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবো না। যশোরেও এমন ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই-দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিন। যারা নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা দেশকেও নিরাপত্তা দিতে পারবে না। মঙ্গলবার যশোর ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: পাটওয়ারীর ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জামায়াতের
তিনি বলেন, আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেন, তাহলে যশোরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করবো ইনশাআল্লাহ। আপনাদের সব দাবি যৌক্তিক। আমরা প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেবো। সেই সুযোগটা আসবে জনগণের হাত দিয়ে। উসিলা জনগণের হাতে-১২ তারিখ ভোটের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, আমরা যা বলবো, তা যেন করতে পারি। আজ আমাদের মায়েদের বলা হয়- ভোট কাকে দেবেন? তারা বলেন- জামায়াতকে দেবো। কেন দেবেন? উত্তরে তারা বলেন- তাদের হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে, আমিও নিরাপদ থাকবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা একা দেশ চালাবো না। ১১টি দল একত্রিত হয়েছি। এই জাতিকে নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা দেবো না। বেকার ভাতা দিয়ে বেকারের লজ্জাজনক পরিচয় দিতে চাই না। আমরা তাদের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবো। দক্ষতা ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হবে। বেকার ভাতা দেওয়া মানে বেকারত্বকে উৎসাহিত করা।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ। সিন্ডিকেট পুরো দেশকে অবশ করে ফেলেছে। চাঁদাবাজদেরও সম্মানিত করবো- সমাজে লজ্জাজনক পরিচয়ে রাখতে চাই না। তরুণরা জেগে থাকলে বাংলাদেশ জেগে থাকবে। যে তরুণরা বুকের রক্ত দিয়ে নতুন বাংলাদেশ এনেছে, তারাই নতুন বাংলাদেশে পরিবর্তন নিশ্চিত করবে ইনশাআল্লাহ।
খুলনা
খুলনার সামাবেশে প্রধান অতিথির ভাষনে শিল্প ও কৃষি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতি ও লুটপাটে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। জামায়াত আল্লাহর ইচ্ছায় ও জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে বন্ধ মিল-কারখানা চালুর পাশাপাশি নতুন নতুন কারখানা স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে তাদের অপমান করতে চাই না। আমরা তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে তাদের যে অবদান, কিছুটা হলেও তার ঋণ শোধ করতে চাই।
জামায়াত আমির জনসভায় আগত সবাইকে জনগণের ভোটের পাহারাদার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা প্রত্যেকটি নর-নারীর ভোটাধিকার পাহারা দেবেন। ভোট যার যেখানে ইচ্ছা সেখানে দেবে। কিন্তু আমরা ব্যালট বাক্স পর্যন্ত ভোটারকে পৌঁছে দিতে চাই। ১৩ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশ চাই। এ সময় তিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকালে এবং তারও আগে ২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। সেই সঙ্গে আহত, পঙ্গু, কারানির্যাতিত, গুমের শিকার ও দেশান্তরী হতে বাধ্য হওয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নারীদের উদ্দেশে আমীরে জামায়াত বলেন, জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দুটি বিষয় নিশ্চিত করা হবে। একটি হলো নারীদের মাতৃত্বের মর্যাদা ও তাদের নিরাপত্তা। তিনি বলেন, মা-বোনদের আবাসস্থলে, কর্মক্ষেত্রে ও চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, খুলনা-৬ আসনে জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-৪ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দেওয়ালঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খুলনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা মহানগরী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী খুলনা জেলা হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বাবু কৃষ্ণ নন্দী।
টিএই/এআর

