বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

একতরফা আচরণ হলে সহযোগিতার সীমা ভাবতে হবে: ইসিকে জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

একতরফা আচরণ হলে সহযোগিতার সীমা ভাবতে হবে: ইসিকে জামায়াত

ঘোষিত সময় অনুযায়ী সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত ইসলামী। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একতরফা আচরণ অব্যাহত থাকলে নির্বাচন নিয়ে সহযোগিতার মাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। 
 
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ। বৈঠকে তার নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, জসিম উদ্দিন সরকার ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন।
 
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি, সেখানে আমাদের সবারই প্রত্যাশা—বাংলাদেশে ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। আমাদের অবস্থান আমরা সবসময়ই স্পষ্ট করে জানিয়ে আসছি। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি ভালো নির্বাচন নিশ্চিত করতে অতীতের সব গ্লানি, তামাশা ও প্রহসনের নির্বাচন থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ও জাতিকে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি।
 
জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা একটি নির্বাচনী সমঝোতার প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছি। সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে পাঁচ দফার ভিত্তিতে আন্দোলনও করেছি। সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের কয়েকটি মৌলিক দাবি ছিল। তার মধ্যে অন্যতম হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।
 
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, তফসিল অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা এবং ভোট অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে এখন প্রচার-প্রচারণা হওয়ার কথা নয়। অথচ দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু এলাকায় বিশেষ কয়েকটি দলের প্রার্থীরা অবাধে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে আমাদের দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে—তারা নির্বাচনী প্রচারণা করতে পারছেন না। দলীয় সভা-সমাবেশ করা নির্বাচনে বাধা নয়।

জামায়াত নেতা অভিযোগ করে বলেন, অনেক জায়গায় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ করা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও কোনো অভিযোগ না থাকলেও স্বপ্রণোদিত হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনি কর্মকর্তারা হয়রানি করছেন। আমরা এসব বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছি। কাগজের স্তূপ পড়ে আছে, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে নির্বাচনি সমতা রক্ষা হচ্ছে না।


বিজ্ঞাপন



একটি দলের দিকে ইঙ্গিত করে হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, তারা প্রকাশ্যেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন না, তাদের হয়রানি করা হচ্ছে—জরিমানা নোটিসসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কমিশনকে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, এই দ্বৈত নীতি বন্ধ করতে হবে।
 
জামায়াত নেতা বলেন, সমতার জায়গায় দলীয় প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের দুটি বড় দল যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে বা জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল বা নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে হলেও সমতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন আমাদের আশ্বস্ত করেছে। আগের নির্বাচনেও আমরা একই কথা বলেছিলাম, তখনও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এবার আমরা আশাবাদী হতে চাই, তবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই। অন্যথায় নির্বাচনী পরিবেশ ব্যাহত হবে।
 
হামিদুর রহমান বলেন, জনগণ যদি দেখে সরকার ও কমিশনের সহায়তায় কেউ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, তাহলে তা ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলবে। এটি অন্যায় এবং অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। দলীয় প্রধানদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নিরাপত্তা দিতে হলে সবাইকে দিতে হবে। সব দলের প্রধান এবং যারা নিরাপত্তা চেয়েছে—সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে দেওয়া হবে, কাউকে দেওয়া হবে না—এভাবে হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না, নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে না।
 
বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে জামায়াত নেতা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ নানা কার্ডের নামে ডামি কার্ড তৈরি করে ঘরে ঘরে বিতরণ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে—আমাদের ভোট দিলে এসব সুবিধা পাওয়া যাবে। আমরা আগেও কমিশনকে এসব বলেছি এবং বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছি। এগুলো বন্ধ না হলে ভোটাররা প্রতারিত হচ্ছে। তিনি আচরণবিধি প্রয়োগে বৈষম্য ও দ্বৈত নীতির কথাও উল্লেখ করেন।
 
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, কিছু কিছু কর্মকর্তা ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছেন, যাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে এক রকম সিদ্ধান্ত, কোথাও আরেক রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবার আইনের শিথিলতার কথাও শোনা যাচ্ছে। আইনে যদি শিথিলতা থাকে, তা সবার জন্য হতে হবে; না থাকলে কারও জন্যই নয়।
 
জামায়াত নেতা বলেন, ঋণখেলাপির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও বৈধ, কোথাও অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে। আমিও এর শিকার হয়েছি, তবে আপিলের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছি। কিন্তু যারা এই অবিচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
 
হামিদুর রহমান বলেন, বহুদিন পর দেশে একটি নির্বাচন হচ্ছে। বহু হয়রানি ও নির্যাতনের পর এই নির্বাচন আসছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সরকার সুন্দর সুন্দর কথা বলছে, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ আমরা সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না।


হামিদুর রহমান বলেন, আজ আপনাদের মাধ্যমে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানাই—আসুন, সবাই মিলে একটি সুন্দর নির্বাচন করি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিন, পদক্ষেপ নিন। রাজনৈতিক দল হিসেবে সহযোগী শক্তি হিসেবে আমরা পাশে আছি। কিন্তু যদি আইনের ব্যর্থতার কারণে একতরফা আচরণ করা হয়, তাহলে আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।
 
জোটের বিষয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, রাজনৈতিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে আমরা সমঝোতার নির্বাচনে যাচ্ছি। অনেক দল এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ভাবতে হবে—এই নির্বাচনে আমরা কতটুকু সহযোগিতা করতে পারব। এর দায়ভার সরকার ও কমিশনকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, আজ আমরা কথাগুলো বলেছি। কমিশন আবারও আশ্বাস দিয়েছে। আমরা প্রত্যাশা রাখি—তারা সেই আশ্বাস বাস্তবায়ন করবে।
 
বাহরাইনে বিএনপির নেতাকর্মীরা পোস্টাল ব্যালটে কারসাজি করছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাহরাইন এমন একটি দেশ, যেখানে সে দেশের আইন অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা অনুমোদিত নয়। বাংলাদেশের নির্বাচনি আইন ও আরপিও অনুযায়ীও বিদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা থাকার সুযোগ নেই। আমরা সবসময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছি। যেখানে আমার দলের কোনো কমিটিই নেই, সেখানে রাজনৈতিক নেতাকর্মী থাকার প্রশ্নই ওঠে না। 
 
দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে একই ব্যালট ব্যবহারের প্রস্তাব প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশন আমাদের জানিয়েছে—পোস্টাল ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তারা যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা আমাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়নি। দেশের ভেতরে আগের দিন ব্যালট পাঠানো হলে সমস্যা হয় না এবং পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। এখানে বড় কোনো সমস্যা নেই—শুধু প্রার্থীর নাম যুক্ত করতে হয়, প্রতীক তো একই থাকে।
 
পোস্টাল ব্যালটে একটি বিশেষ দলের প্রতীক ভাঁজে পড়ে গেছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান বলেন, এগুলো টেকনিক্যাল বিষয়। ছোটখাটো বিষয় হিসেবেই এগুলো দেখা উচিত।
 
এমএইচএইচ/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর