বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও গুলশানে তার বাসা ‘ফিরোজা’য় অনুমোদিত লোকজনের যাওয়া আসা ছিল। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ও গৃহকর্মী যারা ছিলেন তারাও সক্রিয় থাকতেন সবসময়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার মৃত্যুবরণ করার পর যেন সবকিছু থমকে গেছে। পুরোপুরি নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছে ‘ফিরোজা’ ভবন। এই বাড়িতেই থাকতেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
শুধু বাসা নয়, গুলশানে তারেক রহমানের বাসা, চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিরাজ করছে শূন্যতা। সবকিছু আগের মতো থাকলেও নেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল সড়কের যে বাসাটিতে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে ছিলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন তার মত্যুর পর ওই বাসাটি একমাত্র ঠিকানা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু এক এগারোর পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতা আসার পর এই বাসা থেকে উচ্ছেদ হন খালেদা জিয়া। এরপর গুলশানের এই বাসাটি ‘ফিরোজা‘ করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য।
২০১৮ সালে এই বাসা থেকে পুরনো ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা রায়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে শেখ হাসিনার সরকার বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি দিলে হাসপাতাল থেকে ফিরোজাতেই উঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ফিরোজার নিরাপত্তাকর্মীরা এখনো পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতই।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায় লেগে আছে, যারা বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে উনাকে ঘিরে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা এই মুহূর্তে মানসিকতা আমার নেই। সত্যিই এই বাসা যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)-এর একজন সদস্য বলেন, ‘ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূণ্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। ভাই এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে।
বিজ্ঞাপন
আরেক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কিনা।
ফিরোজায় দায়িত্বপালনরত নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছে। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।
‘১৯৬ নম্বর বাসা’
ফিরোজার পাশের লাগোয়া বাসাটি হচ্ছে ১৯৬ নম্বর বাসা। এটি খালেদা জিয়ার নামে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তার পরিবারকে বাড়িটি দেওয়া হয়। এই বাড়িটির দলিলসহ কাগজপত্র বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ফিরোজায় এসে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন কয়েক মাস আগে। সেই বাসাটিতে উঠেছেন তারেক রহমান।
সেই বাসার সামনে নিরাপত্তা কর্মীরা যারা দায়িত্বরত তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান এভিনিউ ডিপ্লোমেটিক জোনের মধ্য পড়ায় সেখানে নেতাকর্মীদের ভিড় সেভাবে নেই। তবে যৎসমান্য যারা আছেন তাদের মধ্যে গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, ‘এই কাছাকাছি থাকি। বিকালে হেটে একটু আসলাম এই বাড়ির সামনে। কঠোর নিরাপত্তা দেখতেই পারছেন। ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটা তারেক রহমান। সেইজন্য এখানে এসে কিছু শোকের সঙ্গি হচ্ছি। জানি লিডারের এই শোক শুধু তার একার শোক নয়, এটা আমাদের সকলের শোক, এটা আমাদের গণতন্ত্র প্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।
‘বাসায় দোয়া-দরুদে তারেক রহমান’
মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সারাটি সময় তার জন্য দোয়া করেছেন দোয়া-দরুদ ও নামাজে।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গতকাল রাতে এবং আজকে বিকাল পর্যন্ত বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফেরাত কামনায় ইবাদত বন্দেগিতে ছিলেন। দোয়া-দরুদ, কোরআন তেলোয়াত করেছেন। আত্মীয় স্বজনরা অনেকে বাসায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সান্তনা জানাতে। সেই সময়ে পারিবারিক পরিমন্ডলে ম্যাডামের স্মতিময় ঘটনার কথা বলেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদেরকে, আবেগ তাড়িত হয়েছেন, শোকাচ্ছন্ন হয়েছেন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন। তিনি অফিস করছেন নিজের চেম্বারে।
সন্ধ্যার পর তার সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে দেখা করে সমবেদনা জানিয়েছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
‘গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকের ছায়া’
গুলশানের অফিসে কালো পতাকা উড়ুছে। বিএনপির পতাকা এবং জাতীয় পতাকা অধনমিত করা হয়েছে। এখানে শোক বই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা আসছেন তাদের শোক জানাতে।
বহস্পতিবার সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা এফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী স্বাক্ষর করেছেন শোক বইয়ে।
গুলশানে চেয়ারপারসনের কারযালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, কারযালয়ের বাইরে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। যারা শোক বইতে স্বাক্ষর করতে যাবেন তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে।
রাস্তার দুই ধারেই কর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বনানী যুব দলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘নেত্রী নাই,মনটা ভালো নেই। কতদিন এই নেত্রীর দূর থেকে দেখে নিজে শক্তি সঞ্চয় করেছি, শত নিপীড়ন-নিরযাতনের মধ্যে আশা দেখেছি সেই নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এই শোক কিভাবে কাটাব জানি না।
কৃষক দলের সহসভাপতি ভিপি ইব্রাহিম বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই আল্লাহর হুকুম। তবে একটা ঠিক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না।তিনি চলে গেছেন ঠিকই তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে সবসময় প্রতিক্ষনে।
গত মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল মানিক মিয়া এভিনিউতে তার নামাজে জানাজার পর দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।
বিইউ/ক.ম

