রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকা-২: আমানেই আস্থা, বিএনপিতে আছে বঞ্চনাও

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

Dhaka-2
ঢাকা-২ আসনে আমানুল্লাহ আমানের পাল্লাই ভারী। ছবি: ঢাকা মেইল

রাজধানীর পাশের উপজেলা কেরানীগঞ্জ ও সাভারের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ সংসদীয় আসন। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি আওয়ামী লীগ পুরোটা সময় নিজেদের দখলে রেখেছিল। তবে এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখানে স্বরূপে ফিরেছে বিএনপি। সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী আমানুল্লাহ আমানই এই আসনে এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। দলটির নেতাকর্মীসহ স্থানীয়দের আস্থা আমানুল্লাহ আমানের ওপরেই। তবে দলে কিছু বঞ্চনার সুরও শোনা যাচ্ছে। ফলে বিএনপির কিছু ভোট অন্য বাক্সেও চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।  

সরেজমিনে ঢাকা-২ সংসদীয় আসনে ঘুরে বিএনপির অনেকের মুখে বঞ্চনার কথা শোনা গেছে। গত ১৭ বছরে দলটির পক্ষে যারা কথা বলেছেন, মাঠে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন, মামলা ও নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন, তারাই এখন বঞ্চিত। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাদের কোনো মূল্যায়ন হয়নি। ফলে তাদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কিছুটা ঘটতে পারে ভোটের বাক্সে।


বিজ্ঞাপন


এলাকাবাসী বলছেন, এই আসনে ভোটার ছয় লাখের ওপরে। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা নারীর চেয়ে ১৫ হাজার বেশি। আসনটিতে বিএনপির বাইরে বড় ভোটব্যাংক রয়েছে আওয়ামী লীগের। তবে এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় তাদের ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য ভোট নেই। তবে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার ভোট বেড়েছে দলটির। ফলে স্থানীয়রা বলছেন, আমানুল্লাহ আমানের মতো হেভিওয়েট নেতাকে টেক্কা দিতে না পারলেও জামায়াত এবার এই আসনে আগের চেয়ে ভালো করবে।

শক্ত অবস্থানে আমানুল্লাহ আমান

সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য আমানুল্লাহ আমান। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। সাবেক প্রতিমন্ত্রী। ডাকসুর সাবেক ভিপি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা। কেরানীগঞ্জ অঞ্চলে রয়েছে তার ব্যাপক প্রভাব। আগে তিনি ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হলেও সংসদীয় এলাকা ভাগ হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। তবে এই আসনটি যে এলাকা নিয়ে গঠিত আগেও তিনি ওই এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। এই অঞ্চলে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে।

আরও পড়ুন

২৩৭ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন যারা

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে আমানুল্লাহ আমান অংশ নিতে পারেননি। তার পরিবর্তে ছেলে ব্যরিস্টার ইরফান ইবনে আমান এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবারও আমান নাকি তার ছেলে ধানের শীষ পাচ্ছেন এটা নিয়ে গুঞ্জন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপির হাইকমান্ড আমানকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে। এতে এই আসনে বিএনপির জয় মোটামুটি নিশ্চিত বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

মঙ্গলবার আঁটিবাজারের একটি চায়ের দোকানে কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ নজরুল ইসলামের সঙ্গে। ঢাকা মেইলের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা এই আসনে আমানকেই প্রার্থী হিসেবে চেয়েছিলাম, অমিকে নয়। অমিতো আজকের পোলা। হ্যার বাপে আমাগো নেতা। হ্যায় বাইচা থাইকতে ক্যান আমরা তার পোলারে লিডার মানমু?’

Aman2
পোস্টার-ব্যানার-তোরণে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। ছবি: ঢাকা মেইল

তার কথার সত্যতা মিলল পাশে থাকা আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে। তাদের একই ভাষ্য, তারা এই আসনের জন্য যোগ্য প্রার্থী মনে করেন আমানুল্লাহ আমানকে। তারা মনে করেন, জামায়াত বা এনসিপি প্রার্থী নন, বিএনপির আমানই হবেন এই আসনের সামনের এমপি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আমান রেকর্ডসংখ্যক ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। এবারও তিনি রেকর্ড ভোটে জয়ী হবেন বলে আশাবাদী স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

আছে ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অভিমানও

তবে এখানে বিএনপি প্রার্থীর শক্ত অবস্থান থাকলেও এর আড়ালে আছে কিছু ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অভিমান। মধুসিটি, নয়াবাজার, কলাতিয়া এলাকার অনেকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর উপজেলায় নতুন নতুন মুখ গজিয়ে উঠেছে। যাদের হাতে এখন রাজনীতি চড়েছে। ফলে আসল বিএনপির কর্মীরা বিমুখ। তারা এই অভিমানে অন্য দলের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

শিবিরের সাবেক সভাপতিরা কে কোথায় নির্বাচন করছেন?

কেরানীগঞ্জ উপজেলায় গত ১৭ বছর দল করে মামলা, হামলা ও বাড়িছাড়া ছিলেন ষাটোর্ধ আয়নাল হক (ছদ্মনাম)। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের কোনো মূল্যায়নি হয়নি। হাইব্রিডদের দল এখন মূল্যায়ন করছে। আমানের বাড়ির চা বহনকারী কর্মীরা সামনে সারিতে স্থান পেয়েছে। ফলে তার কথা হলো- এতে বিএনপির ভোট কিছু অন্য দলে চলে যাবে।’

শুধু আয়নালই নন, তার মতো অনেকেই দলটিতে মূল্যায়ন না পেয়ে এখন অভিমানে নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীদের কী অবস্থা?

এবার এই আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার তৌফিক হাসান। তিনি বুয়েটে পড়াশোনা করেছেন। এলজিইডির উপজেলার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ইতোমধ্যে নির্বাচন করেছেন। তিনি প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনিও এই আসনের ছেলে। দলের পক্ষ থেকে সভা-সমাবেশে ভোট চাওয়া হচ্ছে। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তারা কোমর বেঁধে নেমেছেন।

তবে জামায়াত প্রার্থী এখানে তেমন সুবিধা করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, জামায়াতের প্রার্থী তৌফিক হাসানকে তারা তেমন চিনেন না। এছাড়া এখানে জামায়াতের কোনো ভোটব্যাংক নেই।

তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এখানে জুলকার নাইন নামে একজনকে প্রার্থী করেছে। তিনি এই আসনের নতুন মুখ। ফলে যার কাছেই তার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছে কেউ তাকে চিনতে পারেননি। এমনকি তিনি কে, কার প্রার্থী এবং তার বাড়ি কোথায় উল্টো তারা এই প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেছেন।

Jamat2
জামায়াতের প্রার্থীও এলাকায় সরব। ছবি: সংগৃহীত

তবে জুলকার নাইনের পক্ষে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা রয়েছে। অনেকে তার পক্ষে ভোট চাইছেন। যদিও তা সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। এখন পর্যন্ত আঁটিবাজার, নয়াবাজার, হযরতপুর এলাকায় দলটির পক্ষ থেকে তেমন কোনো নির্বাচনি প্রচারণা চোখে পড়েনি।

ব্যানার-ফেস্‌টুনে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার ঢাকা-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই দলের প্রাথীই আঁটঘাট বেঁধে নেমেছেন। তারা এই আসনের প্রতিটি হাটবাজার, রাস্তাঘাট ও মোড়ে মোড়ে তাদের মার্কা ও ছবি সম্বলিত ব্যানার সাঁটিয়েছেন। কেউ কেউ বড় বড় গেটও বানিয়ে প্রচার করছেন।

আরও পড়ুন

বিএনপির মনোনয়ন: ইসলামি দলের নেতারা কারা কোথায় ছাড় পাচ্ছেন

পাশাপাশি তারা সভা, সেমিনার, উঠান বৈঠক, জনসভা ও পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের সঙ্গে মিটিংও করছেন। বিষয়গুলোকে এলাকাবাসীরাও ভালোভাবে নিচ্ছেন। তারা ১৭ বছর পর এমন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বেশ উজ্জীবিত।

এই এলাকায় আমানুল্লাহ আমানের পক্ষেই বেশি প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী প্রকৌশলী তৌফিক হাসান। তার বড় বড় বিলবোর্ড কিংবা ব্যানার নেই, যা আছে সবটাই ফেস্‌টুন ও ক্ষুদে ব্যানার।

এমআইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর