মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ঢাকা

সংঘাতের শঙ্কা নিয়ে ছাড়ল ‘নির্বাচনী ট্রেন’

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১০:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

সংঘাতের শঙ্কা নিয়ে ছাড়ল ‘নির্বাচনী ট্রেন’

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল ভোটের। আগামী ৭ জানুয়ারি সারাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বুধবার (১৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল ঘোষণা করেছেন নির্বাচনের তফসিল। এর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল নির্বাচনী ট্রেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়া এবং এর কোনো লক্ষণ আপাতত দেখতে না পাওয়ায় সংঘাতের শঙ্কা রয়েই গেল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবারও সহিংসতার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

অবশ্য সিইসিও তার ভাষণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আশঙ্কার কথা জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাত পরিহারের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সকল রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব- সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে সদয় হয়ে সমাধান অন্বেষণ করতে।’


বিজ্ঞাপন


সংঘাতের আশঙ্কার কথা জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংলাপের মাধ্যমেই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হতে পারে। সংলাপ হতে হবে শর্তহীন। সমস্যার সমাধান না হলে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

গত অক্টোবরে বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংস হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। বৈশ্বিক সংকট নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করা সংস্থাটি অক্টোবর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত যেসব দেশ সম্ভাব্য সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, তার তালিকা করেছে। সেই তালিকায় বাংলাদেশেরও নাম আছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জানুয়ারিতে বাংলাদেশে সম্ভাব্য নির্বাচন সামনে রেখে বা নির্বাচনের পর সম্ভাব্য সহিংস পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়ে বিরোধীদের দাবি মানবে না। বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ও অব্যাহত থাকবে।

এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকে আওয়ামী লীগে চলছে নির্বাচনী আমেজ। উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে। তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল হয়েছে। এরইমধ্যে আগামী ১৭ নভেম্বর থেকে দলীয় মনোনয়ন বিক্রি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।

TT


বিজ্ঞাপন


তবে নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে এমনটা জানালেও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতারা তফসিল নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। নির্বাচনের পরিবেশ শেষ পর্যন্ত কোনদিকে যায় তা দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।

আর ‘একতরফা ও তামাশার তফসিল’ অ্যাখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। পাশাপাশি ঘোষিত তফসিল বাতিলের দাবিতে আগামী রোববার এবং সোমবার দেশব্যাপী হরতালের ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। দলের সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তফসিল ঘোষণা হলে রোববার-সোমবার হরতাল/অবরোধ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

যদিও এখন পর্যন্ত পঞ্চম দফায় বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলছে। শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি আপাতত চলবে।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী- নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ৩০ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর, মনোনয়ন আপিল ও নিষ্পত্তি ৬ থেকে ১৫ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর, প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং ভোটগ্রহণ ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।

তফসিল নিয়ে প্রতিক্রিয়া

ইসি ঘোষিত তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এ দেশে গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৪৩ বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। আজকের দিন খুব আনন্দের দিন। আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিলকে স্বাগত জানাই।’

তবে তফসিল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যে পরিস্থিতিতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে, তা স্পষ্টতই সরকারের ইচ্ছা অনুসরণ করে এবং প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি কোনো কর্ণপাত না করে।’ এতে সংঘাত অনিবার্য বলে মনে করেন সাবেক এই মন্ত্রী।

RRR

এদিকে এমন দিনে তফসিল ঘোষণা হয়েছে যেদিন সকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস আওয়ামী লীগের কাছে সংলাপের চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন। এর আগে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকেও শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছে দেশটি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সংলাপের সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে মঈন খান বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর তফসিল বাতিল করার নজিরও এদেশে আছে।’

আর দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকবেন আর সিইসি বলছেন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার চেষ্টা করবেন। এটা বিশ্বাস করা কঠিন ব্যাপার। সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা, ভণ্ডামি। ঘোষিত তফসিলের কারণে দেশে যদি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়, সে কারণে যে অবস্থা হবে তার দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।’ তবে বিএনপির পক্ষ তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে এখনো কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। 

এদিকে জামায়াত ও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোট তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন ও বাম রাজনৈতিক জোট একতরফা নির্বাচনী তফসিল প্রত্যাখ্যান করে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার সারাদেশে আধাবেলা হরতাল ডেকেছে বাম রাজনৈতিক জোট। বৃহস্পতিবার জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ করবে ইসলামী আন্দোলন। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ৩৮টি দলের মধ্যে একমাত্র লেবার পার্টি আগামী রোববার ও সোমবার সারাদেশে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে। 

এ ব্যাপারে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হরতালের ঘোষণা দেওয়ার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তাকে বলেছেন। তাই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।’

তফসিলের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল। বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াত ও এবি পার্টিও।  

নির্বাচনের প্রস্তুতি থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে এখনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। এ অবস্থায় জাপা নির্বাচনে যাবে কি না সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।

নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের চুন্নু বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইসহ ইশতেহার এবং ফরম ছাপানোর কাজ করা আছে। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, নির্বাচন করব কি করব না। কারণ, গত পাঁচ বছরে এই সরকারের আমলে যেসব নির্বাচন হয়েছে, তাতে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো না।’

অবশ্য জাতীয় পার্টি কখনো নির্বাচন বর্জন করেনি এমনটা জানিয়ে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ বলেছেন, ‘তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি আছে।’

বিইউ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর