বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সিস্টেমের কলকব্জায় জং ধরেছে

মো. ফরহাদ আলী শুভ
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৩, ১২:১২ এএম

শেয়ার করুন:

সিস্টেমের কলকব্জায় জং ধরেছে

স্বপ্নপূরণই আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়, সুশিক্ষিত, সুনাগরিক, মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন একজন মানুষ হওয়াটাই মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত। তাই বলে স্বপ্নকে ত্যাগ করে নয়, তাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। কারণ স্বপ্ন ছাড়া জীবন তো অর্থহীন। জীবনের এই বাজিমাতে অনুমান নয়, অনুকরণ নয়, অনুশোচনা নয়, অনুসরণ নয়; নিজেকে ভাবুন, নিজেকে খুঁজুন, নিজেকে দেখুন, নিজেকে জানুন, নিজের গন্তব্যের পথে চলতে থাকুন জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষ হওয়ার সুখপাখিকে আবিষ্কার করতে।

আমাদের সংগ্রামী জীবনে কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জীবন চলার পথে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে এখনকার এই হৃদয়ের গহীনে চেপে রাখা কষ্টগুলো আপনার বা আমাদের বিজয়ীর খেতাব এনে দেবে সারাজীবনের জন্য। আপনার বা আমাদের একান্ত লক্ষ্য ও স্বপ্নকে  নিজেদের আত্মার সন্তান হিসেবে লালন করতে হবে, এগুলোই তো চূড়ান্ত সাফল্যের নকশা। আমাদের মন অনেক কিছুই চাইবে, কিন্তু তা বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ দিয়ে বিচার করতে হবে। তাহলেই আপনি, আমি বুঝতে পারবো কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত নয়। ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল; আমাদের জীবনটা এমনি করেই সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে গড়তে হবে। প্রত্যেককে জেগে ওঠতে হবে, সচেতন হতে হবে এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থামা যাবে না এটাই হোক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ।

আমাদের জীবনের শিক্ষা হলো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হয়, তার সবটুকুই ভুলে যাবার পর যা থাকে; তাই হলো অর্জিত শিক্ষা।

সেটাও আমরা তেমনভাবে প্রায়োগিক কাজে লাগানোর সুযোগ পাই না বা চেষ্টাও করি না। আমাদের শিক্ষা, আমাদের অর্জিত জ্ঞান, আমাদের জীবনের সোনালি সময়গুলো, আমাদের বাঙালির সিস্টেমের বেড়াজালে অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

আমাদের জীবনে একাডেমিক শিক্ষা আমাদের ইচ্ছার ওপর নয়, আমাদের কর্মের ওপর দণ্ডায়মান। যা আমাদের ইচ্ছাকে ভূলুণ্ঠিত করে। পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষই তার নিজের কাছে নির্ভুল, আর এ জন্যেই তো মানুষ ভুল করে। কারণ ভুলকে নির্ভুল ভেবেই অন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে মানুষ সবচেয়ে বড় ভুল করে থাকে জীবনের চলার পথে।

 আপনি কাউকে সহজেই বোকা বানিয়ে দিতে পারবেন অথবা কারো সরলতার সুযোগ নিয়ে ঠকিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে একবার প্রশ্ন করলে দেখবেন নৈতিকতার দিক দিয়ে আপনি নিজেই হেরে গেছেন।

শৈশবকালের কিছু স্মৃতি রোমন্থন করলে বলতে হয়- ‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা’ নিংসন্দেহে এটি কবির সৃষ্টিশীল কর্ম যা রূপক অর্থে হলেও ছোট শিশুদের তা প্রতিনিয়ত কল্পনার জগতে রেখে দেয়। কখন আসবে চাঁদ মামা, এ বাসনা কখনো শিশুর পূরণ হয় না।

আমাদের জীবনের ভুল, নীতিহীনতা এবং অপরাধগুলোও এভাবে রূপক হয়ে চাঁদ মামার মতো থেকে যায় কল্পনার জগতে, তা কখনো কেউ শোধরানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেই সমাজ নামক ঠেলাগাড়ি তার প্রাণ ফিরে পেতো। কিন্তু তার রূপান্তর খুব কম মানুষের মাঝে পরিলক্ষিত হয়।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে কেমন লাইফ স্টাইল চাও- এ কথা জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশই সাত-পাঁচ না ভেবে অকপটে বলে দেবে- হাতে টাকা পয়সা থাকবে বা ভালো একটা ব্যবসা বা ভালো একটা ইনকাম সোর্স থাকবে। ভালো একটা দেশে সেটেল হওয়া বা ভালো একটা চাকরি পাওয়াকেই ভালো লাইফ স্টাইল মনে করে।

দুঃখের বিষয়, আজকের দিনে নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আরও যে সাড়ে ষোল কোটি বাঙালি আছে, তাদের জন্যেও সুশিক্ষিত সুনাগরিককে যে ভাবতে হবে- সেটা সমাজের মারপ্যাচে আরেক বাঙালি ভুলে যায়। আমাদের বাঙালির সিস্টেম পরিবর্তন হওয়া দরকার, শুধু সামষ্টিকভাবে পরিবর্তন নয়। প্রথমেই নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে, তারপর সাড়ে ষোল কোটি মানুষ নিজ নিজ জায়গায় পরিবর্তন হলে একসময় আমাদের মাঝে উঁকি দেবে যে, আমরা তো বাঙালি, সবাইকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাবো। সবার সুখে হাসব আমি, কাঁদব সবার দুখে; নিজের খাবার বিলিয়ে দেব অনাহারির মুখে। জানা নেই কবির এ কথা আমাদের চিন্তাজগতে সত্য হয়ে ধরা দেবে কি না! তারপরও আশায় তো বুক বাঁধতে হবে। নিজদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে পরিবর্তনের জন্য।

একটা সিনেমার চরিত্রের আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের বাঙালির কিছু সিস্টেমের পরিবর্তন দরকার। ক্যালেন্ডারে সময় ২০০৯ সাল। মুক্তি পায়  থ্রি ইডিয়টস সিনেমা। হিরানি প্রযোজিত ও আমির খানের অভিনীত এই সিনেমা বলিউডের সিনেপাড়ায় জমিয়েছিল ব্যাপক হৈ-হুল্লোড়। বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্রের জানা-অজানা নানা দিক অনেকেরই গোচরে রয়েছে।

আমির খানের র‍্যাঞ্চো চরিত্রটি উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের স্পষ্ট এক প্রতিচ্ছবি। ওখানের এক দৃশ্যে র‍্যাঞ্চো বোঝাতে চেয়েছিল- মানুষ প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, তারপর ম্যানেজমেন্টে যায়, এরপর ব্যাংকার হয়ে যায় এবং এটাই দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মূল চক্র। বাঙালিদের সঙ্গে মিল রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে।

ভুঁড়ি ভুঁড়ি ডিগ্রি অর্জন করে কিন্তু শেষমেশ সমাজের বোঝা হয় বেকার হয়ে, অর্জিত ডিগ্রি কোনো কাজে আসে না শিক্ষার্থীদের জীবনে।

জীবিকার তাগিদে বেছে নিতে হয় ভিন্ন ভিন্ন পথ যা অর্জিত শিক্ষার সাথে কোনো মিল নেই। আপনারা ভারতীয় লেখক চেতন ভগত তার ‘ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান’ বইটি পড়লে জানতে পারবেন তিনিও ঠিক একই সুরে কথা বলেছেন।

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল ও স্মার্ট বাঙালির সিস্টেম গতানুগতিক ধারার অংশ হয়েই কি চলবে? আপনি আমি কি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এই পরিবর্তনের অংশ হয়ে থাকতে চাইব। আসুন নিজেকে পরিবর্তন করি সিস্টেমের কলকব্জার জং একসময় বিলীন হয়ে যাবে আমাদের মনুষ্যত্ব, মূল্যবোধ ও নৈতিকার বিকাশে। জয় হোক বাঙালির বিবেকবোধের উপযুক্ত পরিচর্চায়।

লেখক: উপশিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর