বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা পরিবেশের বিপর্যয় নিয়ে। এখন আর শীতকালে শীত নেই। এছাড়া যে সময় গরম পড়ার কথা সে সময় গরম নেই। প্রকৃতি মানব সভ্যতার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করছে। আধুনিক নগরায়ন ও আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় নতুন নতুন স্থাপনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে পাহাড় কাটা, গাছ কাটা, নদী ভরাট, জলাশয় ধ্বংস করে বহুতল ভবন নির্মাণে পরিবেশ আজ আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না। বলা হয়ে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে যদি কেউ খারাপ আচরণ করে অর্থাৎ প্রকৃতি ধ্বংস করে তাহলে প্রকৃতি নিজ থেকেই শাস্তি দেয় অর্থাৎ প্রতিশোধ নিয়ে থাকে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন মানব সভ্যতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর অতিরিক্ত প্রযুক্তি পণ্য ব্যবহার করার ফলেই পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ই-বর্জ্য। কেউ কেউ যখন বলছে ই-বর্জ্য মানব সভ্যতা এবং পৃথিবীর জন্য হুমকি তখন এর বিপরীতে কেউ কেউ আবার বলছে ই-বর্জ্য হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের অন্যতম সূতিকাগার।
তার আগে আমাদের জানা দরকার ই-বর্জ্য বলতে আমরা কী বুঝি? (electronic West or E-West) বা পরিত্যক্ত ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্স, নষ্ট মোবাইল হ্যান্ডসেট, কম্পিউটার ল্যাপটপ, টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইস বাসা বাড়িতে ব্যবহার অনুপযোগী ইলেকট্রিক পণ্য এবং এক্সেসরিজ সমূহকে আমরা ই-বর্জ্য বলে থাকি। বর্তমান সময়ে গৃহস্থালি কাজে যেমন কাপড় কাচা থেকে শুরু করে ঘর মোছা রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স পণ্য, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারকন্ডিশন, ছাড়াও একজন ব্যক্তি দুটি মোবাইল ডিভাইস, হেডফোন ল্যাপটপ পাওয়ার ব্যাংকসহ আরও কিছু ডিভাইস প্রতিনিয়ত বহন করে থাকে।
দুদিন আগে ই-বর্জ্যর কার্বন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ শীর্ষক এক কর্মশালায় বলা হচ্ছে দেশে ৩০ লাখ টন ই বর্জ্য তৈরি হয়। (সূত্র: ৪ জন ২০২৩ দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা)। আরও আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী দুই বছর পরেই তা খুঁটি টনের ই-বর্জ্যের ভাগাড় তৈরি করবে।
তাহলে কি আমরা ধরে নেব বাংলাদেশ পরিবেশগত হুমকিতে আছে?
একসময় পরিত্যক্ত জাহাজ যখন চট্টগ্রাম ভাটিয়ারিতে ভাঙ্গা হয় তখন অনেকে বলেছিল পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের অনেক ক্ষতি সাধিত হবে। কিন্তু বাস্তবে এই জাহাজ ভাঙ্গা এখন শিল্পে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি ডলার এই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প থেকে আয় হচ্ছে। দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের যোগান এখন এই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। আমাদের দেশে তিন-চারটে এই বর্জ্য রিসাইকেলিং এর কারখানা গড়ে উঠলেও অনেক কারখানা পর্যাপ্ত এই বর্জ্য কাঁচামালের অভাবে চালাতে পারছে না। আবার ই-বর্জ্যের নীতিমালা এখনো ফাইল বন্দি।
জাপানে অবস্থিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় ‘the global E-waste monitor 2014 quantities, follows and resources’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলেছিল বিশ্বে প্রতি বছর ৪ কোটি টনেরও বেশি ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এই হিসাবে যদি ধরা হয় তাহলে বর্তমানে ২০২৩ সালে হতে পারে প্রায় ৮ কোটি টনেরও বেশি। এই বর্জ্য বিশ্বে উৎপাদিত হয় প্রতি বছর। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের সবচাইতে বেশি এই বর্জ্য উৎপাদন করে থাকে। এই ই-বর্জ্য হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক নতুন পথপ্রদর্শক। এক কোটি টন ই-বর্জ্য রিসাইকেল করে আয় করা সম্ভব প্রায় ১ হাজার ৩শত কোটি ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশে যার পরিমাণ ই-বর্জ্য দুই বছরের মধ্যে দাঁড়াবে তা থেকে কিন্তু এই অর্থ আয় করা সম্ভব।
আসলে কি যে এত অর্থ আয় করা সম্ভব? ই-বর্জ্যে আছে, লোহা, তামা, সোনা, রুপা, অ্যালুমিনিয়াম, পেলাভিয়াম যা থেকে পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী করে আয় করা সম্ভব হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র অনেক শিল্প যেমন গড়ে উঠবে ঠিক তেমনিভাবে প্রচুর বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে এবং বিদেশ থেকে ভাঙ্গা জাহাজ এর মতো ই-বর্জ্য আমদানি করার সুযোগ না দেওয়া হবে ততক্ষণ রিসাইকেলিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে না। যার ফলে যত্রতত্র ই-বর্জ্য পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে তা হবে জনস্বাস্থ্যের জন্য এবং দেশের জন্য হুমকি। পরিবেশও হতে পারে বিপর্যয়ের সম্মুখীন।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, গত ২১ বছরে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন থেকে ১০ হাজার ৫০৪ মেট্রিক টন বিষাক্ত ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। তথ্যসূত্র: ২১ এপ্রিল ২০২৩ the financial express for business standard.
দেশে বর্তমানে ১৭টি হ্যান্ডসেট উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। বিদেশ থেকে আরও প্রায় ২৫ লক্ষ হ্যান্ডসেট আমদানি হয় প্রতি মাসে। প্রতিদিন চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের ব্যবহার উপযোগী ইলেকট্রনিক্স ইলেকট্রিক পণ্যের ব্যবহার বহুমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে ফ্রি সাইক্লিন শিল্প গড়ে ওঠেনি। সরকার যদি দ্রুত এই শিল্প গড়ে তোলে তাহলে একদিকে যেমন পরিবেশ সুরক্ষা হবে আগামী প্রজন্ম সুরক্ষিত হবে পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে দেশ সাবলম্বী হবে এবং অনেকাংশেই বেকার সমস্যার সমাধান হবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন।
টিএই




