মুক্তিযুদ্ধে গ্রামীণ নারী

তাসনোভা জেরিন উলফাত
প্রকাশিত: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৪৭ পিএম
মুক্তিযুদ্ধে গ্রামীণ নারী

অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ব থেকেই গ্রামে রাজনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হয়। গ্রামীণ মেয়েরা দেশের পরিস্থিতিসহ রাজনীতি নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকতেন। যাদের স্বামী শহরে চাকরি করতো তারা ছুটিতে এলে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করতেন তাদের মা, বৌ, বোনদের। মানসিকভাবে নারীরা উন্মুক্ত চিন্তাশীল ছিল। তবে সেই সময়ে নারীরা সর্বক্ষেত্রে মতামত প্রদান করতেন না। শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ নারী জানায় একাত্তরে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। দ্রুত পালানোর সময় হঠাৎ পেটে আঘাত লাগলে রক্তপাত বেশি হতো। প্রচণ্ড পেটের যন্ত্রণায় অনেক নারী নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেনি। তারা অসুস্থতার সময় অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি বিশ্রাম নিতে চাইলেও একাত্তরে তা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নারীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল নাজুক। যুদ্ধের সময়ে পরিবারের কোনো সদস্যদের মনেই শান্তি ছিল না। পরিবারের নারীরা সব সময় চিন্তিতভাবে সময় কাটাতেন। স্বামী ও পরিবারের পুরুষ সদস্য যারা পালিয়ে রয়েছে কিংবা যুদ্ধে গেছেন তারা জীবিতভাবে ফিরে আসবেন কি না এই চিন্তায়। যদি না ফিরে আসে তবে স্বামী ছাড়া কীভাবে শ্বশুর বাড়িতে থাকবেন এই চিন্তায়। যাদের সন্তান ছিল তাদের দুঃচিন্তার পরিমাণ আরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। এসব চিন্তার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিল পুরুষ। তাদের উপার্জিত অর্থ দিয়েই পরিবারের সবার ব্যয় বহন করা হতো। নারীরা তাদের সহযোগী মাত্র। সেক্ষেত্রে পুরুষ সদস্যের অনুপস্থিতিতে পরিবারের অর্থনৈতিক ঝুঁকিসহ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রকার অস্বস্তি কাজ করতো তাদের। তথ্য সংগ্রহে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে কোনো নারীই সাজসজ্জা করেনি। কোনো প্রকার বই পড়েনি। সর্বোপরি ১৯৭১ সালে কোনো প্রকার সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চা করেনি। দিন কাটিয়েছেন সাংসারিক চিন্তা ভাবনায়। মানসিক প্রশান্তির জন্য কোনো প্রকার অনুষ্ঠানে তারা যোগ দেয়নি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেনি তারা। যাদের বাড়িতে বিবাহ উৎসব হয়েছে বলে শুনেছেন সেখান থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতেন। কেননা কোনোভাবে যদি রাজাকার জানতে পারে বাড়িতে উৎসব পালন করছে তবে সেই বাড়ির সকল মহিলাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যেতো। নারীরা নয় মাস মানসিক শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। মুক্তির সংগ্রামের নয় মাসের স্মৃতিচারণে অধিকাংশ নারীর চোখ হয়ে যায় অশ্রুসিক্ত। বর্তমানে অনেক নারীই তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপের জন্য দায়ী করে পাকিস্তানিদের অত্যাচার ও নির্যাতনকে।

কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন গ্রাম জরিপ চালিয়ে উপলক্ষিত হয় যে, কোনো নারীই তৎকালীন সময়ে প্রসূতি সেবা পাননি। বরং গর্ভকাল কাটিয়েছেন পুষ্টিকর খাবারের অভাবে। খাদ্যের যোগান হলে পরিবারের পুরুষ সদস্য ও সন্তানদের দেওয়া হতো। সন্তানসম্ভবা নারীর যে অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা কেউ ভাবতো না। সন্তানসম্ভবা নারীকেও অন্যান্য নারীর মতো না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। মাঠ জরিপে এক নবমাংশ নারীর উত্তর দেয় সেই সময়ে গ্রামে প্রসূতি সেবা নামক কিছু ছিল না বর্তমান সময়ের মতো। সাধারণ নারীর মতোই তাদের দৈনন্দিন সময় কাটতো। গর্ভে সন্তান নিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন অনেক স্থানে। অনেকে গর্ভের সন্তান হারিয়েছেন বারবার স্থান বদলের কারণে। আবার অনেকে নয় মাস কষ্ট করে গর্ভে সন্তান লালন পালন করলেও প্রসব করেছিলেন মৃত সন্তান। অনেক নারী জন্ম দিয়েছেন বিকলাঙ্গ সন্তান। কারণ হিসেবে অধিকাংশ দায়ী করেছেন যুদ্ধের পরিস্থিতিকে।

আমীনা খাতুন সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে গর্ভবতী অবস্থায় অনেক স্থানে পালিয়েছেন। একবার পালানোর সময় গাছের সাথে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে যান। প্রথমে সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছেন বলে ধারণা করলেও পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন তার সন্তান কিছুটা পাগল। সন্তান পাগল হওয়ার পিছনে তিনি দায়ী করেন পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে নিরাপত্তাহীন জীবন যাপনকে। যুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে সন্তানকে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে লালন পালন করেও পরবর্তী সময়ে জানতে পারেন সন্তান পাগল। এই কষ্ট কেবলই তার কাছে কষ্ট নয় বরং মৃত্যু সমতুল্য বলে জানিয়েছেন।

একাত্তরে অনেক নারী সন্তান প্রসব করেছেন রাস্তায়, অপরিচিত এলাকার ঝোপ ঝাড়ে। পাশে থাকা কোনো পথিকের সাহায্য নিয়ে নতুন সন্তান জন্ম দেওয়ার সাথে সাথে সেই অবস্থায়ই আবার পালাতে শুরু করেছেন। কোনো প্রকার বিশ্রামের সুযোগ ছিল না। শাহীদা বেগম জানান, নতুন কাঁথা দূরের কথা পুরাতন কাপড়ও ছিল না সন্তানকে জড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রক্তে ভেজা শাড়ি পরেই পালিয়ে গেছেন বিভিন্ন স্থানে। ১৯৭১ সালে অসংখ্য নারী রয়েছে যারা বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, যা কেবল তাদের নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছে নানাভাবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রত্যেক ঘরের কেউ না কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। বিশেষ করে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। নারীর প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকার পরেও সামাজিক বাধার কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। রাহেলা বেগম জানান, তার বাবা ভাই আওয়ামী লীগ করতো। বাড়িতে প্রায়ই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা হতো। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসতো। দেশের পরিস্থিতি তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন। তিনি পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চান। তার বাবা ও ভাই অসম্মিতি প্রকাশ করে। এবং জানায় মেয়েদের কাজ শুধু মাত্র গৃহের কাজ করা। গ্রামে আক্রমণ শুরু হলে পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মনোয়ারা বেগমের স্বামী পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধের পূর্বে ছুটিতে এসে আর পাকিস্তানে ফেরত যাননি। তার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে। মনোয়ারা বেগমের প্রবল আগ্রহ থাকলেও তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন এবং কোলের ছোট সন্তানকে রেখে যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। যুদ্ধে যোগদান না করেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা করে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন নয় মাসজুড়ে।  স্বাধীনতার পূর্বে রাজাকাররা তাদের বাড়ি সন্ধান করলে তিনি গ্রাম থেকে পালিয়ে যান। বারবার স্থান পরিবর্তনের কারণে ১৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেন। এই জন্য তিনি একাত্তরের পরিস্থিতিকে দায়ী করেন।

আত্মরক্ষার জন্য গ্রামীণ নারীরা অবলম্বন করতো ভিন্ন ধরনের কৌশল। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের কথা শুনলে সুন্দরী নারীরা মুখে কালী মেখে রাখত। পুরাতন জামা কাপড় পরিধান করতো। বাড়িতে পুরুষ না থাকলে কয়েকবাড়ির নারীরা একত্রিত হয়ে দা, ছুরি, কোদাল, মরিচের গুড়া নিয়ে ঘরে অবস্থান করতো। নিজ গৃহ পাহাড়া দিতো। যুবতী মেয়েরা বাড়ির আশেপাশের ঝোপ-ঝাড়ে, জঙ্গলে, পাশের ডোবায়, পুকুরের পানিতে আত্মগোপন করতো। এক একজন নারীর আত্মরক্ষার কৌশল ছিল এক এক রকম। জমিলা খাতুন জানান, আত্মরক্ষার জন্য পুকুরে পানির নিচে কাটিয়েছেন ছয় ঘণ্টা। শুধু মাথা পানির উপরে রেখে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখতেন। আষাঢ় মাসে বৃষ্টির পানিতে খাল বিল পরিপূর্ণ থাকায় সেই সব এলাকায় কম যাতায়াত করতো পাকিস্তানি বাহিনী। তাই নারীরা খাল বিলের আশেপাশে আশ্রয় নিতো। পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারের কাছে নারী ছিল ভোগ্য বস্তু। নারীরা চাইলেও সংসার ত্যাগ করে, সন্তান অথবা পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ করে আত্মরক্ষা করতে পারেনি। তাদের সব সময়ই বাড়ির কাছাকাছি কোথাও আত্মগোপন করতে হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে দেখা গেছে বিভিন্ন গ্রামের নারীরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে মুক্তির সংগ্রামের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করে পরিবারের পুরুষ সদস্যকে যুদ্ধে যোগদানের জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। কুমিল্লার কয়েকটি গ্রামের কিছু শরণার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায় মেয়েরা বেশির ভাগ শরণার্থী শিবিরে রান্না করতো। অনেকে আবার শিবিরের লোকজনের তালিকা প্রণয়নের কাজে সাহায্য করতো।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়