প্রবীণদের মর্যাদা ও সুরক্ষা দিন

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২২, ১১:১৩ এএম
প্রবীণদের মর্যাদা ও সুরক্ষা দিন

অধিকার মানুষের জন্মগত। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে মানুষ অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। আজ লিখছি তাদের অধিকারের কথা, যারা আজ  জীবনের শেষ ধাপে উপনীত। তারা প্রবীণ এবং সমাজের শ্রদ্ধেয় গুরুজন। প্রবীণ ব্যক্তিরাই এ সমাজ ও সভ্যতার রূপকার এবং পৃষ্ঠপোষক। তারা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, বড় ভাই-বোন অন্যান্য। তাছাড়া শিক্ষকমন্ডলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, কৃষক, শ্রমিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা আজ প্রবীণ, দেশের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা অনন্য। কর্মজীবনে তাদের প্রজ্ঞা, মেধা, মনন ও শ্রম নিবেদিত হয়েছে দেশের কল্যাণে এবং প্রত্যেকের ছিল সোনালী অতীত। কিন্তু বার্ধক্য মানব জীবনে এক অবশ্যম্ভাবী অবস্থা, যা তাদেরকে গ্রাস করেছে। জীবনের সবচেয়ে নাজুক ও স্পর্শকাতর এ বার্ধক্য অবস্থা। সমাজের প্রবীণেরাই পরিবার বা সমাজের উন্নয়নে জীবনব্যাপী ভূমিকা পালন করেছে। সমৃদ্ধ হয়েছে দেশ। তাই প্রবীণের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে সমাজের সকলকে।

বিশ্বব্যাপী প্রবীণ সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রবীণ ব্যক্তিরা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবীণ একটি মানবিক ইস্যু এবং সামাজিক সংকট। প্রবীণদের আর্থ-সামাজিক ও মানবিক সমস্যার সমাধানে ১৯৬৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম আলোচনা হয়। ১৯৮২ সালে ভিয়েনায় প্রবীণ বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল প্রবীণ ব্যক্তির অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় উন্নয়নে অবদানের সুযোগ এবং বার্ধক্য সমস্যা পর্যালোচনা করা। ২০০২ সালে  প্রবীণ বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় স্পেনের মাদ্রিদ শহরে। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহের গৃহীত সিদ্ধান্ত ছিল: সকল বয়সীর জন্য উপযুক্ত সমাজ, মৌলিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন জোরদার করা।

১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ১ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা প্রদান করা হয়। প্রবীণ বিষয়ক জাতিসংঘ নীতিমালা প্রণীত হয় ১৯৯১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এ আন্তর্জাতিক দলিলে ১৮টি নীতিমালা গৃহীত হয়। যার মূলনীতিসমূহ: প্রবীণের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, আত্ম-পরিপূর্ণতা এবং আত্ম-মর্যাদা। ১৯৯১ সাল হতে বিশ্বব্যাপী প্রবীণ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এ দিবস পালনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে: প্রবীণ সমস্যা ও বার্ধক্য বিষয়ক সচেতনতা জোরদার করা। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘পরিবর্তীত বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির সহনশীলতা’।

probin

সাধারণ অর্থে প্রবীণ বলতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিকে বুঝায়। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা এবং প্রবীণ বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণা অনুযায়ী ৬০ বছর বা তদুর্ধ্ব ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে প্রবীণ সংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক। প্রবীণ বৃদ্ধির প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয় সমগ্র বিশ্বের চিত্র একই। চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ও প্রবীণ বিষয়ক সচেতনতা জোরদারকরণের ফলে দেশে প্রবীণ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমান প্রবীণ ব্যক্তির সংখ্যা ১.৬০ কোটি। যা মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। জনসংখ্যাবিদদের ধারণা ২০২৫ সালে দেশে প্রবীণের সংখ্যা হবে ২.৮০ কোটি এবং ২০৫০ সালে হবে ৪.৫০ কোটি। ২০৫০ সালে প্রবীণের সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। কোনো দেশের প্রবীণ সংখ্যা যদি মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ হয় তবে ঐ দেশকে বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ বলা হয়। এ হিসেবে বাংলাদেশ এখন বার্ধক্য জনসংখ্যার দারপ্রান্তে।

আমাদের দেশে প্রবীণেরা বহুমুখী সমস্যায় ভোগে। প্রবীণ বা বার্ধক্য মূলত মূল্যবোধ সম্পর্কিত ও জঠিল সামাজিক সমস্যা। দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রভাব, যৌথ পরিবার প্রথা বিলুপ্ত, একক পরিবার গঠন, পারিবারিক দ্বন্ধ, সন্তানদের মধ্যে অনৈক্য, নারীর কর্মসংস্থানের প্রভাবসহ বিবিধ কারণে প্রবীণ সমাজে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। দেশের সমাজব্যবস্থায় পরিবার কাঠামোতে রূপান্তর ঘটছে দ্রুত। ক্রমান্নয়ে মানুষ ব্যক্তি কেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও ভোগবিলাসী হয়ে উঠছে।

গ্রাম-শহর-নগর সর্বত্র একক পরিবারের আধিপত্য। এতে দেশের প্রবীণ ব্যক্তির সমস্যা আরো জটিল হচ্ছে। সর্বত্র প্রবীণের মনের অবস্থান তাদের প্রত্যাশার বিপরীত। সাহায্যহীনতা, বন্ধুহীনতা, একাকীত্ব ও যত্নহীনতায় প্রবীণ জীবন আজ বিপন্ন। প্রবীণ ব্যক্তির আয়-উপার্জন হ্রাস বা না থাকায় তারা দৈনন্দিন ভরণ-পোষণ চালিয়ে নেওয়ার অনিশ্চয়তায় ভোগে। প্রবীণেরা আজ আবাসন সংকটে ভুগছে। নিজ সন্তানেরা প্রিয় পিতা-মাতাকে নিজের সাথে রাখতে চায় না। প্রবীণ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রকার রোগ-শোক, শারীরিক দুর্বলতা, অক্ষমতা, দৃষ্টি শক্তি হ্রাস, শ্রবণ শক্তি হ্রাস, স্ট্রোক, হাপানীসহ বিবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগে।

প্রবীণেরা সমাজের সম্মানিত, শ্রদ্ধাভাজন ও বয়োজেষ্ঠ নাগরিক। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবীণ নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রবীণ ব্যক্তির সুখ, শান্তি, মর্যাদা ও অধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমগ্র বিশ্বে প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জন প্রবীণ নির্যাতনের শিকার। গত কয়েক বছর পূর্বে বিআইডিএস প্রবীণ নির্যাতন বিষয়ে এক জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায় ৫ শতাংশ প্রবীণ শারীরিক নির্যাতনের শিকার এবং ২০ শতাংশ প্রবীণ মানসিক নির্যাতনের শিকার। পিতা-মাতার শারীরিক অক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তাদের সন্তানেরা সহায়-সম্পত্তি জিম্মি করছে। তারা আতঙ্কিত সঞ্চিত সম্পদ ও বসতভিটা নিজ সন্তান কর্তৃক কুক্ষিগত করার ভয়ে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়ে প্রবীণেরা নির্যাতনের শিকার। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত এ সমাজে পুরুষের তুলনায় নারী প্রবীণেরা অধিক নির্যাতিত হয়। এ নির্যাতনের চিত্র ধনী-গরীব, স্বচ্ছল-অসচ্ছল ও শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বত্র বিরাজ করছে। প্রবীণ নির্যাতনের বিষয়টি সমাজে কঠোরভাবে গোপনীয়। আত্মসম্মানবোধের কারণে তা অপ্রকাশিত।

বর্তমান সমাজকল্যাণবান্ধব সরকার। প্রবীণ বা বার্ধক্যকে সরকার একটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রবীণ কল্যাণে বিশেষ উদ্যোগ শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর। প্রবীণ ব্যক্তির সামাজিক নিরাপত্তার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে চালু করা হয় যুগান্তকারী ‘বয়স্কভাতা’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচি দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় সামাজিক নিরাপত্তা কার্মসূচি। 
চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত সুবিধাভোগী ৫৭.০১ লাখ ব্যক্তি এবং ব্যয় ৩৪৪৪.৫৪ কোটি টাকা। দেশের সকল প্রবীণ ব্যক্তির অনুকূলে শতভাগ বয়স্কভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে সমগ্র দেশের ২৮০টি উপজেলার শতভাগ প্রবীণ ব্যক্তি বয়স্ক ভাতার আওতাভুক্ত। তাছাড়া ‘পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন-২০১৩’ এর মধ্যমে প্রবীণের ভরণ-পোষণের আইনগত অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। সরকার ‘প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা-২০১৩’ গ্রহণ করেছে। এতিম শিশু লালন-পালনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারি শিশু পরিবার। এখানে অসহায় প্রবীণের জন্য ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত আছে। রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব ব্যক্তিদের জ্যেষ্ঠ নাগরিক (সিনিয়র সিটিজেন) হিসেবে ঘোষণা করেন।

দেশে প্রথাগত যৌথ পরিবার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হচ্ছে এবং একক পরিবারের বিস্তার ঘটছে। এতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ প্রবীণ ও শিশু। আর্থ-সামাজিকভাবে প্রবীণেরা বিপদাপন্ন, দারিদ্র্যের শিকার ও একাকীত্বে জর্জরিত। হেল্প এইজ ইন্টরন্যাশনাল ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশ প্রবীণ অধিকার সুরক্ষা: চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ’ শীর্ষক একটি একটি গোলটেবিল আলোচনা করা হয়। আলোচনায় অংশীজন প্রবীণ সুরক্ষায় বিবিধ মতামত করেন যথা: প্রবীণ ব্যক্তির জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রবীণ ব্যক্তির জন্য ২৪ ঘন্টা থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ব্যবস্থা, সমবয়সীদের সহচার্য্য ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের কথা বলেন। প্রবীণ কল্যাণে প্রবীণ ফাউন্ডেশন গঠন, সর্বজনীন পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা, পরিবহনে আসন সংরক্ষণসহ বিবিধ প্রস্তাব উত্তাপিত হয় আলোচনা সভায়।

জরুরি অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙ্গন, অগ্নিকাণ্ড ও শৈত্যপ্রবাহসহ যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতি প্রবীণ ব্যক্তির জন্য বিপদজনক। এ ক্ষেত্রে প্রবীণ জনগোষ্ঠী সর্বাধিক ক্ষতির শিকার। বর্তমান বৈশ্বয়িক দুর্যোগ কোভিড-১৯ পরিস্থিতি সমগ্র বিশ্ব মোকাবেলা করছে। এ সময়ে সর্বত্র প্রবীণ ব্যক্তির অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। স্বল্প-নিন্ম আয়ের প্রবীণেরা কর্মহীন, নিঃসঙ্গতা ও বাঁচামরার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। অন্যদিকে নিজ সন্তানেরা যখন কর্মহীন হয় তখন প্রবীণব্যক্তির মধ্যে মানসিক চাপ ও উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। নিজেকে পরিবারের বোঝা ভাবতে শুরু করে। তাই দুর্যোগকালীন ও পরিবর্তিত বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির জীবন সহনশীল করতে হবে। তাঁদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবা, খাদ্যসংকট ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে হবে।

বার্ধক্য বা প্রবীণ একটি জৈবিক অবস্থা। যা মানব জীবনচক্রের শেষ ধাপ ও অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। এ নির্মম বাস্তবতার মুখামুখি সকলকেই হতে হবে। আজ আমাদের মাঝে যারা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে। তারা আমাদের অগ্রজ এবং এ সমাজের স্বার্থক রূপকার। তাদের জীবনব্যাপী আত্মত্যাগের চরম সুবিধাভোগী আমরা। তাই প্রবীণ ব্যক্তির মর্যাদা, অধিকার, সুরক্ষা, কল্যাণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রবীণ ব্যক্তির  প্রতি কোনোরূপ অবজ্ঞা নয়, কোন বৈষম্য নয়। প্রবীণের প্রতি পরম শ্রদ্ধা, মমতা ও ভালোবাসা হোক সকলের অঙ্গীকার। 
     
লেখক: সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদফতর, বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম।