শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: ব্যারাক থেকে রাজপথে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন যাত্রা

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: ব্যারাক থেকে রাজপথে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন যাত্রা

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু তারিখ আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটায় না; একটি জাতির রাজনৈতিক চিন্তা, রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও ভবিষ্যৎ পথচলার ওপরও গভীর ছাপ রেখে যায়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। সেদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ব্যারাক থেকে যে বিদ্রোহের সূচনা, অল্প সময়ের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। সৈনিক ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ইতিহাসে ঘটনাটি পরিচিতি পায় ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ নামে।

কেন এই দিনটি এত আলোচিত? কী ছিল এর পেছনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট? আর স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ কেন এমন এক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫-এর ঘটনাপ্রবাহে।

রাষ্ট্রের জন্ম, স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রটির দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের রায়-প্রতিটি পর্যায়েই পূর্ববাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের সামনে দেখা দেয় নতুন চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা, খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা ছিল বড় দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নও সামনে আসে।

১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন নীতি ও চুক্তি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নানা আলোচনা ও মতপার্থক্য তৈরি হয়। একদিকে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার ঐতিহাসিক বাস্তবতা, অন্যদিকে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বন্ধুত্ব প্রয়োজন, সহযোগিতা প্রয়োজন; কিন্তু তার পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকতে হয় নিজের হাতে। এই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর চার বছরের অস্থিরতা

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের আন্দোলন, সশস্ত্র তৎপরতা এবং রক্ষীবাহিনী কতৃক বিরোধীদের নির্মূলের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হওয়ায় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

১৫ আগস্টের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংকট। তবে রাজনৈতিক অসন্তোষের ব্যাখ্যা কখনোই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতাকে আড়াল করতে পারে না।

৩ নভেম্বর: সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন সংঘাত

১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয়। খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ওপরও নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

একই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান নৃশংসভাবে নিহত হন।

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিসভা, সেনাপ্রধান ও সামরিক নেতৃত্বের বারবার পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। সেনাবাহিনীর মধ্যেও বিভক্তি ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। দেশ কার্যত এক গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের মধ্যে প্রবেশ করে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পেছনে প্রতিবেশি দেশের সমর্থন ছিল এমন ধারণা জনমনে প্রবল গয়ে ওঠে, বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

৬ নভেম্বরের রাত: ব্যারাকের ভেতরে জমে ওঠা ক্ষোভ

৩ নভেম্বরের পর সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদোন্নতি ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন, সামরিক শৃঙ্খলার অবনতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

এই সময় অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাও সক্রিয় ছিল। তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য ছিল প্রচলিত সেনা কাঠামোর পরিবর্তন, অফিসার প্রথা বাতিল করে এবং সৈনিকদের অধিকতর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে, সাধারণ সৈনিকদের একটি বড় অংশ জিয়াউর রহমানের মুক্তি ও সেনাবাহিনীতে নেতৃত্বের সংকটের অবসান চাইছিল।

৬ নভেম্বর গভীর রাতে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিদ্রোহ। ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেই বিদ্রোহ বিস্তৃত হয়। সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। একই সময় খালেদ মোশাররফ ও তার দুই সহযোগী কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন, ধারণা করা হয় তারা তাহের বাহিনীর হাতেই নিহত হয়।

ঘটনাগুলো ছিল দ্রুতগতির, রক্তক্ষয়ী এবং জটিল। এর মধ্যে সৈনিকদের নিজস্ব ক্ষোভ, তাহেরের বিপ্লবী পরিকল্পনা এবং জিয়াউর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দেশের কতৃত্ব গ্রহণের প্রত্যাশা, এমনকি জেনারেল জিয়াকে বন্দি করেও ফেরতে পারতো, কিন্তু কতিপয় সেনা অফিসরের হস্তক্ষেপে সে তৎপরতা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

৭ নভেম্বর: সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক সংহতি

রাতভর টানাপোড়েন শেষে ৭ নভেম্বর সকালে ক্যান্টনমেন্টের গণ্ডি পেরিয়ে সামরিক যান ও সৈনিকরা রাজপথে বেরিয়ে আসেন। সাধারণ মানুষও বিভিন্ন স্থানে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ঢাকার রাজপথে উচ্চারিত হয় ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগান। বহু মানুষের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামরিক বিভক্তির অবসান ঘটানোর প্রত্যাশার প্রকাশ।

গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান আবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ফিরে আসেন। তার জনপ্রিয়তা, মুক্তিযুদ্ধে নায়কোচিত ভূমিকা এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা তাকে ওই সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়, এবং বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন, কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে দেশ বেঁচে যায় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত থেকে।

তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যাবে না। আবার একে একক ও সর্বসম্মত রাজনৈতিক কর্মসূচির ফল বললেও ইতিহাসের জটিলতা আড়াল হবে। সেদিনের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের উদ্দেশ্য এক ছিল না। কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী পরিকল্পনা এবং জিয়াউর রহমানকে আটকে ফেলে দাবি আদায়ের কুটিল খেলাও প্রকাশ পেতে সময় লাগে না।

তবু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং সৈনিকদের সঙ্গে তাদের সংহতি ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। এটি ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষের রাজপথে উপস্থিতির একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। দেশের চরম সংকটময় মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মত সেনা-জনতা একত্র হয়ে ষড়যন্ত্র ও সংকট থেকে দেশ উদ্ধার করে। এ এক অভূতপূর্ব সিপাহী-জনতার বিপ্লব, যা ১৮৫৭ সালের ১১৮ বছর পরে একবারই সংঘটিত হয়েছিল।

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ: দিল্লি থেকে বেইজিং, ওয়াশিংটন থেকে মধ্যপ্রাচ্য

১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তখন বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরুতে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সহযোগীরা। দক্ষিণ এশিয়াতেও ভারত-সোভিয়েত ঘনিষ্ঠতা এবং চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়। একই সঙ্গে চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়।

চীন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে শীতল হয়ে পড়ে।

এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে এর পেছনে শুধু ৭ নভেম্বরের ঘটনা নয়; ১৯৭৫-পরবর্তী সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থ এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিও কাজ করেছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন-পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অন্য একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াও সমাধান নয়। বাংলাদেশের স্বার্থে প্রয়োজন ছিল এবং আজও রয়েছে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা।

জিয়াউর রহমান: সামরিক নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন। তবে সেদিনই তিনি রাষ্ট্রপতি হননি। পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তার রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আলোচিত হয়। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তোলে।

৭ নভেম্বরের শিক্ষা: স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া

১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর-এই কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির অধ্যায়গুলোর একটি। একের পর এক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

৭ নভেম্বর সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এর তাৎপর্য নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্যাও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে নিজের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সামরিক কাঠামো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।

আজ ৭ নভেম্বরের দিকে ফিরে তাকালে শুধু অতীতের আবেগে আটকে থাকলে চলবে না। এই দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে-রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য, পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সশস্ত্র বাহিনী, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ কোনো দেশের করুণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি; এ দেশের স্বাধীনতা এসেছে লাখো মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে। তাই কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে, কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক হবে জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায়, আর রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার নীতিতে।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার সংহতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়। জিয়াউর রহমানের নামও এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক সামর্থ্যে নয়, জনগণের ঐক্য, জাতীয় আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের মধ্যেও নিহিত।

৭ নভেম্বর তাই কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবার দিন।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর