ভোরের আজানের ধ্বনি যখন কুয়াশামাখা আকাশ চিরে মানুষকে নতুন দিনের আহ্বান জানাচ্ছিল, তখন মনে হলো, পৃথিবীর সব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধ হয় একটু স্বস্তি, একটু নিরাপত্তা আর নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার অধিকার। এই পবিত্র জুম্মার সকালে আশুলিয়া ও সাভারের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের কাজে ফেরার খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কয়েক দিনের অস্থিরতা কাটিয়ে কারখানার চাকা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। তবে অশান্তির নেপথ্যে অর্থায়ন ও উসকানির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ২২৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও নজরদারির আওতায় এনেছে। অভিযোগের তদন্ত হোক, অপরাধী শাস্তি পাক; তবে আইনের শাসন যেন অভিযোগ ও অপরাধের পার্থক্যটুকুও ভুলে না যায়। অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরে এক মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে দুই সেনাসদস্যসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল ও গ্রেপ্তারের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এরই মধ্যে ঢাকায় এআই বিজনেস সামিটে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রযুক্তির এই স্বপ্ন অবশ্যই আশাব্যঞ্জক; তবে যে অর্থনীতি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে পারে না, তার কাছে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্নের হিসাব সাধারণ মানুষের কতটা বোধগম্য হবে, সেটিও ভাবার বিষয়।
উন্নয়নের বড় বড় হিসাবের বাইরে আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও যে কত নীরব বিপদ বাসা বেঁধে আছে, তার একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। সস্তা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল তৈরিতে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ ধাতু থেকে সিসা খাদ্যে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যে পাতিলে মা সন্তানের জন্য ভাত রান্না করেন, সেই পাতিলই যদি ধীরে ধীরে বিষের উৎস হয়ে ওঠে, তবে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে সেই বিপদ ঢেকে রাখা যাবে না। জনস্বাস্থ্য, বাজার তদারকি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এদিকে, সামাজিক পরিসরে প্রথম আলোর একটি মাত্র ‘Sorry’ পোস্টও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্পাদকীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পোস্টটি প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। একটি শব্দও যে কখনো দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে এখানে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার চেয়ে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধানই শেষ পর্যন্ত বেশি জরুরি।
আজকের সম্পাদকীয় আলোচনায় কর্মসংস্থানের নতুন ধরন এবং নাগরিক সেবার পুরোনো দুর্ভোগ—দুটি বিষয় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গিগ অর্থনীতিতে তরুণেরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন, কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ করে আয় করছেন। কিন্তু কাজ থাকলেই কি নিরাপদ কর্মসংস্থান হয়? নির্দিষ্ট বেতন, চিকিৎসা সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা ছাড়া এই কর্মজীবনের স্থায়িত্ব কতটুকু? অন্যদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের মতো সাধারণ নাগরিক সেবায় দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একজন নাগরিকের পরিচয় সংশোধনের জন্য দিনের পর দিন দপ্তরে ঘোরার কথা নয়। রাষ্ট্রের সেবা নাগরিকের কাছে পৌঁছাবে, নাগরিককে রাষ্ট্রের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে না—জনপ্রশাসনের সংস্কারের মূল দর্শন হওয়া উচিত এটিই। কাগজে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই সেবা ডিজিটাল হয় না; মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমলেই তার সার্থকতা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্ষমতা, অর্থনীতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন হিসাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অবস্থান এবং কংগ্রেসে তাঁকে অভিশংসনের উদ্যোগ ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ঋণের চাপ, বিপুল ব্যয় এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। মরুর বুকে সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও অর্থনীতির হিসাব শেষ পর্যন্ত আয়, ব্যয় ও দায়ের নিয়মেই চলে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্যও উদ্বেগজনক—বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ এমন দেশে বসবাস করছেন, যেগুলো খরা, বন্যা ও অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন ঘরহারা মানুষের জীবন, খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ক্ষমতার পালাবদল কিংবা সম্পদের আধিপত্যের চেয়ে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি যে কত বড়, এসব ঘটনাই তা মনে করিয়ে দেয়।
ইসলাম আমাদের শেখায়, মানুষের কল্যাণ ছাড়া কোনো উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচার ও সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা আন-নাহল, ১৬:৯০)। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, শিশুর নিরাপদ খাদ্য, শিল্পীর চর্চার সুযোগ, নাগরিকের সহজ সরকারি সেবা কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়—সবই ন্যায় প্রতিষ্ঠার অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাষ্ট্রকে আধুনিক করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেককে যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। জুম্মার এই পবিত্র দিনে আমাদের প্রার্থনা হোক, আল্লাহ যেন দেশকে শান্তি, মানুষের রিজিকে বরকত এবং দায়িত্বশীলদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দেন। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রের গতি বাড়ানো যায়, কিন্তু সেই গতির গন্তব্য ঠিক করে মানুষের বিবেক। আমাদের এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে বুদ্ধিমত্তা কৃত্রিম হতে পারে, কিন্তু শাসন, বিচার ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা কখনো কৃত্রিম হবে না। আমিন। জুম্মা মোবারক।




