বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সবুজ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে দরকার কার্যকর পরিবেশগত সুশাসন

সাইদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

সবুজ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে দরকার কার্যকর পরিবেশগত সুশাসন

সাভারের তরুণ উদ্যোক্তা রাকিব দুই বছর আগে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। তৈরি পোশাক কারখানার কাটিং-ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে তা থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সুতা ও ব্যাগ তৈরি করাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। এতে বর্জ্য কমবে, নতুন কর্মসংস্থানও হবে। কিন্তু শুরুতেই তিনি বাধার মুখে পড়েন। পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য কয়েক মাস এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে। ব্যাংকে গিয়ে জেনেছেন, সবুজ খাতের জন্য আলাদা তহবিল আছে। কিন্তু শাখা পর্যায়ে এ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই, আর জামানতের শর্তও সাধারণ ঋণের মতোই কঠিন। শেষ পর্যন্ত নিজের সঞ্চয় ও আত্মীয়দের ধারের টাকায় তিনি সবুজ এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেন।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে প্রতিযোগিতার বাজারে। কাছেই একটি অনিবন্ধিত রং কারখানা শোধন ছাড়াই বর্জ্য ফেলছে। খরচ কম বলে তাদের পণ্যের দামও কম। ফলে রাকিবের মত নিয়ম মানা উদ্যোক্তা পিছিয়ে পড়ছেন, আর নিয়ম ভাঙা প্রতিষ্ঠান থেকে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে। রাকিবের অভিজ্ঞতা একক নয়। দেশের অনেক সবুজ উদ্যোক্তা একই সংকটে আছেন।

নীতি আছে, বাস্তবায়নে ঘাটতি
পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইন ও নীতির অভাব নেই। রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা, বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন নীতি এবং সবুজ রূপান্তর তহবিল। তৈরি পোশাক খাতে সবুজ কারখানার সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি বদলে দিয়েছে। তবে এই সাফল্যের বড় অংশ এসেছে বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদের মূলধন, ক্রেতার চাপ ও পরামর্শক নিয়োগের সামর্থ্য আছে। ছোট ও নতুন উদ্যোক্তারা এখনো সেই সুবিধার বাইরে।

এখানেই সুশাসনের প্রশ্ন। নীতি কাগজে থাকলেই হয় না। তা সবার জন্য সমানভাবে, স্বচ্ছতার সঙ্গে ও জবাবদিহির মধ্য দিয়ে কার্যকর হতে হয়। সবুজ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কাজ জরুরি।

এক. ঋণ হোক নাগালের মধ্যে
সবুজ তহবিল থাকা এবং তা উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। ব্যাংকের শাখা পর্যায়ে সবুজ ঋণ নিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রচার বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ গ্যারান্টির মতো জামানতের বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা দরকার। কোন ব্যাংক কতজন সবুজ উদ্যোক্তাকে কত ঋণ দিল, সেই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে ব্যাংকগুলোর ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি হবে।

দুই. ছাড়পত্র হোক সহজ ও দ্রুত
পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে অনেক উদ্যোক্তাকেই মাসের পর মাস দৌড়াতে হয়। এই ভোগান্তি কমাতে তিনটি কাজ করা যায়:
- আবেদন, কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ এক জায়গা থেকে থেকে এবং অনলাইনে হতে হবে।
- ছাড়পত্র দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে, যেমন ৩০ দিন।
- আবেদন এখন কোন ধাপে আছে, তা উদ্যোক্তা যেন নিজেই দেখতে পারেন। দেরি হলে কারণও জানতে পারেন।
নিয়ম কড়া থাকুক, কিন্তু প্রক্রিয়া হোক সহজ। এতে উদ্যোক্তার সময় বাঁচবে, আর ঘুষ বা তদবিরের সুযোগও কমবে।

তিন. যে মানে, সে যেন পিছিয়ে না পড়ে
সবুজ উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় হতাশা অসম প্রতিযোগিতা। দূষণকারী প্রতিষ্ঠান শাস্তি না পেলে নিয়ম মানা প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়ে এবং তারা বাজারে টিকতে পারে না। তাই পরিবেশ আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক। জরিমানা এমন হওয়া চাই, যাতে দূষণ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ না থাকে। স্থানীয় মানুষ ও উদ্যোক্তাদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কতদূর হলো, তাও প্রকাশ্যে জানানো উচিত।

চার. বর্জ্য ও পুনর্ব্যবহার খাতকে স্বীকৃতি
আমাদের শহর ও শিল্পাঞ্চলে বর্জ্য আলাদা করা ও সংগ্রহের কাঠামো দুর্বল। পুনর্ব্যবহার খাতের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক, তাই এই খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ, প্রশিক্ষণ বা প্রণোদনা সহজে পান না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও শিল্প কারখানা একসঙ্গে কাজ করলে একটি টেকসই বর্জ্য-সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ও শুল্ক ছাড় এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে।

পাঁচ. প্রযুক্তি ও দক্ষতায় সহায়তা
সবুজ উদ্যোগ শুরু করতে শুধু মূলধন নয়, প্রযুক্তিগত জ্ঞানও লাগে। বর্জ্য শোধন, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্র বা পুনর্ব্যবহার পদ্ধতি সম্পর্কে ছোট উদ্যোক্তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সমিতির সহায়তায় স্বল্পমূল্যে বা বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা চালু করা যায়। এতে নতুন উদ্যোক্তারা ভুল করার ঝুঁকি কমিয়ে দ্রুত দাঁড়াতে পারবেন।

ছয়. সরকারি ক্রয়ে সবুজ পণ্যের অগ্রাধিকার
সরকার দেশের অন্যতম বড় ক্রেতা। সরকারি ক্রয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব পণ্যকে অগ্রাধিকার দিলে সবুজ উদ্যোক্তারা একটি নিশ্চিত বাজার পাবেন। এতে তাঁদের ব্যবসার ঝুঁকি কমবে, ব্যাংকের কাছেও তাঁরা আস্থাশীল গ্রাহক হবেন। কোন পণ্য সবুজ হিসেবে গণ্য হবে, তার মানদণ্ড হতে হবে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য, যাতে 'সবুজ' তকমা অপব্যবহার না হয়।

সাত. সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও জবাবদিহি
সবুজ উদ্যোক্তাকে একসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর, ব্যাংক, শিল্প মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও স্থানীয় সরকারের দুয়ারে যেতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা চলে, ফলে একজনের সিদ্ধান্ত আরেকজনের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি সমন্বয় কাঠামো থাকা দরকার, যারা নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে এবং বছরে একবার প্রকাশ্যে প্রতিবেদন দেবে। কতজন সবুজ উদ্যোক্তা ঋণ পেলেন, কত ছাড়পত্র কত দিনে হলো, তার হিসাব জনগণের সামনে এলে সুশাসন কাগজ থেকে মাঠে নামবে।

সময় এখনই
অপেক্ষার সুযোগ দ্রুত কমছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাজারগুলো কার্বন নিঃসরণ ও টেকসই উৎপাদনের শর্ত কঠোর করছে। ক্রেতারা এখন শুধু দাম নয়, উৎপাদন কতটা পরিবেশবান্ধব, তাও বিবেচনা করেন। যে দেশ এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে, তার রপ্তানি টিকবে। যে পারবে না, সে বাজার হারাবে। সবুজ উদ্যোক্তারা এই রূপান্তরের অগ্রদূত হতে পারেন, নতুন প্রযুক্তি, নতুন পণ্য ও নতুন কর্মসংস্থান নিয়ে।
এই কাজ একা সরকারের নয়। ব্যাংক, শিল্প সমিতি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। তবে পথ তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উদ্যোক্তাদের কাছে বার্তা হতে হবে স্পষ্ট: নিয়ম মানলে ব্যবসা করা সহজ হবে, আর নিয়ম ভাঙলে পার পাওয়া যাবে না।
রাকিবেরা ঝুঁকি নিয়ে নতুন কিছু গড়তে চান। তাঁদের প্রয়োজন অনুগ্রহ নয়, একটি ন্যায্য ও কার্যকর ব্যবস্থা। পরিবেশগত সুশাসন সত্যিই কার্যকর হলে সবুজ উদ্যোক্তারা শুধু নিজেদের নয়, দেশের টেকসই ভবিষ্যৎও গড়ে তুলবেন।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, মাল্টিমিডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়,  মালয়েশিয়া
নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট – সিজিডি
গবেষক- উদ্যোক্তা উন্নয়ন, টেকসই অর্থায়ন ও পরিবেশগত সুশাসন
ইমেইল : [email protected]

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর