বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সংকটের বহুমাত্রিক চিত্র ও আগামীর বাংলাদেশ

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

সংকটের বহুমাত্রিক চিত্র ও আগামীর বাংলাদেশ

ভোর থেকেই দিনটা কেমন যেন অলস আর কুয়াশায় জড়ানো, ঠিক যেমন আমাদের অর্থনীতি আর সামাজিক জীবনের গতিধারা। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট চোখ রাঙিয়ে বলছে, বাংলাদেশের যে 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তির অহংকার ছিল, তা নাকি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ২০৪৫ সালের পর এই তরুণরাই বুড়ো হবে, আর তখন উপযুক্ত কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা আর পেনশনের অভাবে দেশটা পড়বে এক মহা ফাঁপরে।

দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের খবরগুলোও আজ একে অন্যের সঙ্গে বেশ চমৎকারভাবে জড়িয়ে আছে। সাভার-আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত আন্দোলন ও অসন্তোষে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা এখনও থামেনি; সংঘর্ষ, কারখানা বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার প্রশ্ন যেমন বাস্তব, তেমনি দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাতটিকে সচল রাখাও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ। একে কেবল ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা সব দায় এক পক্ষের ওপর চাপানো-কোনোটিই সমাধান নয়; দরকার আলোচনার টেবিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি সেপ্টেম্বরে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি।

বিনিয়োগে এই স্থবিরতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু ও পদ্মা ব্যারাজের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের কথাও বলেছেন। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সড়ক, নালা ও ফুটপাত সংস্কারে ৭১৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। বড় প্রকল্পের স্বপ্ন অবশ্যই থাকুক, তবে তার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উন্নতিও চাই। কারণ সেতু দিয়ে মানুষ নদী পার হয়, কিন্তু মাসের শেষে বাজারের থলে ভরার সামর্থ্য না থাকলে উন্নয়নের আনন্দ অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।

প্রকৃতি ও বাজার-দুটিই যেন আজকাল নাগরিকের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। যশোরের কেশবপুরে খাদ্যসংকটে বুনো কালোমুখো হনুমানের দল লোকালয়ে এসে মানুষের খাবারে ভাগ বসাচ্ছে। বন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের সংকোচন যে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ায়, এই ঘটনা তারই একটি স্থানীয় ছবি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ-সংক্রান্ত খবর জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের ভার্চুয়াল চায়ের দোকানেও আজকাল চায়ের চেয়ে আলোচনা বেশি ফুটছে। ডিমের বাজার, সরকারি তদারকি এবং ডিমের পুষ্টিগুণ নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক; তার সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম তিন হাজার টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে-এমন আশঙ্কা ঘিরে সারজিস আলমের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। ফলে গৃহস্থের দুশ্চিন্তা এখন বেশ সরল: ডিম সেদ্ধ করবেন, না সিলিন্ডারের দাম শুনে পকেট সেদ্ধ করবেন?

এরই মধ্যে চার দিন দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে-এমন একটি ভুয়া সংবাদ কার্ড ছড়িয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশব্যাপী সরবরাহ বন্ধের খবর সঠিক নয়; একটি এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণে সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হতে পারে। গুজবের বাজারে অবশ্য সত্যের দাম সব সময় একটু বেশি।

আজকের লেখায় দুটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবনার দাবি রাখে। প্রথমটি বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর তার সম্ভাব্য চাপ। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালেও খাদ্যপণ্যের দাম ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে; ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা-সবকিছুর ওপরই নজর রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর প্রভাব। দেশের চা উৎপাদন ও গুণগত মান আবহাওয়ার পরিবর্তনে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

চায়ের কাপে ঝড় তোলা আমাদের অভ্যাস, কিন্তু সেই কাপের চা উৎপাদনকারী বাগানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময়ও এসেছে। প্রকৃতি আর বৈশ্বিক অর্থনীতি যেন যুগপৎ চক্রান্তে মেতেছে এই বদ্বীপের বিরুদ্ধে। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির আলো হয়ে এসেছে ইতালির একটি নতুন ঘোষণা-তারা বাংলাদেশিদের জন্য কোটা পদ্ধতির বাইরে এসে সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে অভিবাসনের সুযোগ দিচ্ছে। দেশের মাটিতে যখন তরুণদের ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশাময়, তখন ভূমধ্যসাগরের ওপারের এই ডাক যেন অনেককে নতুন করে স্বপ্ন।

এবার একটু চোখ ফেরানো যাক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, যেখানে ক্ষমতার পাশাখেলা আর যুদ্ধবিগ্রহের দামামা পুরোদমে বাজছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিশ্বজুড়ে টানটান উত্তেজনা ছিল, তাতে দেশটির জনগণ ট্রাম্প ও তার ‘মাগা’ (MAGA) রাজনীতিকে লালকার্ড ধরিয়ে দিয়েছে-সিনেট এবং হাউজে তিনি গো-হারা হেরেছেন ডেমোক্র্যাটদের কাছে। অবস্থা বুঝে আগেভাগেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে ইসরায়েলকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা বন্ধ করা হবে, যদিও অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সামরিক হামলা এবং ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার অগ্রগতির খবরের মধ‍্যেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল সামান‍্য হলেও আশাবাদ তৈরি করেছে। পৃথিবীটা যে এখন সত্যিই ছোট, তা বোঝার জন্য ভূগোলের বই খোলার প্রয়োজন নেই; পেট্রলের দাম বাড়ল নাকি কমলো তা দেখাই যথেষ্ট।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর