নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে যানবাহনের বিকল্প নেই। যে মাধ্যম দিয়ে মানুষ তার নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে সেটিই আবার নিমিষেই শেষ করে দেয় সব আশা-ভরসা আর স্বপ্ন। কেউ দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায় আবার কেউ বিদায় নেন দুনিয়া থেকেই। বেশিরভাগ যানবাহনে এই সতর্কতামূলক লেখাটা দেখা যায়, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি, একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না। চিরন্তন এই সত্যটা যাত্রী কিংবা চালক সবার জন্যই প্রযোজ্য।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সড়কে চলাচলের সময় বেশিরভাগেরই এই কথা নিয়ে ভাববারও সময় নেই। সড়কে নামলে ব্যস্ততা কিংবা তাড়াহুড়ো এতটাই বেড়ে যায় কিছুক্ষণ পরই যে নিজের কিংবা অন্যের জীবনে ঘোর অমানিশা নেমে আসতে পারে সেই চিন্তা বেশিরভাগেরই মাথায় থাকে না।
কর্মব্যস্ত মানুষরা স্বল্প খরচে বেশি দূরত্বের পথ কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের গন্তব্যে যেতে বাসকেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু বাসগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অনিয়ন্ত্রিত গতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছেন সাধারণ মানুষ। কে আগে যাবে, কে বেশি যাত্রী তুলবে, কে অন্য বাসকে পেছনে ফেলবে-এ নিয়েই চলে চালকদের পাল্লাপাল্লি। যাত্রী তোলার জন্য চলন্ত বাসের গতি কমানো, হঠাৎ ব্রেক করা, এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা কিংবা বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং—সবই গণপরিবহনের নিত্যদিনের চিত্র। এই প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের হিসাব মেলে হয়তো চালকদের, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তেই শঙ্কায় যাত্রী-পথচারীদের জীবন।
সড়কে এমন মৃত্যুঝুঁকির খেলা দিনের পর দিন চললেও দেখার কেউ নেই? রাজধানীর সড়ক থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক—কোথাও এই প্রতিযোগিতা থামছে না। এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে অকালেই ঝরেছে অসংখ্য প্রাণও। গত বৃহস্পতিবারের ঘটনা। রাজধানীর রামপুরা ব্রিজে দুই বাসের পাল্লাপাল্লির সময় চাপে পড়ে এক ব্যক্তি নিহত হন।
কর্মস্থলে যেতে বাড্ডা-রামপুরা সড়কে প্রতিদিনই যাতায়াত করি। এ সড়কে বাসের পাল্লাপাল্লির চিত্র নিত্যদিনের। বিশেষ করে একই কোম্পানি যেমন রাইদা, ভিক্টর, অছিম, বৈশাখীসহ অন্যান্য বাসের ঝুঁকিপূর্ণ পাল্লাপাল্লিতে আতঙ্কে থাকতে হয়। তারা এমনভাবে একটা আরেকটাকে পাল্লা দিতে চায়, মনে হয় এই বুঝি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। যখন দ্রুত গতির দুটি বাস ঘেঁষাঘেঁষি করে কিংবা একটি অন্যটিকে ধাক্কা দিয়ে ওভারটেক করতে চায় তখন বাস উল্টে যাওয়ার কিংবা রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণ যাত্রীরা এমন পাল্লাপাল্লি দেখার পর চালকদের বারবার সতর্ক কিংবা চিল্লাচিল্লি করলেও কোনো কাজ হয় না। সেদিকে নজর দেওয়ার যেন সময়ই নেই চালকদের।

প্রতিদিন এমন চিত্র দেখার পর যাত্রীদের অনেকে এখন আর প্রতিবাদও করেন না। আতঙ্ক নিয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে অপেক্ষার প্রহর গুনেন। কারণ কেউ নিজে থেকে মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা না করলে তো অন্যজনে হাজার বললেও কোনো লাভ নেই।
তাছাড়া বাসচালকদের এমন আচরণের পেছনে রয়েছে পরিবহন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলাও। অনেক ক্ষেত্রে ট্রিপ অনুযায়ী চালকদের বেতন, কিংবা যাত্রীসংখ্যার ভিত্তিতে আয় নির্ধারিত হয়। ফলে বেশি যাত্রী সংগ্রহ এবং দ্রুত একাধিক ট্রিপ দেওয়ার তাগিদে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন মালিকদের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং সংশ্লিষ্টদের কার্যকর তদারকির অভাব। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল একজন চালকের অসচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে পুরো পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, সড়কে এসব অনিয়মের চিত্র প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত, অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিছুদিন তৎপরতা দেখা গেলেও পরে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এতে চালক ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা আরও বাড়ছে।
এদিকে সড়কে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি থাকলেই যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে, বাস্তবতা তা বলছে না। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামানো কিংবা অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব যাদের, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়: প্রথমেই বাস পরিচালনার বিদ্যমান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। চালকদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেশি যাত্রী তোলা কিংবা অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়ার জন্য তাদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি না হয়। একই রুটে বাস চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবহন মালিকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পাশাপাশি ট্রাফিক আইন অমান্যকারী চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু চালককে জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; বারবার একই অপরাধে জড়িত বাসের মালিক ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চালনা ও প্রতিযোগিতায় জড়িত বাস শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
**একজন যাত্রী বাসে ওঠেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশায়, চালকের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নয়। অথচ পরিবহন খাতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন সেই নিরাপত্তাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আর কত দুর্ঘটনা ঘটলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে? আর কত মানুষের প্রাণহানি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? বাসের ঝুঁকিপূর্ণ পাল্লাপাল্লি বন্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ সড়কে একটি বাসের কয়েক মিনিট আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতার চেয়ে একটি মানুষের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। **




