রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নভেম্বরের খাতা খুলে-হাসির আড়ালে কিছু দীর্ঘশ্বাস!

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ এএম

শেয়ার করুন:

নভেম্বরের খাতা খুলে-হাসির আড়ালে কিছু দীর্ঘশ্বাস!

কার্তিকের বিদায়বেলায় শীত মহাশয় দরজায় কড়া নাড়ছেন, তবে এখনো ঘরে ঢোকার অনুমতি পাননি। হালকা কুয়াশা, চায়ের কাপ আর রবিবারের কর্মব্যস্ততা—সব মিলিয়ে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস বেশ জমজমাট। পত্রিকার পাতা খুলতেই অবশ্য চায়ের স্বাদ কিছুটা তেতো হয়ে গেল। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ—গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মানবিক বিভাগের প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য। অর্থাৎ মানবিকতা শেখার আগেই পরীক্ষার খাতায় অমানবিক পরিণতি! অকৃতকার্যদের জন্য দুই-এক দিনের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার রুটিন প্রকাশের আশ্বাস এসেছে। ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্নিরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু খাতা আবার দেখলেই কি হবে? শিক্ষাব্যবস্থার খাতাটিও একবার দেখা দরকার।

এদিকে আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ, মজুরি বোর্ডের দাবি এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯.৪ শতাংশ কমেছে। শ্রমিকের পকেট আর মালিকের হিসাব—দুটিই এখন চাপের মুখে। মুশকিল হলো, শিল্পের চাকা ঘোরাতে শ্রমিক লাগে, আর শ্রমিকের সংসার চালাতে লাগে মজুরি। এই অঙ্কে কারও ক্যালকুলেটরই যেন ঠিকমতো কাজ করছে না।

অর্থনীতির খাতায় অবশ্য কিছু আশার খবরও আছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে ব্যাংক খাতের সংস্কার ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে। খেলাপি ঋণের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে এই অর্থ কতটা কাজে আসে, সেটিই দেখার বিষয়। ঋণ নেওয়ার সময় দরজা খোলা, ফেরত দেওয়ার সময় দরজা বন্ধ—ব্যাংকিংয়ের এই পুরোনো কৌতুকটি এবার বন্ধ হওয়া দরকার। অন্যদিকে মাতারবাড়িতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ। সূর্যের আলো বিনা পয়সায় পাওয়া যায়, যদিও সেটিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে বেশ কিছু পয়সা লাগে!

নেটদুনিয়ায় রবিবারের বিনোদনেরও অভাব নেই। ‘বাপের রাস্তা’ নামের নতুন ওয়েব গেম নিয়ে হাসি-ঠাট্টার বন্যা। ঢাকার যানজটে বসে গেমটি খেললে বাস্তব ও ভার্চুয়ালের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন—দুই জায়গাতেই রাস্তা আছে, গতি নেই, আর ধৈর্যের পরীক্ষা আছে। তবে হাসির আড়ালে ঢাকার দুর্দশাটি মোটেই হাস্যকর নয়। দ্য ডেইলি স্টারের ইতিহাস আড্ডায় নগর পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কি রাজধানীকে মানুষের বসবাসের শহর রাখছি, নাকি ইট-কংক্রিটের একটি লাভজনক প্রদর্শনী বানাচ্ছি? আর ক্রিকেটের খাতায় মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে প্রথম টেস্টে আট উইকেটের পরাজয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ রান করে বাংলাদেশ যেন প্রতিপক্ষকে বলেছে, ‘ভাই, আর কষ্ট করবেন না, ম্যাচটি আপনাদেরই থাকল!’ ক্রিকেটপ্রেমীদের চায়ের কাপটি আজ একটু বেশিই ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কথা।

সম্পাদকীয় পাতায় আজ দুটি পুরোনো রোগের ব্যবস্থাপত্র। প্রথমটি রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ ডটকমের ভূমিকা ও টিকিট জালিয়াতি-কালোবাজারি বন্ধে জবাবদিহি। প্রযুক্তি দিয়ে টিকিট কেনা সহজ হয়েছে বটে, কিন্তু যাত্রী যদি টিকিট না পেয়ে কালোবাজারির কাছে যান, তবে সহজ নামের প্রতিষ্ঠানটির কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকেই যায়—সহজ কার জন্য? দ্বিতীয়টি খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর আইনি পদক্ষেপ। ব্যাংকের টাকা জনগণের আমানত; সেটিকে কারও ব্যক্তিগত বাগানবাড়ির পুকুর মনে করার অবকাশ নেই। বড় ঋণখেলাপির জন্য যদি নিয়মের দরজা খোলা থাকে, আর সাধারণ আমানতকারীর জন্য শুধু অপেক্ষার বেঞ্চ, তবে ব্যাংকব্যবস্থার স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি। রোগীর নাম ব্যাংক, কিন্তু ওষুধ খেতে হচ্ছে আমানতকারীকে—এ কেমন চিকিৎসা!

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আবার উত্তেজনা। ইরানের দাবি, কৌশলগত এই অঞ্চলের কাছে কেশম দ্বীপের আকাশে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ড্রোন হারানোর কথা অস্বীকার করেছে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলা থেকে সরে এসেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের মেঘ এখনো কাটেনি; কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে, আর ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কাও রয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে ঢেউ উঠলে তার ধাক্কা বাংলাদেশের বাজারেও লাগে। আমাদের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দামে সেই ঢেউয়ের হিসাব এসে পৌঁছায়। হাজার মাইল দূরের কামানের শব্দও যে ঢাকার বাজারে আলুর দাম বাড়াতে পারে, বিশ্বায়নের এই পাঠ আমাদের নতুন করে পড়ার প্রয়োজন নেই।

নভেম্বরের প্রথম কর্মদিবসে তাই প্রত্যাশার তালিকা খুব দীর্ঘ করার দরকার নেই। শিক্ষার্থীরা যেন নতুন সুযোগ পায়, শ্রমিক যেন ন্যায্য মজুরি পায়, ব্যাংকের টাকা যেন রাঘব বোয়ালদের পেটে না যায়, রেলযাত্রী যেন টিকিট পান, আর ঢাকা যেন অন্তত মানুষের চলাচলের উপযোগী থাকে। এতটুকু হলে নাগরিকেরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন। নতুন মাসে প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজের হিসাবটাই বড় হোক। কারণ ক্যালেন্ডার বদলাতে এক দিন লাগে, মানুষের জীবন বদলাতে লাগে সঠিক সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়ন।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর