শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সম্ভাবনা, সংকট ও বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

শেয়ার করুন:

সম্ভাবনা, সংকট ও বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা

কার্তিকের শেষ প্রান্তে শুক্রবারের সকাল। রাতের শিশিরে প্রকৃতি যখন একটু ধীর, তখন মানুষের জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে পবিত্র দিনটি নিয়ে আসে আত্মসমীক্ষার আহ্বান। জুমার দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব পদে নয়, কাজে; সম্পদে নয়, আমলে; আর রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, নাগরিকের প্রতি ন্যায়বিচারে। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের আদেশ দেন’—সুরা আন-নাহল, আয়াত ৯০। এই আয়াতের আলোয় আজকের বাংলাদেশের খবরগুলো পড়লে দেখা যায়, সম্ভাবনার দরজা যেমন খুলছে, তেমনি কিছু পুরোনো জানালায় এখনো ধুলো জমে আছে।

চার দিনের জাপান সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন আজকের প্রধান রাষ্ট্রীয় সংবাদ। সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর এবং প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে। টোকিওতে বিশাল বিনিয়োগের যে আলোচনা হয়েছে, তার প্রকৃত সাফল্য মাপা হবে আড়াইহাজার কিংবা মাতারবাড়ীতে কতটি কারখানা হলো, কতজন বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হলো এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কত দূর এগোল—সেই হিসাবে। একই দিনে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। অর্থনীতির বর্তমান চাপ বিবেচনায় এটি কিছুটা স্বস্তির অবকাশ; তবে সময় বাড়লেই প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় না। এই অবকাশকে উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির কাজে লাগাতে হবে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘পাওয়ার স্টার্ট’ শুরু হওয়া জ্বালানি নিরাপত্তার পথে নতুন অগ্রগতি। প্রযুক্তির এই বড় আয়োজন যেন নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল ও স্বচ্ছ তদারকির পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীনের বেসরকারি বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য অবশ্য কেবল বিজয়ীর হাসিতে নয়, পরাজিতের অধিকার এবং ভোটারের নির্বিঘ্ন সিদ্ধান্তেও। এদিকে মাটির পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন।  সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপনে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং মহাসড়কগুলোতে এদের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জীবিকার সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার সংঘাতকে কেবল প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একা মেটানো যাবে না; দরকার নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট চলাচলপথ ও বিকল্প জীবিকার বাস্তব ব্যবস্থা। রেলওয়ের টিকিট জালিয়াতি নিয়ে সহজ ডটকমের ওপর তদন্তের খবরও মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল সেবা চালু করলেই সেবা স্বচ্ছ হয় না—জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। আর্থিক খাতের আরেকটি সতর্কসংকেত এসেছে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনায়; একটি ব্যাংকিং সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, খেলাপি ঋণের বড় অংশ ইচ্ছাকৃত। ঋণ যদি ব্যক্তিগত প্রভাবের ঢাল হয়ে ওঠে, তার মাশুল শেষ পর্যন্ত দেয় আমানতকারী ও সাধারণ মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজ সবচেয়ে আলোচিত দুটি বিষয়ও আমাদের একটু থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। সাবেক বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। তাঁর বাবা মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন; পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে তাঁর নাম আগে থেকেই আলোচনায় ছিল, পরবর্তীতে চাকুরি থেকে অব্যাহতি। কিন্তু সেই ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরে একটি ভিডিও নিয়েও তুমুল আলোচনা চলছে। তিনি ভিডিওটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। প্রযুক্তির যুগে একটি ভিডিও মুহূর্তে রায় দিয়ে দিতে পারে, কিন্তু বিচার করার অধিকার আদালতের। ফেসবুকের আদালতে আসামি বানানো সহজ, সত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

আজকের সম্পাদকীয় আলোচনায় দুটি বিষয় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ডেইলি স্টারের আলোচনা। ক্ষমতাসীনদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হলো, পরবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের সম্ভাবনাকেও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখার আহ্বান। ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে কৃত্রিম দেয়াল তুলে দিলে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও মানবিক বিকাশ দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সম্পাদকীয়তে পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনাটিও এসেছে। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি হামলা কিংবা ভয় দেখিয়ে হতে পারে না। রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান না হলে গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হয় না।

বিশ্বের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, ক্ষমতা ও অহমিকার এক মরুময় যুদ্ধক্ষেত্র। শুক্রবারের সকাল শান্তির কোনো সুসংবাদ নিয়ে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি; হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এরমধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে নৌ-মাইনের আঘাতে তিনটি জ্বালানি ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের তাইজ শহরে সংঘাত ও অবরোধে হাসপাতালগুলো ওষুধ, অক্সিজেন ও জ্বালানির সংকটে পড়েছে; সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও খাদ্যপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে উঠছে। এই অশান্তি ও রক্তপাতের পেছনে কাজ করছে মানুষের সীমাহীন লোভ। ঠিক এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনমত যখন ক্রমশ ফুঁসে উঠছে, তখন জরিপগুলো ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্ষমতার এই পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক সংঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী, আর চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব কেবলই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের। এই জুমার দিনে আমাদের প্রার্থনা হোক—পৃথিবীতে ইনসাফ কায়েম হোক এবং মানবতার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর