বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেট: বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাশেম
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেট: বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় করে, অথচ বিশ্বে এর গড় এখন প্রায় ২%। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্যসুবিধা হারালে শুধু কম মজুরি দিয়ে আর চলবে না। তাই এই ব্যবধানের সামান্য অংশ কমানোও দেশের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিমা।

কেন এখনই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি পরিসংখ্যানই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম আরঅ্যান্ডডি জরিপ, ২০২২ অনুযায়ী, মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় (জিইআরডি) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ০.৩৫% থেকে কমে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ০.৩১% এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ০.৩০%-এ নেমেছে। টাকার অঙ্কে এই ব্যয় বছরে প্রায় ৯,৯০০ থেকে ১০,৫০০ কোটি টাকায় স্থির ছিল। মাথাপিছু ব্যয় ছিল প্রায় ৬২০ টাকা।

সরকারও এখন একই কথা বলছে। ২০২৬ সালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একটি শিল্প গবেষণা অনুদান অনুষ্ঠানে বলেন, ০.৩% হার সমপর্যায়ের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নগুলোর একটি। তিনি আরও বলেন, কেবল কম মজুরির ওপর ভর করে প্রতিযোগিতা করা আর টেকসই নয়।

প্রশ্নটা এই নয় যে বাংলাদেশের আরঅ্যান্ডডিতে বেশি ব্যয় করা উচিত কি না। প্রশ্ন হলো, যেসব দেশ এই উল্লম্ফন ঘটিয়েছে, তারা আসলে কী করেছে এবং সেসব পদক্ষেপের কোনগুলো বাংলাদেশের বাজেট ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাপ খায়।

বিশ্বের চিত্র

বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (ডব্লিউআইপিও) গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স দলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে আরঅ্যান্ডডিতে আনুমানিক ২.৮৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০১৫ সালের স্থির পিপিপি অনুযায়ী) ব্যয় হয়েছে, যা ২০০০ সালের প্রকৃত ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ। বিশ্বে আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা ২০০০ সালে জিডিপির ১.৪৮% থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২% হয়েছে।

দুই দৈত্য চীন (৭৮৫.৯ বিলিয়ন ডলার) ও যুক্তরাষ্ট্র (৭৮১.৮ বিলিয়ন ডলার) এখন প্রায় সমান। জাপান অনেক পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে (প্রায় ১৮৬ বিলিয়ন ডলার)। এরপর রয়েছে জার্মানি (১৩২ বিলিয়ন ডলার), দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও ভারত (প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলার)।

এশিয়ার উত্থান

বিশ্ব আরঅ্যান্ডডিতে এশিয়ার অংশ ২০০০ সালের প্রায় ২৩% থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ৪৫%-এ উঠেছে। একা চীন বৈশ্বিক অংশে ২৩ শতাংশ পয়েন্টের বেশি যোগ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৯.৭ এবং জাপানের অংশ ৭.২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

মধ্যম আয়ের দেশগুলোই সবচেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে। ২০০০ সালের পর চীনের ব্যয় প্রায় ২০ গুণ, ইন্দোনেশিয়ার ১২ গুণের বেশি, তুরস্কের প্রায় ১০ গুণ এবং মালয়েশিয়ার পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে।

তীব্রতায় বিরাট বৈষম্য

শীর্ষে রয়েছে ইসরায়েল (জিডিপির ৬.৩৩%) ও দক্ষিণ কোরিয়া (৫.৩২%)। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের হার ৩.৪৫%, জার্মানির ৩.১১% এবং চীনের ২.৬৫%। প্রায় ৭২% দেশ জিডিপির ১%-এর কম এবং ৫৩% দেশ ০.৫%-এর কম ব্যয় করে।

অগ্রগামী দেশগুলোতে খরচ জোগায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ইসরায়েলে আরঅ্যান্ডডির ৯৩% অর্থায়ন করে বেসরকারি খাত। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে এই হার প্রায় ৭৯%, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৮% এবং চীনে ৭৮%। ভারত, মিসর, কেনিয়া ও মেক্সিকোতে বেসরকারি খাতের অংশ ৪০%-এর নিচে।

ধরনটা পরিষ্কার

যেসব দেশ আয়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছে, তারা দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা শুধু রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে গবেষণার বেশিরভাগ ব্যয়ের দায় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বহন করতে বাধ্য করেছে।

যারা এগিয়ে গেছে, তারা কী করেছে

নিম্ন আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা থেকে উচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানো দেশগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকটাই আজকের বাংলাদেশের মতো অবস্থান থেকে, যেখানে গবেষণায় রাষ্ট্রের অর্থায়ন ছিল প্রধান। পরে ধীরে ধীরে গবেষণার ব্যয়ের দায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও স্থানান্তরিত হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া: আগে প্রতিষ্ঠান গড়ো, তারপর শিল্পকে খরচ বহন করতে দাও। ১৯৬২ সালে কোরিয়া আরঅ্যান্ডডিতে জিডিপির ০.২৮% ব্যয় করত, যা আজকের বাংলাদেশের কাছাকাছি। দেশটি ১৯৬৬ সালে কেআইএসটি (KIST) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭০-এর দশকে এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০টি বিশেষায়িত শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। আরঅ্যান্ডডি ব্যয় ১৯৮১ সালে জিডিপির ০.৮১% থেকে বেড়ে ১৯৯৬ সালে ২.৬%-এ পৌঁছায়। একই সময়ে কর-প্রণোদনা এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর (চেবল) গবেষণাগার গড়ে ওঠায় অর্থায়নে সরকারের অংশ ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ৫৩.৫% থেকে কমে ১৯৯০ সালের মধ্যে ১৯.৪%-এ নেমে আসে। ২০২৪ সালে দেশটির আরঅ্যান্ডডি ব্যয় দাঁড়ায় জিডিপির ৫.১৩%-এ এবং গবেষকের সংখ্যা হয় ৬,১৫,০৬৩ জন।

চীন: টানা বড় পরিসরে বিনিয়োগ। চীনের আরঅ্যান্ডডি ব্যয় ২০০০ সালের ৪০.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৭৮৫.৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই ব্যয়ের প্রায় ৭৮% অর্থায়ন করে প্রতিষ্ঠানগুলো (ডব্লিউআইপিও)। এখানকার শিক্ষা হলো ধারাবাহিকতা: অর্থনীতির উত্থান-পতন সত্ত্বেও দুই দশক ধরে প্রতিবছর আরঅ্যান্ডডি-তীব্রতা বাড়ানো হয়েছে।

ইসরায়েল: ঝুঁকি নেয় রাষ্ট্র, বড় করে বেসরকারি পুঁজি। ইসরায়েল জিডিপির ৬.৩৩% আরঅ্যান্ডডিতে ব্যয় করে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এর ৯৩% অর্থায়ন আসে বেসরকারি খাত থেকে। সরকারি অর্থ মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের অনুদান ও ইনকিউবেটরে ব্যয় করা হয়, যা ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে।

ভিয়েতনাম: বাজেটে কঠোর নিয়ম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পলিটব্যুরো রেজল্যুশন ৫৭ গ্রহণ করে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে আরঅ্যান্ডডি ব্যয় জিডিপির ২%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর ৬০%-এর বেশি আসবে অরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে। পাশাপাশি, বার্ষিক রাষ্ট্রীয় বাজেটের অন্তত ৩% বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরে বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ ৬৫.০২ ট্রিলিয়ন ডং (২.৪৭ বিলিয়ন ডলার)। অর্থায়নও সরাসরি বরাদ্দের পরিবর্তে ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। তবে প্রকৃত আরঅ্যান্ডডি ব্যয় এখনো জিডিপির ০.৪%-এর সামান্য বেশি। অর্থাৎ লক্ষ্যটি এখনো অঙ্গীকার, অর্জন নয়।

ভারত: নিবেদিত সংস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি। ভারতের জিইআরডি জিডিপির প্রায় ০.৬৪%-এ আটকে আছে। দেশটি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ANRF) গঠন করেছে। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ১ লাখ কোটি রুপির রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন তহবিল অনুমোদন করেছে। এই তহবিল দ্বিতীয় স্তরের তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে বেসরকারি ডিপ-টেক প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের ঋণ দেবে।

মিসর: নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশও এগোতে পারে। মিসর বিশ্ব আরঅ্যান্ডডিতে তার অংশ ২০০০ সালের ০.১% থেকে ২০২৪ সালে ০.৬%-এ উন্নীত করেছে। দেশটি এখন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের (২০১৫ সালের পিপিপি অনুযায়ী) বেশি ব্যয় করে, যা আফ্রিকায় সর্বোচ্চ (ডব্লিউআইপিও)।

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে

বাংলাদেশের আরঅ্যান্ডডি প্রচেষ্টা সীমিত, রাষ্ট্রনির্ভর এবং মৌলিক বিজ্ঞান ও শিল্প, উভয় ক্ষেত্র থেকেই দূরে।

মাত্রা: সর্বশেষ সরকারি জরিপবর্ষ, ২০২০-২১ অর্থবছরে জিইআরডি ছিল প্রায় ১০,৪৮০ কোটি টাকা বা জিডিপির ০.৩০% (বিবিএস, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সূত্রে)। সিপিডি উদ্ধৃত পরিকল্পনা কমিশনের আরেকটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল জিডিপির মাত্র ০.০৩%। দুই হিসাবের এই ব্যবধানই একটি সমস্যা: নিয়মিত ও সর্বসম্মত কোনো আরঅ্যান্ডডি পরিসংখ্যান নেই।

ব্যয়ের ধরন: ২০২০-২১ অর্থবছরে মৌলিক গবেষণা পেয়েছে মাত্র প্রায় ৯% এবং প্রয়োগিক গবেষণা পেয়েছে প্রায় ৩৮%। কৃষিবিজ্ঞান পেয়েছে প্রায় ৩১%, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ২২% এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তি প্রায় ১৮% (ডেইলি অবজারভার)।

প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় বিনিয়োগই করে না। সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য, বস্ত্র ও অন্যান্য উৎপাদন খাতের মাত্র প্রায় ৩% প্রতিষ্ঠান আরঅ্যান্ডডির জন্য বাজেট রাখে। পোশাক কারখানাগুলো এ খাতে ব্যয় করে তাদের ব্যয়ের প্রায় ২%। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনে শ্রমিকপ্রতি বছরে ৫০০ টাকারও কম ব্যয় করে।

করের কোনো প্রণোদনা নেই বললেই চলে। প্রাতিষ্ঠানিক আরঅ্যান্ডডির জন্য সরকারি কর-প্রণোদনা প্রায় নেই বললেই চলে। ১০০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ দুর্বল।

উদ্ভাবন সূচকে অবস্থান। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫-এ ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম, স্কোর ২১.০। পাকিস্তানের অবস্থান ৯৯তম। ইতিবাচক দিক হলো, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বছরে ৪.৫% হারে বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, যা বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির হারগুলোর একটি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কী করছে

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের আকার ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩.৭%। এই বাজেটে উদ্ভাবনে কিছু অর্থ যোগ করা হয়েছে, কিন্তু পুরো অর্থনীতির জন্য কোনো আরঅ্যান্ডডি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি।

৫০০ কোটি টাকার এআই ও স্টার্টআপ তহবিল: এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকা সরকারের এবং ৩০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আসবে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ ইউজিসির অধীনে কেন্দ্রীভূত: ৫৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিদেশি বৃত্তির জন্য রয়েছে ১২ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের মাত্র প্রায় ০.০২৪%। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাজেটে এবার গবেষণার জন্য আলাদা কোনো খাত নেই, যেখানে গত বছর ছিল ২১ কোটি টাকা। ইউজিসি এখন অর্থ ছাড়ের আগে গবেষণার পরিকল্পনা ও ব্যয়ের প্রাক্কলনসহ প্রস্তাব চাইছে।

বার্ডি (BIRDI) অনুদান: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-সমর্থিত স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (SICIP) আওতায় শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রকল্পে অর্থায়ন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে ১২টি প্রকল্প অনুদান পেয়েছে।

উপকরণগুলো সঠিক ধরনের। সমস্যা হলো এর পরিমাণ: সব মিলিয়েও এগুলো বিশ্ব গড় থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করে রাখা জিডিপির প্রায় ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানের তুলনায় নগণ্য।

সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এশিয়ার একেবারে নিচের সারিতে রয়েছে। ভিয়েতনাম ও ভারতের চেয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ, অথচ ওই দুই দেশের সরকারই নিজেদের আরঅ্যান্ডডি ব্যয়ের হারকে কম বলে মনে করে। ভারতের ০.৬৪%-এ পৌঁছাতে বাংলাদেশের বর্তমান প্রচেষ্টা প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। থাইল্যান্ডের ১.১৬%-এ পৌঁছাতে প্রয়োজন হবে প্রায় চার গুণ ব্যয়।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

তথ্যপ্রমাণ সাতটি পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে। এখানে সবচেয়ে সহজ থেকে সবচেয়ে কঠিন ক্রমে সেগুলো সাজানো হলো।

১. প্রতিবছর সঠিকভাবে পরিমাপ করুন। বিবিএসের আরঅ্যান্ডডি জরিপকে বার্ষিক ও ফ্রাসকাতি ম্যানুয়াল-সম্মত করুন এবং ০.৩০% ও ০.০৩%-এই পরস্পরবিরোধী হিসাবের অবসান ঘটান। কোরিয়া, ভারত ও ভিয়েতনাম-সব দেশই এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা তারা পরিমাপ করতে পারে। যা পরিমাপ করা যায় না, বাংলাদেশ তা পরিচালনাও করতে পারবে না।

২. ধাপে ধাপে প্রকাশ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ হতে পারে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ০.৫% এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১% আরঅ্যান্ডডিতে ব্যয় করা। পাশাপাশি, জাতীয় বাজেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জন্য আইনি ন্যূনতম বরাদ্দ নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেমনটি ভিয়েতনাম ৩% বরাদ্দের নিয়মে করেছে। জিইআরডি ০.২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বছরে মোটামুটি ১৩,০০০ থেকে ১৪,০০০ কোটি টাকা লাগবে (আনুমানিক; বাজেটের ‘জিডিপির ১৩.৭%’ হিসাব থেকে নির্ণীত)।

৩. প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধান অর্থদাতা করুন। আরঅ্যান্ডডিতে কর-অতিরিক্ত বাদ (সুপার-ডিডাকশন) চালু করুন। এশিয়ায় যোগ্য ব্যয়ের ১৫০-২০০% পর্যন্ত কর-ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা প্রচলিত। পাশাপাশি, সমপরিমাণ অনুদান (ম্যাচিং গ্রান্ট) দিন। কোরিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশ অর্ধেকের নিচে থেকে প্রায় ৮০%-এ উঠেছে, মূলত প্রণোদনার কারণে। বার্ডি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, যাকে ১২টি প্রকল্প থেকে শত শত প্রকল্পে সম্প্রসারণ করা দরকার।

৪. একটি প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অর্থায়ন সংস্থা গড়ুন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ছড়ানো-ছিটানো গবেষণা বরাদ্দ একত্র করে একটি জাতীয় গবেষণা ফাউন্ডেশন গঠন করুন। এতে থাকবে পিয়ার রিভিউ, বহুবর্ষী অনুদান এবং যোগ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ। এ ক্ষেত্রে ভারতের ANRF অনুসরণ করা যেতে পারে। এ বছর ইউজিসির তহবিল কেন্দ্রীভূত করা একটি সূচনা। তবে এই উদ্যোগ তখনই কার্যকর হবে, যখন অর্থ যোগ্যতা অনুযায়ী বরাদ্দ করা হবে এবং সময়মতো পৌঁছাবে।

৫. উদ্ভাবকদের ধৈর্যশীল পুঁজি দিন। ৫০০ কোটি টাকার এআই ও স্টার্টআপ তহবিলকে একটি ফান্ড-অব-ফান্ডসে রূপান্তর করুন, যা পেশাদার ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের ঋণ দেবে। ভারতের আরডিআই তহবিল এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে।

৬. বিদ্যমান শক্তির ওপর ভর করুন। কৃষি খাত ইতিমধ্যে আরঅ্যান্ডডির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পায় এবং ধানের জাত উদ্ভাবনে সাফল্য এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে বস্ত্র ও পোশাক প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, আইসিটি এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো ক্ষেত্রগুলো, যেখানে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতা করছে।

৭. শিল্পমুখী গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ুন। কোরিয়ার কেআইএসটি ও এর শাখা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন প্রয়োগিক গবেষণা করত, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তখনো একা করতে পারত না। বিসিএসআইআরকে শক্তিশালী করা এবং বিজিএমইএ, বাপি বা বেসিসের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নে খাতভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একই ভূমিকা পালন করতে পারে।

এর কোনোটির জন্যই কোরিয়ার মতো জিডিপির ৫% ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো, জিডিপির ০.৩% ব্যয়ের পর্যায়ে থাকাকালে কোরিয়া যা করেছিল, তা করা: অঙ্গীকার করা, পরিমাপ করা এবং ধীরে ধীরে গবেষণার ব্যয়ের দায় শিল্পের ওপর স্থানান্তর করা।

উপসংহার

বিশ্ব এখন গবেষণায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে। সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে এশিয়ার মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু আরঅ্যান্ডডি প্রচেষ্টা বছরের পর বছর জিডিপির প্রায় ০.৩%-এ স্থির রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছু কার্যকর উপকরণ যোগ করা হলেও সেই সংখ্যায় পরিবর্তন আসেনি।

বাংলাদেশ যেসব দেশের মতো হতে চায়, তারা ধনী হওয়ার পর গবেষণা শুরু করেনি; বরং গবেষণার মাধ্যমেই ধনী হয়েছে। একটি পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণার ব্যয় বহনে উৎসাহিত করার কর-প্রণোদনা এবং একটি সুপরিচালিত গবেষণা অর্থায়ন সংস্থা-এই তিনটি উদ্যোগ এই দশকের মধ্যেই বাংলাদেশকে সেই পথে এগিয়ে নিতে পারে।

লেখক: পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা

প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর