বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

কূটনীতির সম্ভাবনা, রাজনীতির উত্তাপ ও নাগরিকের প্রত্যাশা

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

কূটনীতির সম্ভাবনা, রাজনীতির উত্তাপ ও নাগরিকের প্রত্যাশা

কার্তিকের সকাল। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, খবরের কাগজে উঠছে আরও কত ধোঁয়া—কোথাও কূটনীতির, কোথাও রাজনীতির, কোথাও আবার মানুষের দীর্ঘশ্বাস। বাংলাদেশের খবর পড়তে বসে আজ মনে হয়, আমাদের জাতীয় জীবনে একই সঙ্গে কয়েকটি ঋতু চলছে। টোকিওতে সহযোগিতার বসন্ত, রাজনীতির উঠোনে উত্তাপ জমেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর এবং দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ-অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ খবর। বিনিয়োগের পরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে এর সুফল মিলতে পারে। তবে ঋণের অঙ্ক দেখে আনন্দিত হওয়ার আগে মনে রাখা ভালো, ঋণচুক্তি উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি করে; উন্নয়ন সম্পন্ন হয় তার সঠিক ব্যবহার, সময়মতো কাজ এবং জবাবদিহির মধ্য দিয়ে।

আজ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরেও নজর থাকবে ভোটকেন্দ্রের দিকে। সকাল আটটা থেকে ভোট গ্রহণ শুরুর খবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পুরোনো অথচ অনিবার্য প্রশ্ন—ভোটের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি ভোটারের নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশের অধিকার। এদিকে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা; নতুন সমঝোতার জন্য ঢাকার তৎপরতা তাই কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার পানি কেবল নদীর প্রবাহ নয়, কৃষকের ফসল, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কেরও প্রশ্ন। আর সাত নভেম্বরকে সামনে রেখে বিএনপির সপ্তাহব্যাপী রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা, সাউথ কেরানীগঞ্জে গ্যারেজ থেকে ককটেল উদ্ধারের খবর—সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে উত্তাপের আভাস দিচ্ছে। ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সহিংসতার দুই দশক পূর্তিতে সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো ছবি ও ভিডিও ঘুরছে, উঠছে বিচারের দাবি। ইতিহাসের ক্ষত নিয়ে আলোচনা হোক, বিচারও হোক; তবে অপরাধের বিচার আর প্রতিশোধের রাজনীতি যেন একাকার না হয়ে যায়। কারণ অতীতের রক্তের জবাব ভবিষ্যতের রক্ত দিয়ে দিতে থাকলে ক্যালেন্ডারের পাতাই শুধু বদলাবে, দেশের অভ্যাস বদলাবে না।

প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়ার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার নয়। হিমালয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত আবাসন বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকীয়গুলোর উদ্বেগ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে হিসাব না মিলিয়ে উন্নয়নের হিসাব মেলানো যায় না। অন্যদিকে, ঢাকায় জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় বিদ্যুৎ ফিরে এলেই মানুষের ক্ষতি মুছে যায় না। মধ্যবিত্তের ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস নষ্ট হলে তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে—প্রশ্নটি ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু নাগরিকের ক্ষতি ছোট বলে রাষ্ট্রের দায়ও ছোট হয়ে যায় না। বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রিড সচল করার সাফল্য জানাবে, আর ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকানোর ব্যবস্থাও ব্যাখ্যা করবে—দুটিই দরকার। এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আলোচিত ভিডিও ধারণকারী বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আগের রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়; ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলের অপেক্ষা। ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দাবি উঠলেও প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার।

ঢাকা বিমানবন্দরে দুবাইফেরত দুই যাত্রীর কাছ থেকে প্রায় ২৪ কোটি টাকা মূল্যের ১২ কেজি সোনার পেস্ট উদ্ধারের খবরটিও আজকের আলোচনায় যথেষ্ট জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে। কাস্টমসের এই অভিযান সফল, কিন্তু একটি চালান ধরা পড়া আর পাচারের পথ বন্ধ হওয়া এক কথা নয়। প্রশ্ন তাই শুধু কত সোনা উদ্ধার হলো, তা নয়; এই বাণিজ্যের পেছনের নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করা গেল কি না। একই সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চালকদের ধর্মঘটের কারণে জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার যে খবর এসেছে, তা আমাদের অগ্রাধিকারের হিসাব নতুন করে দেখতে বলে। হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রোগীর অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন, বিমানবন্দরে পাচার ঠেকাতে দরকার দক্ষ নজরদারি—দুটিই রাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু অসুস্থ মানুষ যখন জরুরি চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করেন, তখন কোনো পক্ষের দাবি-দাওয়ার চেয়ে তাঁর জীবন আগে আসা উচিত। পাবলিক শপিং মলে লুটপাটের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও জনপরিসরে শৃঙ্খলা ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভিডিওটি কোথাকার, কখনকার এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ কী—তা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা ঠিক নয়; তবে লুটপাট প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দূরের পৃথিবীতেও আজ শোক, ক্ষমতার অঙ্ক আর উদ্বেগের সংবাদ। স্পেনে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হওয়ার খবর এসেছে; তদন্তকারীরা দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুতগামী রেল আর উন্নত অবকাঠামো—সবই ব্যর্থ হতে পারে, যদি নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি থাকে এবং সেই ত্রুটির জবাবদিহি না হয়। ইসরায়েলের নির্বাচনী সমীকরণে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার গঠনের হিসাবকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষকে প্রলোভন বা জোরপূর্বক নিয়োগের মাধ্যমে রাশিয়ার যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কাজে পাঠানোর অভিযোগের যে বিবরণ ছড়িয়েছে, সেটিও নির্ভরযোগ্য মূল প্রতিবেদন দেখে যাচাই করা প্রয়োজন। বিদেশে কাজের আশায় যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। আর ফেসবুকে বিনা মূল্যে ত্রুটিপূর্ণ আইফোন বদলে দেওয়ার গল্প যতই আকর্ষণীয় হোক, অ্যাপলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া চলে না। সামাজিক মাধ্যম আমাদের খবর দেয়, কখনো হাসায়, কখনো ক্ষুব্ধ করে; কিন্তু সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্বটি শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ঘোষণায় নয়, নাগরিকের দুঃসময়ে তার আচরণে। যে মানুষটি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন, যে পরিবারটি বিদ্যুৎহীন রাতে নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবারের হিসাব করছেন, কিংবা যে কৃষকটি নদীর পানির দিকে তাকিয়ে পরের ফসলের স্বপ্ন দেখছেন—রাষ্ট্রের সাফল্যের হিসাব তাঁদের জীবন দিয়েই মাপা উচিত। আন্তর্জাতিক চুক্তি দেশের সম্ভাবনা বাড়ায়, রাজনৈতিক কর্মসূচি গণতন্ত্রের পথ তৈরি করে; কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমাতে না পারলে বড় বড় অর্জনের আনন্দও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত নাগরিকেরা রাষ্ট্রের কাছে অসাধ্য কিছু চান না—চান সময়মতো সেবা, ন্যায্য অধিকার এবং বিপদের দিনে দায়িত্বশীল কাউকে পাশে পাওয়া। সরকার বদলায়, ঋতু বদলায়, খবরের কাগজের তারিখও বদলায়; মানুষের এই প্রত্যাশাটুকু যেন বদলাতে না হয়।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর