হেমন্তের এই দিনে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আইএমএফের একটা কড়া হিসাব গিলতে হলো। তাদের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ ফতোয়া দিয়েছে যে, এবার নাকি মাথাপিছু জিডিপিতে আমরা আমাদের চাণক্য-বুদ্ধির প্রতিবেশী ভারতকে টপকে যাব। শুনতে খাসা লাগলেও দেশের বাজারে আলু-পেঁয়াজের দামের যে তেজ, তাতে মনে হচ্ছে পকেটের টাকা জিডিপির খাতা ছাড়া আর কোথাও পাত্তা পাচ্ছে না। এর মধ্যেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাড়ি জমিয়েছেন সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে, জাইকার দরবারে বিনিয়োগের ঝুলি আরও একটু ভারী করার আশায়। অন্যদিকে দেশের রাজনীতির মাঠে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আর সংবিধান সংশোধনীর হাওয়া বইছে-জামায়াত আমির ও জোনায়েদ সাকি সাহেবরা রাজপথে আমজনতাকে অভয় দিচ্ছেন যে, ক্ষমতার মসনদ বদলালেও জনগণের সঙ্গে কোনো চালাকি হবে না!
আইনশৃঙ্খলার ভার কাঁধে নিয়ে আইজিপি সাহেব অপরাধীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন বটে, কিন্তু ক্ষেপেছেন সংসদের বিরোধী দল আর মানবাধিকার কর্মীরা-আবার ক্রসফায়ার! এই ফাঁকে টঙ্গীর এক শিক্ষকের শিশু নিপীড়নের মামলার পর অ্যাটর্নি জেনারেল যখন বলেন, ‘আবেগ নয়, আইনি প্রক্রিয়ায় সব সমাধান করতে হবে’ -তখন আমজনতা একটু নড়েচড়ে বসে বৈকি।
এদিকে উচ্চ মাধ্যমিকের ছেলেমেয়েদের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুয়া নোটিশ ভাইরাল হয়েছে যে, আগামী ২৯ অক্টোবর নাকি এইচএসসির ফল প্রকাশ! শিক্ষা বোর্ড তড়িঘড়ি করে একে মিথ্যা সাব্যস্ত করে জানিয়েছে, প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পাকা তারিখের জন্য আরও কদিন সবুর করতে হবে। তার চেয়ে বরং ঢাকার আইসিসিবি-তে শুরু হওয়া ফার্নিচার মেলায় ঘুরে আসা যাক, যেখানে 'আমার দেশ, আমার স্বপ্ন' স্লোগানে ঘর সাজানোর কাঠের পসরা সাজানো হয়েছে। অন্তত সোফা-আলমারির নকশা দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও বাজারের আগুনদরের কথা ভোলা যায়।
দেশের রাজনীতিতে, মানে এরই মধ্যে, সুখবরের পাশে দুঃসংবাদও চেয়ার টেনে বসেছে। নাটোরের গুরুদাসপুরে হামলার শিকার হওয়ার ১২ দিন পর মারা গেছেন পৌর ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম। পুরানা পল্টনে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার অভিযোগও উঠেছে। রাজনীতির দল আলাদা হতে পারে, মতাদর্শের অভিধানও আলাদা; কিন্তু আহত মানুষের রক্তের রং নিয়ে কোনো দলীয় বিরোধ নেই।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নাগরিকেরা যে জবাবদিহির প্রত্যাশা করছেন, তার পরীক্ষা বক্তৃতামঞ্চে নয়, এমন ঘটনাতেই। অপরাধী যদি নিজের দলের হয়, তখনও আইনকে একই রকম সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। আর সাতক্ষীরা ও রংপুরে গণপিটুনিতে মৃত্যুর খবর মনে করিয়ে দেয়, আমাদের সমাজে বিচারকের পদে আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়েছে, অথচ আইন পড়ার আগ্রহ সবার সমান নয়। সন্দেহ হলেই মারধর, অভিযোগ উঠলেই শাস্তি-এ পদ্ধতিতে আদালতের খরচ বাঁচতে পারে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচে না।
জনতার হাতে লাঠি তুলে দিয়ে রাষ্ট্র যদি নিশ্চিন্তে বসে থাকে, তবে একদিন সেই লাঠি কার মাথায় পড়বে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর নাগরিকের কণ্ঠ জোরালো হয়েছে; এখন দরকার সেই কণ্ঠকে সুশাসন ও আইনের শাসনে রূপ দেওয়া। বিপ্লবের পর মুখোশ বদলানো সহজ, চরিত্র বদলানো কঠিন-এ কথা ইতিহাস বারবার বুঝিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমের আরেকটি রিল-এ দেখা গেল, দুই নারী মিলে দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ করে খোদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে রসালো আরজি জানাচ্ছেন। ডিজিটাল যুগের রসিকতা যে কতটা কড়া হতে পারে, তা দেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আবার কখন ক্ষুব্ধ হয়, সেই আশঙ্কায় নেটিজেনরা কমেন্ট বক্সে সাবধান বাণী লিখছেন। তবে দেশের এই হরেক সংকটের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশটা কিন্তু বেশ মেঘলা। ইরানি ও ইসরায়েলি বাহিনীর ইঁদুর-বেড়াল লড়াইয়ের মাঝে এক বিশ্লেষক মনে করিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা আর নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে না।
তবে এর মধ্যেই তেহরানে তুরস্ক, সৌদি, পাকিস্তান ও ইরানের বৈঠক নাকি নতুন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তার আশা দেখাচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতিতে কখন কে কার বন্ধু আর কে কার শত্রু, তা বোঝা চাটুজ্জে মশাইয়ের পৈতৃক ভিটার সীমানা নির্ধারণের চেয়েও জটিল।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।




