শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দক্ষ জনশক্তি ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঝুঁকিপূর্ণ

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

দক্ষ জনশক্তি ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঝুঁকিপূর্ণ
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল লক্ষ্য কেবল সুদমুক্ত লেনদেনের কাঠামো তৈরি করা নয়; বরং ন্যায়সংগত অর্থায়ন, সম্পদের সুষম ব্যবহার, আমানতকারীদের অধিকার সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে ধরনের জনশক্তি প্রয়োজন, তা তৈরি না করে শুধু ইসলামের নামে ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিস্তার ঘটানো হলে প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি তৈরি হবে- তা অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

শুধু শরিয়াহসম্মত কিছু পদ্ধতির নাম ব্যবহার, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রচার প্রচারণা কিংবা শাখা-উপশাখার সংখ্যার ওপর ইসলামি ব্যাংকিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা, সঠিকতা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে না ; বরং এর পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সততা, পেশাগত দক্ষতা, শরিয়াহবিষয়ক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহির ওপর নির্ভরকরে ইসলামি ব্যাংকিয়ের ভবিষ্যৎ, এর সফলতা ও ব্যর্থতা। ব্যাংকিং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। এখানে সামান্য অবহেলা, অদক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত কিংবা অনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয় শরিয়াহ পরিপালনের অতিরিক্ত দায়িত্ব।

শুধু ইসলামের নামই যথেষ্ট নয়

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রসার গুরুত্বপূর্ণ- সন্দেহ নেই। তবে মনে রাখতে হবে, এই প্রসারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে  দক্ষ জনশক্তি, শক্তিশালী সুশাসন এবং কার্যকর শরিয়াহ তদারকি গড়ে তুলতে না পারলে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা বা প্রচলিত ব্যাংককে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর করা তুলনামূলকভাবে দ্রুত সম্ভব হলেও ইসলামি অর্থায়নের দর্শন, নীতি ও পদ্ধতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা শুধু কঠিন ও জটিল আকারই ধারণ করবেনা বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একটি ব্যাংককে প্রকৃতপক্ষে ইসলামি পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হলে তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুধু প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের নিয়ম কানুন জানলেই চলে না; ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিধিবিধান ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। মুদারাবাহ, মুশারাকাহ, মুরাবাহা, ইজারা, সালাম ও ইস্তিসনার মতো অন্যান্য শরিয়াহ সম্মত চুক্তির প্রকৃতি, শর্ত, ঝুঁকি এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান তাঁদের অবশ্যই তাঁদের থাকতে হবে। একই সঙ্গে হিসাববিজ্ঞান, বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ, গ্রাহক যাচাই এবং ব্যাংকিং আইন সম্পর্কেও তাদের দক্ষতা থাকতে হবে।

বিশেষ করে মুরাবাহার ক্ষেত্রে পণ্য ক্রয়, মালিকানা অর্জন, দখল গ্রহণ, ঝুঁকি বহন এবং পরবর্তী বিক্রয়ের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। মুদারাবা ও মুশারাকার মতো অংশীদারিভিত্তিক অর্থায়নে মুনাফা বণ্টন, ক্ষতি নির্ধারণ, হিসাবের স্বচ্ছতা এবং অংশীদারদের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। চুক্তির নাম ইসলামি হলেই লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়াহসম্মত হয়ে যায় না; বাস্তব কার্যক্রমেও শরিয়াহর সংশ্লিষ্ষ্ট শর্তাবলী পূরণ করতে হবে।

সততা ও দক্ষতা—দুটিই অপরিহার্য

ব্যাংকিং খাতে দক্ষতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সততাও অপরিহার্য। একজন কর্মকর্তা অত্যন্ত দক্ষ হলেও যদি তিনি নীতিবান না হন, তাহলে সেই দক্ষতা অপব্যবহারের মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ঘটাতে পারেন। অন্যদিকে, একজন ব্যক্তি আন্তরিক ও সৎ হলেও যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকলে জটিল বিনিয়োগ, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা শরিয়াহ চুক্তির বাস্তব প্রয়োগে মারাত্মক ভুল করে ফেলতে পারেন।

অতএব, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য সততা ও দক্ষতাকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে উভয় গুণের সমন্বয় অপরিহার্য। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে পেশাগত দায়িত্ববোধ, স্বার্থের সংঘাত (Confict of Interest) এড়ানোর নীতি, সিদ্ধান্তের নথিভুক্তি এবং কার্যকর জবাবদিহি।

ইসলাম আমানত রক্ষা ও যোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের মধ্যে বিচার করার সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা আন-নিসা, ৪:৫৮)। এই নীতির আলোকে ব্যাংকিংয়ের মতো জনআস্থা-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

শুধু ব্যক্তির ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়, আনুষ্ঠানিক সনদ কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং দায়িত্ব দেওয়া হলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বড়সড় আর্থিক দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক জ্ঞান, বাস্তব দক্ষতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও নৈতিক মানদণ্ড যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগের পর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা  খুবই জরুরি।

শরিয়াহ জ্ঞান ও আধুনিক ব্যাংকিং দক্ষতার সমন্বয়

ইসলামি ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ এবং ব্যাংকিং পেশাজীবী—উভয় শ্রেণির মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। একজন ফিকহ বিশেষজ্ঞ চুক্তির শরিয়াহগত বৈধতা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন; অন্যদিকে, ব্যাংকার সেই চুক্তির বাস্তবায়ন, আর্থিক ঝুঁকি, হিসাবরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রক বিধিবিধানের দিকগুলো যথাযথ ভাবে মূল্যায়ন করবেন।

তাই শরিয়াহ বোর্ড, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, অভ্যন্তরীণ শরিয়াহ নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সাধারণ নিরীক্ষা বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা দরকার। শরিয়াহ বোর্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ব্যাংকের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ব্যবস্থাপনার চাপের কারণে শরিয়াহসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রভাবিত না হয়। একই সঙ্গে শরিয়াহ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত জনবল, তথ্য, নথিপত্র ও নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন

ঋণখেলাপি মানেই অপরাধী নয়, পরিস্থিতির শিকারদের চাই বিশেষ বিবেচনা

শুধু শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন থাকলেই ব্যাংকের প্রতিটি লেনদেন বাস্তবে শরিয়াহসম্মত হয়েছে—এমন ধারণা করা বাস্তবসম্মত হবেনা। অনুমোদিত নীতিমালা বাস্তব কার্যক্রমে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ত্রুটি শনাক্ত হলে অনতিবিলম্বে তা সংশোধন, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

নামসর্বস্ব ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিস্তার যদি মূলত ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে গ্রাহক আকর্ষণের কৌশল হয়ে থাকে, তাহলে এর মৌলিক উদ্দেশ্যই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে ইসলামি অর্থায়নের চুক্তিগত পার্থক্য যথাযথভাবে বজায় না রেখে শুধু ব্যাংকিং পণ্যের নাম পরিবর্তন করা হলে শরিয়াহ পরিপালনের বিশ্বাসযোগ্যতা যৌক্তিক কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

banking

একইভাবে, বিনিয়োগ যাচাইয়ে দুর্বলতা, স্বার্থের সংঘাত, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব, বিনিয়োগের অর্থ অনিয়মিত ভাবে বিতরণ এবং জবাবদিহির অভাব ইসলামি ব্যাংকিংকেও প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মতো সমস্যায় ফেলতে পারে। যার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নিকট অতীতেই আমরা দেখতে পাই। এসব ক্ষেত্রে ইসলামি পরিচয় কোনো সুরক্ষাকবচ নয়। বরং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে গ্রাহক ও আমানতকারীরা অতিরিক্ত আস্থা রাখলে অনিয়মের ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ হলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শরিয়াহ পরিপালনকে প্রচারণার বিষয় না বানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে।

জনশক্তি উন্নয়নে করণীয়

প্রথমত, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শাখা ব্যবস্থাপক, বিনিয়োগ কর্মকর্তা, নিরীক্ষক ও ঊর্ধ্বতন নির্বাহী—সবার দায়িত্ব অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রশিক্ষণে শরিয়াহ, হিসাববিজ্ঞান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক বিশ্লেষণ, ব্যাংকিং আইন, গ্রাহক সুরক্ষা ও নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ব্যাংকের পরিচালকদেরকেও তাদের সামাজিক অবস্থান, মর্যাদা ও অন্যান্য দিক বিবেচনায় নিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

বিশ্ববাজারে হালাল অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থান ও বাংলাদেশ

দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণকে শুধু সনদ অর্জনের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা যাবে না। বাস্তব কেস স্টাডি, চুক্তি যাচাই, বিনিয়োগ মূল্যায়ন, অনিয়ম শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলনের মাধ্যমে কর্মীদের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট দায়িত্বের জন্য যোগ্যতা পরীক্ষা ও পর্যায়ক্রমিক পুনঃপ্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ইসলামি অর্থনীতি, ইসলামি ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং প্রযুক্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা বিস্তৃত করা দরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা এবং সেই গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে।

চতুর্থত, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা আনুগত্যের পরিবর্তে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মফলকে গুরুত্ব দিতে হবে। অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা প্রদান এবং দায়িত্ব অনুযায়ী জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

পঞ্চমত, ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ পরিপালন ও আর্থিক সুশাসন সম্পর্কে যথাসম্ভব স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। শরিয়াহ নিরীক্ষার ফল, চিহ্নিত ত্রুটি, সংশোধনমূলক ব্যবস্থা এবং প্রাসঙ্গিক ঝুঁকি সম্পর্কে আমানতকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে। গোপনীয়তা ও আইনগত সীমা বজায় রেখেও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বিস্তারের আগে ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতটি নতুন শাখা খোলা হলো কিংবা কতজন গ্রাহককে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা হলো—শুধু তার ওপর নয়। এর সাফল্য নির্ভর করবে আমানতকারীর অর্থ কতটা নিরাপদ, বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল, চুক্তি কতটা স্বচ্ছ, শরিয়াহ পরিপালন কতটা কার্যকর এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জবাবদিহিমূলক—এসব বিষয়ে।

অতএব, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রসারকে নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং এর বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনশক্তির মান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নত করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। সৎ কিন্তু অদক্ষ, কিংবা দক্ষ কিন্তু অসৎ জনশক্তির ওপর নির্ভর করে টেকসই ইসলামি ব্যাংকিং গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সততা, পেশাগত দক্ষতা, শরিয়াহ জ্ঞান, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর জবাবদিহির সমন্বয়।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত নয়, যার বাহ্যিক পরিচয় ইসলামি হলেও পরিচালনা ও কার্যক্রমে ন্যায়নীতি, আমানত রক্ষা এবং শরিয়াহর মৌলিক উদ্দেশ্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। কারণ, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু একটি ব্যবসায়িক সম্পদ নয়; এটি মানুষের ধর্মীয় আস্থা ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সুতরাং, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো—সৎ, দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক জনশক্তি তৈরি করা। এই ভিত্তি শক্তিশালী না করে শুধু ইসলামের নামে ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঘটানো হলে প্রত্যাশিত সুফল অর্জনের পরিবর্তে শরিয়াহ পরিপালন, আমানতকারীর আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

লেখক: ইসলামি ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকারকর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর