শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ডিজিটাল নিরাপত্তায় রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের করণীয়

মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

শেয়ার করুন:

ডিজিটাল নিরাপত্তায় রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের করণীয়

ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এখন আর যুদ্ধের জন্য কেবল সীমান্ত অতিক্রম করতে হয় না, অর্থনীতি অচল করতে সব সময় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয় না, কিংবা কোনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করতে তার দপ্তরে প্রবেশ করতে হয় না। একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তাহীন ওয়েবসাইট, অসতর্ক কর্মীর একটি ক্লিক কিংবা সফটওয়্যারের একটি অমীমাংসিত ত্রুটি থেকেই সৃষ্টি হতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। সাইবার জগতের এই অদৃশ্য আক্রমণ আজ রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিক—সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের কারণ।

বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। বরং সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ যত বেশি অনলাইননির্ভর হচ্ছে, সাইবার হামলার সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধিও তত বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছি?

ওয়েবসাইট সচল থাকাই কি নিরাপত্তার প্রমাণ?

আমাদের অনেকের ধারণা, কোনো ওয়েবসাইট খুলছে, অনলাইনে লেনদেন করা যাচ্ছে কিংবা সরকারি সেবা সচল রয়েছে—অর্থাৎ সবকিছু নিরাপদ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি ওয়েবসাইট সচল রেখেও আক্রমণকারী তার তথ্যভান্ডার থেকে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে গোপন নথি হাতিয়ে নিতে পারে। আবার কোনো ওয়েবসাইটের চেহারা পরিবর্তন করে, সেবা বন্ধ করে দিয়ে কিংবা তথ্য আটকে রেখে অর্থ দাবি করেও আক্রমণ চালানো সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম, BGD e-GOV CIRT, ২০২৪ সালে ওয়েবসাইট বিকৃত করা, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের দুর্বলতা কাজে লাগানো, তথ্য চুরি, ফিশিং এবং র‍্যানসমওয়্যারসহ বিভিন্ন সাইবার হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। ২০২৫ সালেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো, ব্যাংক ও বিদ্যুৎ খাতকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদেও বৈশ্বিক সফটওয়্যার দুর্বলতা নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকার কথা উঠে এসেছে।

এগুলো আমাদের সামনে একটি বাস্তব শিক্ষা তুলে ধরে—সাইবার নিরাপত্তা কোনো ভবিষ্যৎ আশঙ্কার বিষয় নয়; এটি বর্তমানের ঝুঁকি, যার মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে আগেই। [সূত্র: BGD e-GOV CIRT-এর সতর্কতা ও ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এর সংবাদ প্রতিবেদন]

 একটি সাইবার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ

সাইবার হামলার ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার বা ওয়েবসাইটে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার, জনসেবা এবং জাতীয় নিরাপত্তায়।

ধরা যাক, কোনো ব্যাংকের অনলাইন ব্যবস্থা আক্রান্ত হলো। গ্রাহক লেনদেন করতে না পারলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হবে, জরুরি অর্থপ্রদান আটকে যাবে এবং গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। কোনো হাসপাতালের তথ্যব্যবস্থা অচল হলে রোগীর চিকিৎসাসেবা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিদ্যুৎ বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক আক্রান্ত হলে একাধিক সেবায় একসঙ্গে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

আরও বড় উদ্বেগ ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, আর্থিক লেনদেনের বিবরণ, পাসওয়ার্ড কিংবা পরিচয় যাচাইয়ের নথি অপরাধীদের হাতে গেলে প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক ক্ষতি ও ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ কারণে সাইবার নিরাপত্তাকে কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।

বাংলাদেশের ঝুঁকির জায়গাগুলো কোথায়?

বাংলাদেশের সাইবার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, সরকারি ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সেবা। অনেক ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট তৈরি ও চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে ঘাটতি থেকে যেতে পারে। পুরোনো সফটওয়্যার ও অরক্ষিত ডেটাবেজ আক্রমণকারীদের সুযোগ করে দেয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত।অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-কমার্সের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে প্রবেশ, অ্যাকাউন্ট দখল এবং তথ্য চুরির ঝুঁকিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এখানে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থা জরুরি।

তৃতীয়ত, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সেবাদাতা, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা, ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ—সবকিছুই ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ব্যবস্থার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ আক্রান্ত হলে যোগাযোগ, ব্যবসা ও সরকারি সেবায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতা, গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চতুর্থত, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক ছোট ব্যবসায় পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তাকর্মী, নির্দিষ্ট বাজেট কিংবা নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে না। অথচ তাদের কাছে গ্রাহকের তথ্য, আর্থিক হিসাব ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক নথি সংরক্ষিত থাকতে পারে।

পঞ্চমত, সাধারণ নাগরিক। ভুয়া এসএমএস, প্রতারণামূলক ফোন, নকল ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া বিজ্ঞাপন এবং চাকরি বা পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারকরা মানুষের তথ্য ও অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে। প্রযুক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগানো এই কৌশলও বড় হুমকি।

রাষ্ট্রের করণীয়: প্রতিক্রিয়া নয়, আগাম প্রস্তুতি

সাইবার নিরাপত্তায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল হলো—আক্রমণ ঘটার পর কেবল ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা। একটি কার্যকর জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে থাকতে হবে প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য পুনরুদ্ধার।

প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সম্পদের তালিকা তৈরি করতে হবে। কোন সার্ভারে কী তথ্য রয়েছে, কোন সেবা বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক যুক্ত—এসব তথ্য হালনাগাদ রাখতে হবে। নিয়মিত দুর্বলতা পরীক্ষা এবং অনুমোদিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে বহুধাপ যাচাইকরণ বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করতে হবে। শুধু পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রশাসনিক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার সীমিত করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেট-উন্মুক্ত সেবা বন্ধ রাখতে হবে এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও পরিবর্তনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের এনক্রিপ্ট করা ব্যাকআপ রাখতে হবে। ব্যাকআপ এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে মূল নেটওয়ার্ক আক্রান্ত হলেও আক্রমণকারী সহজে ব্যাকআপ মুছে ফেলতে বা নষ্ট করতে না পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যাকআপ থেকে তথ্য ফিরিয়ে আনার পরীক্ষা করাও জরুরি। শুধু ব্যাকআপ আছে বললেই হবে না; বিপর্যয়ের সময় তা কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা।

চতুর্থত, জাতীয় পর্যায়ে সাইবার ঘটনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় জোরদার করতে হবে। BGD e-GOV CIRT, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় ও দায়িত্ব নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠান যেন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও কারিগরি সহায়তা দ্রুত পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ, গবেষণা, ব্যবহারিক অনুশীলন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু বিদেশি প্রযুক্তি কিনে নিলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সেই প্রযুক্তি পরিচালনা, পরীক্ষা ও সংকট মোকাবিলার দক্ষতাও থাকতে হয়।

 টেলিযোগাযোগ খাতে বিশেষ সতর্কতা কেন জরুরি?

একটি আধুনিক রাষ্ট্রে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক শুধু কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম নয়। ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, হাসপাতাল, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং জরুরি যোগাযোগের বড় অংশ এই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।

তাই মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী যাচাইকরণ, কর্মীদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা, সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তকরণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে।

গ্রাহকের তথ্য কত দিন রাখা হবে, কারা তা দেখতে পারবে, কোন পরিস্থিতিতে তথ্য অন্যের কাছে প্রকাশ করা যাবে এবং তথ্য ফাঁস হলে গ্রাহককে কীভাবে জানানো হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কোনো প্রতিষ্ঠানের ঐচ্ছিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি দায়িত্বশীল সেবা প্রদানের অংশ।

একই সঙ্গে সাইবার হামলার কারণে সেবা বন্ধ হলে গ্রাহককে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া, জরুরি সেবা সচল রাখা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা কার্যকর করা দরকার। নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রাহকের ওপর অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ না করে সুরক্ষা ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

নাগরিকের সতর্কতা: কয়েকটি অভ্যাস বাঁচাতে পারে অর্থ ও তথ্য

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি নাগরিকের কিছু মৌলিক অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।

১. প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। দীর্ঘ ও অনুমান করা কঠিন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে বিশ্বস্ত পাসওয়ার্ড ম্যানেজার কাজে লাগান।

২. দ্বিস্তর বা বহুধাপ যাচাইকরণ চালু করুন। ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর্থিক সেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত যাচাইকরণ ব্যবস্থা রাখুন।

৩. অপরিচিত লিংকে ক্লিক করার আগে যাচাই করুন।ব্যাংক, সরকারি দপ্তর, কুরিয়ার বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো বার্তাও প্রতারণামূলক হতে পারে। প্রেরকের পরিচয় ও ওয়েবসাইটের ঠিকানা যাচাই না করে পাসওয়ার্ড, গোপন কোড বা আর্থিক তথ্য দেবেন না।

৪. ওটিপি, পিন ও যাচাইকরণ কোড কাউকে জানাবেন না। পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়েও কেউ এগুলো চাইলে স্বাধীনভাবে যাচাই করুন।

৫. মোবাইল ও কম্পিউটারের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখুন। অপারেটিং সিস্টেম, ব্রাউজার ও নিরাপত্তা সফটওয়্যারের আপডেট অবহেলা করবেন না। অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা এড়িয়ে চলুন।

৬. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকুন। জন্মতারিখ, পরিচয়পত্রের ছবি, বাসার ঠিকানা, ভ্রমণ পরিকল্পনা কিংবা আর্থিক তথ্য অপরিচিতদের কাছে প্রকাশ করবেন না।

৭. পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। অপরিচিত নেটওয়ার্কে সংবেদনশীল লেনদেন এড়িয়ে চলুন এবং সেবা প্রদানকারীর নিরাপদ সংযোগ ব্যবহার করুন।

৮. গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ রাখুন। ব্যক্তিগত ছবি, নথি ও কাজের ফাইলের নিরাপদ কপি সংরক্ষণ করুন। সম্ভব হলে এমন একটি ব্যাকআপ রাখুন, যা মূল ডিভাইস আক্রান্ত হলেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

৯. প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আর্থিক তথ্য ঝুঁকিতে পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সেবাদাতাকে দ্রুত জানান, প্রয়োজনে অ্যাকাউন্ট ও কার্ড সুরক্ষিত করুন, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানান।

১০. ভুয়া তথ্য বা সন্দেহজনক ফাইল ছড়িয়ে দেবেন না। কোনো সংবাদ, সতর্কবার্তা বা হ্যাকিংয়ের দাবি যাচাই ছাড়া শেয়ার করলে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি বাড়তে পারে।

হামলা ঘটলে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কী করতে হবে?

সাইবার হামলা শনাক্ত হওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত নিজস্ব ইনসিডেন্ট রেসপন্স পরিকল্পনা সক্রিয় করতে হবে। আক্রান্ত সিস্টেমকে প্রয়োজনে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট না করে এবং বিশেষজ্ঞের নির্দেশনা অনুসরণ করে। লগ, সতর্কবার্তা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। পরিষ্কার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করে আক্রান্ত সিস্টেম পুনরায় চালু করা উচিত নয়।

প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হবে, শুধু ওয়েবসাইট সচল করাই ঘটনার সমাপ্তি নয়। আক্রমণকারী কীভাবে প্রবেশ করেছে, কোন তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্য কোনো ব্যবস্থা ঝুঁকিতে আছে কি না এবং একই দুর্বলতা আবার কাজে লাগানো সম্ভব কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক লেনদেন, অ্যাকাউন্ট দখল বা তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু অভিযোগ প্রকাশ করে অপেক্ষা না করে প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পথ অনুসরণ করা জরুরি।
 আইন, জবাবদিহি ও নাগরিকের তথ্যের অধিকার।

সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োজন, কিন্তু শুধু কঠোর আইন থাকলেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। দরকার কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ তদন্ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি। একই সঙ্গে নিরাপত্তার নামে যেন নির্বিচারে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি বা মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করার সুযোগ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের তথ্য ফাঁস ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিককে যথাসময়ে জানানো, ঝুঁকি কমানোর পরামর্শ দেওয়া এবং প্রতিকার পাওয়ার পথ নিশ্চিত করা উচিত। তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য, সংরক্ষণের সময়সীমা, ব্যবহার ও তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে বিনিময়ের নিয়ম স্বচ্ছ হতে হবে। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সঠিক নীতিমালায় তারা একে অন্যকে শক্তিশালী করে।

এখানে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঘটনার পর স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং দায়িত্ব নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি—সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই নীতির মূল কথা হওয়া উচিত: নাগরিকের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করা।

এখনই দরকার জাতীয় সাইবার প্রস্তুতির সংস্কৃতি

বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রাকে নিরাপদ করতে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ সেবার নিরাপত্তা পরীক্ষা ও দুর্বলতা সংশোধনকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাইবার হামলা মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও জাতীয় পর্যায়ে বাস্তব অনুশীলন করতে হবে। তৃতীয়ত, নাগরিক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মীদের জন্য সহজবোধ্য সাইবার সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে।

সরকারকে নীতিমালা ও সমন্বয়ের নেতৃত্ব দিতে হবে; নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে মানদণ্ড ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে তাদের সেবা ও তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে; আর নাগরিককে সচেতন ব্যবহারকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই চারটি স্তরের মধ্যে সমন্বয় না হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা অর্জন কঠিন।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত খরচ নয়, বরং স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, জনআস্থা ও নাগরিক অধিকারের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। আজ একটি দুর্বলতা অবহেলা করলে আগামীকাল তার মূল্য দিতে হতে পারে কোটি টাকার ক্ষতি, গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হওয়া কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য হারানোর মাধ্যমে।

সাইবার হামলাকারী হয়তো অদৃশ্য, কিন্তু তার ক্ষতি দৃশ্যমান। তাই আমাদের প্রস্তুতিও হতে হবে বাস্তব, ধারাবাহিক এবং জবাবদিহিমূলক। নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু প্রযুক্তি বাড়ালেই হবে না—প্রযুক্তির প্রতি আস্থা রক্ষার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর