দিনের আলো প্রতিদিনই নতুন করে পৃথিবীকে দেখায়, কিন্তু মানুষ কি প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে দেখে? খবরের কাগজের পাতায় আজ যে বাংলাদেশের ছবি ফুটে উঠছে, সেখানে সম্ভাবনার পাশে শঙ্কা, মানবিকতার পাশে নিষ্ঠুরতা, আর উন্নয়নের স্বপ্নের পাশে নিরাপত্তার প্রশ্ন। পবিত্র জুমার দিনে মনে পড়ে, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা, আমানতের হেফাজত করা এবং ন্যায়ের পথে থাকা—এসবও ইমানি দায়িত্বের অংশ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ যেন ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বকে, কথার চেয়ে কাজকে এবং প্রতিহিংসার চেয়ে ন্যায়বিচারকে বড় করে দেখতে শেখে।
অর্থনীতির খবরে আশার একটি জানালা খুলেছে জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা। নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে প্রায় ৬.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে জাপানের। এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের অঙ্ক শুনেই আত্মতৃপ্তির অবকাশ নেই; দেখতে হবে কতটা বিনিয়োগ বাস্তবে আসে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং তার সুফল দেশের মানুষের কাছে কতটা পৌঁছায়। এর বিপরীতে, সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার খবর আরেকটি সতর্কবার্তা। আধুনিক অর্থনীতির শক্তি এখন শুধু কারখানা, বন্দর কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সীমাবদ্ধ নয়; তথ্যের নিরাপত্তাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থের পাহারা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার সুরক্ষা।
নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার খবর ঘিরে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মামগামী ফ্লাইট স্থগিত করেছে; রিয়াদগামী ফ্লাইটও ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য দূরবর্তী কোনো যুদ্ধের সংবাদমাত্র নয়। ওই অঞ্চলে কর্মরত অসংখ্য বাংলাদেশির জীবন, পরিবারের উপার্জন এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইয়েমেনের হুথিদের হামলার খবর নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। যুদ্ধের হিসাব কষেন রাষ্ট্রনায়কেরা, কিন্তু তার মূল্য অনেক সময় দিতে হয় সাধারণ মানুষকে—যে মানুষটি শুধু নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে, পরিবারের কাছে ফিরতে কিংবা জীবিকার পথটুকু ধরে রাখতে চায়।
দেশের ভেতরের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সংবাদগুলোর একটি হলো মব জাস্টিস ও গণপিটুনির ভয়াবহতা। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গত ৩৪ মাসে এ ধরনের সহিংসতায় ৮৬৮ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি প্রাণ, একটি পরিবার এবং অপূরণীয় ক্ষতি। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার করবে আদালত—জনতার ক্ষোভ কোনো ব্যক্তিকে বিচারক ও জল্লাদ হওয়ার অধিকার দেয় না। পবিত্র কোরআনের ন্যায়বিচারের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায় থেকে বিচ্যুত না করে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরাই অন্যায় করলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। একই দিনে সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের আলোচনাটি তাই বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়লে আইন একা মানুষের বিবেকের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি ঘটনা যেন একই সমাজের দুই বিপরীত মুখ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রটোকল ভেঙে গাড়ি থেকে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের ভিডিও প্রশংসা পাচ্ছে। মানুষের কাছাকাছি যাওয়া একজন জনপ্রতিনিধির জন্য ইতিবাচক আচরণ; তবে সেই নৈকট্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে জনসেবার ধারাবাহিকতায়। অন্যদিকে, মহাসড়কের পাশের ঝোপ থেকে জীবিত নবজাতক উদ্ধারের খবর মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছে। শিশুটির জন্য মানুষের উদ্বেগ মানবিকতার পরিচয়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কোন অসহায় পরিস্থিতি একটি নবজাতককে এভাবে ফেলে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিল? শিশুটির নিরাপদ চিকিৎসা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন ঘটনার যথাযথ তদন্ত। সমাজের মমতা যেন ক্ষণিকের আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে; অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্থায়ী দায়িত্বে পরিণত হয়। এটাই দয়া, আর দয়ার মধ্যেও রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথ।
‘শিক্ষা ২০৫০: মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন’ শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয়তে ভবিষ্যতের জাতি গঠনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রযুক্তির দক্ষতা ও আধুনিক জ্ঞান প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষকে সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও পরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না করে, তবে তার সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ২০৫০ সালের বাংলাদেশের প্রস্তুতি শুরু হয় আজকের শ্রেণিকক্ষে, পরিবারের আচরণে এবং রাষ্ট্রের নীতিতে।
আজকের সংবাদগুলোর ভেতর দিয়ে একটি কথাই বারবার ফিরে আসে—উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ন্যায়বিচার আলাদা কোনো দ্বীপ নয়; সবকটির কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। বিনিয়োগের অর্থ তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে কাজের সুযোগ আনে। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা দুর্বলকে রক্ষা করে। ধর্মের শিক্ষা তখনই জীবন্ত, যখন তা আমাদের অন্যের অধিকার মানতে, গুজব থেকে দূরে থাকতে এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী না ভাবতে শেখায়। জুমার এই পবিত্র দিনে আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি বাংলাদেশকে শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন, প্রবাসীদের হেফাজত করুন, অসহায় শিশুটির জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুন এবং আমাদের সবাইকে ন্যায়, সংযম ও মানবিকতার পথে পরিচালিত করুন। আমিন।




