বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নম্বরের খাতায় অগ্রগতি, বাস্তবে তার প্রতিফলন কোথায়?

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

নম্বরের খাতায় অগ্রগতি, বাস্তবে তার প্রতিফলন কোথায়?

কার্তিকের সকাল, জানালায় রোদ, হাতে এক কাপ চা। ছুটির দিনে খবরের কাগজ পড়ার সুখই আলাদা। অফিসের ফাইল আজ একটু দূরে থাক, টেলিফোনের জরুরি ঘণ্টাটিও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিক। কাগজ খুলতেই মনে হলো, রাষ্ট্র নামের এই সংসারে প্রত্যেকের হাতে একটি করে নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, শুধু নম্বর পাওয়ার পর কে কী করলেন, তার হিসাব রাখার লোকের বড্ড অভাব। বিশ্বব্যাংক নয়, বিশ্ব বিচার প্রকল্প বা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ২০২৬ সালের আইনশাসন সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১২৩তম। গত বছরের ১২৫তম স্থান থেকে দুই ধাপ এগোনো গেছে। নম্বর বেড়েছে, স্কোরও সামান্য উন্নত হয়েছে; কিন্তু নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানা কিংবা সিয়েরা লিওনের মতো দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকার খবরটি একটু ভাবায়। অবশ্য পরীক্ষায় দুই নম্বর বেশি পাওয়া আনন্দের, তবে পাশের বেঞ্চের ছাত্রের খাতা দেখে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা হয় থানায়, আদালতে, সরকারি দপ্তরে এবং সাধারণ মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে। নাগরিক যদি নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন, বিচার পেতে বছরের পর বছর না ঘুরতে হয়, আর ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই আইন কার্যকর থাকে, তখনই সূচকের নম্বর জীবনের নম্বর হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের নীতিমালায় সরকার অভিজ্ঞতার একটি শর্ত শিথিল করার সুযোগ রেখেছে। বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের ক্ষমতা ও সুনাম থাকলে সংশ্লিষ্ট পদের ঠিক নিচের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত মওকুফ করা যেতে পারে। সিদ্ধান্তটির ভালো-মন্দ নির্ভর করবে প্রয়োগের ওপর। ব্যাংক পরিচালনা কোনো চায়ের দোকানের হিসাব নয় যে দিন শেষে ক্যাশবাক্স মিলিয়ে দিলেই হলো; এখানে আমানতকারীর টাকা, ঋণখেলাপির ঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা এবং হাজার হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ জড়িত। অভিজ্ঞতার শর্তে যুক্তিসংগত নমনীয়তা কখনো যোগ্য প্রার্থীকে সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ যেন পরিচিতির দরজা হয়ে না দাঁড়ায়। নিয়োগে স্বচ্ছ মানদণ্ড, যাচাইযোগ্য কর্মদক্ষতা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি থাকলে পরিবর্তনটি কাজে আসবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চালু করেছে এবং ২৫ অক্টোবর রিয়াদগামী ফ্লাইট পরিচালনার সূচি জানিয়েছে। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। প্রবাসী শ্রমিকের কাছে বিমান মানে আকাশে উড়তে থাকা একটি যন্ত্র নয়; কখনো সেটি বহু মাস পর পরিবারের কাছে ফেরার পথ, কখনো নতুন কাজের আশায় যাত্রা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিয়মিত ফ্লাইট চালু রাখা তাই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মানুষের জীবনের সঙ্গেও জড়িত।

খেলার পাতায় অবশ্য মনটা একটু খারাপ হওয়ার কথা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হারার পর আফগানিস্তানের কাছেও সাত উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। ১৬০ রানের পুঁজি নিয়ে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা কঠিন; আফগানিস্তান ৩৫.৩ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে সমর্থকদের প্রশ্নের অন্ত নেই—কাকে বাদ দেওয়া হবে, কাকে সুযোগ দেওয়া হবে, পুরোনো খেলোয়াড়দের বিকল্প কোথায়? ক্রিকেটের সৌন্দর্য হলো, এখানে ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেয়ে পরের ইনিংসে রান করাই বেশি কার্যকর। ব্যাটারদের টেকনিক, দলের নির্বাচন, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের বোলিং সামলানোর ক্ষমতা নিয়ে খোলামেলা পর্যালোচনা দরকার। এক সিরিজে সব বদলে ফেলতে হবে, এমন নয়; তবে একই ভুল বারবার করে তাকে অভিজ্ঞতা বলা যায় না। তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ, নিয়মিত পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো প্রস্তুতি—এই তিন জায়গায় কাজ করলে সমর্থকেরাও নতুন করে আশাবাদী হওয়ার কারণ পাবেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেক আলোচিত বিষয় যমুনার ইলিশ। মা ইলিশ রক্ষায় ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ জামালপুরের মাদারগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরার এবং স্থানীয় বাজারে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রির খবর এসেছে। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে মাছ ও অবৈধ জাল জব্দও করেছে। এখানে সমস্যার সমাধান শুধু জাল কেড়ে নেওয়া নয়; নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য নির্ধারিত সহায়তা ঠিকমতো পৌঁছানো, নদীতে নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধ মাছ কেনা-বেচার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। জেলে যদি সংসার চালানোর বিকল্প না পান, নিষেধাজ্ঞা তাঁর কাছে জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি দৈনিক আয়ের সংকটও হয়ে দাঁড়ায়। আর ক্রেতা যদি জানেন নিষিদ্ধ সময়ে কেনা ইলিশের দাম দিতে হচ্ছে ভবিষ্যতের মাছ কমিয়ে, তাহলে বাজারের আচরণও বদলাতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগত অর্জন নিয়ে তরুণদের গর্বের আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশের তরুণেরা উদ্ভাবনেও আনন্দ খুঁজে পান। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেলে আনন্দিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে; তবে সেই অর্জনের সত্যতা যাচাই করে তার ব্যবহারিক ফলও দেখা উচিত। প্রযুক্তি যদি কৃষক, শিক্ষার্থী কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাস্তব সমস্যার সমাধান করে, তখন পুরস্কারের মূল্য আরও বাড়ে।

সম্পাদকীয় ও মতামতের পাতায় আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারি সন্তুষ্টি আর মানুষের নিরাপত্তাবোধের মধ্যে দূরত্ব। দ্য ডেইলি স্টার-এর আলোচনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সন্তোষ প্রকাশের বিপরীতে নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রশ্নটি এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতাও মিলিয়ে দেখা চাই। কোথায় ছিনতাই হচ্ছে, কোথায় নারী বা শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, কোথায় অভিযোগ নিয়ে মানুষ থানায় যেতে দ্বিধা করছেন—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা যায়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ে উপসম্পাদকীয় আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশি কর্মীরাও প্রাণ হারিয়েছেন; ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় হাজারো যাত্রীর পরিকল্পনা বিঘ্নিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সমন্বয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প যাত্রাপথের তথ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়া দরকার। নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্টি জানানো সহজ, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করাই কঠিন। আর এই কঠিন কাজটির ফল মানুষ প্রতিদিন অনুভব করতে চান।

আন্তর্জাতিক খবরের পাতায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখন তেলের বাজারেও আগুন ধরাচ্ছে। সৌদি আরবে হুথি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ খবর নিছক বিদেশি বাজারের ওঠানামা নয়; এর প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের খরচ এবং নিত্যপণ্যের দামে পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়, সরবরাহের বিকল্প উৎস এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় নিয়ে আগাম পরিকল্পনা জরুরি। আরেকটি আন্তর্জাতিক বার্তা এসেছে জলবায়ু ও জ্বালানি নীতির দিক থেকে। যুক্তরাজ্য উত্তর সাগরের জ্যাকডাও গ্যাসক্ষেত্রে খননের অনুমোদন দিয়েছে, যদিও পরিবেশবাদীরা এর জলবায়ুগত প্রভাব নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ঘটনাটি দেখায়, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে উন্নত দেশগুলোকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা আছে—জ্বালানির নিশ্চয়তা চাই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দক্ষতা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশগত ঝুঁকিকে বাদ দিয়ে নয়।

ছুটির দিনের শেষে খবরের কাগজ ভাঁজ করতে করতে মনে হয়, রাষ্ট্রের সব সমস্যার সমাধান এক দিনে হবে না, কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধানের দিকে এক ধাপ এগোনো সম্ভব। আইনশাসনের সূচকে দুই ধাপ অগ্রগতি সেই যাত্রার একটি ছোট সংকেত; ব্যাংক নিয়োগে স্বচ্ছতা, সড়কে শিশুদের নিরাপত্তা, ইলিশের প্রজনন রক্ষা এবং প্রবাসীদের নিরাপদ যাতায়াত হতে পারে পরের পরীক্ষাগুলো। ক্রিকেটেও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে আশ্বাস দেওয়া, আর সেই আশ্বাসের পক্ষে প্রমাণ হাজির করা। অর্থাৎ, নম্বরের খাতা নিয়ে বেশি গর্ব করার আগে দেখা দরকার, ছাত্রটি সত্যিই পড়া শিখেছে কি না। বাংলাদেশের উন্নতির হিসাবও তাই শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন দিয়ে মাপতে হবে। চায়ের শেষ চুমুকটুকু খেয়ে আজকের মতো এইটুকু আশা রাখি—আগামী দিনের খবরের কাগজে সমস্যার তালিকার পাশাপাশি সমাধানের খবরও যেন একটু বেশি জায়গা পায়।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর