বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো

মো. মাঈন উদ্দীন
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো
মো. মাঈন উদ্দীন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক মন্থর গতিতে চলছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি এখনো অনেক শ্লথ। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মন্থর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য মূল ইঞ্জিনগুলোকে আবার দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি, অর্থনীতিতে গতি না আসার সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জ্বালানি সংকট। এ সংকট শুধু উৎপাদন ও ব্যবসাকেই ব্যাহত করছে না, বরং পুরো অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। তাই স্থবিরতা কাটাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে, জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিকে গতিশীল ও টেকসই করতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে আমাদের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, সে জন্য একটি নিরাপদ, উপযোগী ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও সহায়তা হবে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

আগামী কয়েক বছরেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জোরালো আভাস নেই। বরং আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ। গত অর্থবছরে সরকারি হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

অর্থনীতিতে যে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানি সংকট, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সবার উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।

অন্যদিকে, সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার-সহায়তায় সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে ভাটাসহ নানা কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গত অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

জাতীয় দারিদ্র্যের হারও টানা চতুর্থ বছর ধরে বেড়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

ব্যাংক খাত ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে মনে করে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বর্তমানে আমাদের দেশে বিনিয়োগের বড় প্রতিবন্ধকতা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। অর্থাৎ, আমাদের দেশে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সব ধরনের জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদের হার। দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য যৌক্তিক সুদের হার নির্ধারণ করা উচিত।

তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি।

চতুর্থ বিষয়টি হলো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি। বিশেষ করে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচার রোধ এবং সঠিক নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। ব্যাংকঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি, ঋণের নিরাপত্তার বিষয়টিও অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে মনে করে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেগুলো যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আস্থা তৈরি করতে হবে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরও বিনিয়োগকারীরা এখনো আস্থা পাচ্ছেন না। এ জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং দেশের স্বার্থে ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম শর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারও করতে হবে।

গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের জন্য গ্যাস, জ্বালানি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে এ সমস্যা সমাধান করতে হলে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হবে। জ্বালানি তেল আমদানি করতে সরকারকে বাড়তি কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। এ জন্য রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। প্রথম দুই মাসে (জুলাই–আগস্ট) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এভাবে অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। বিদ্যুতের অভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে।

এককথায় বলা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এ প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনীতি নানামুখী চাপের মধ্যে পড়বে। অর্থনীতিতে সমস্যা থাকবে, তবে তা উত্তরণের জন্য টেকসই পরিকল্পনাও থাকা চাই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। নতুন খনির অনুসন্ধান করতে হবে। তেল ও গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে

আমাদের দেশে বিনিয়োগের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র রয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি এবং দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা আনতে পারি, তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার
ই-মেইল: [email protected]

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর