বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

জনতার সেবক, নাকি জনতার শাসক?

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪২ এএম

শেয়ার করুন:

জনতার সেবক, নাকি জনতার শাসক?

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নাগরিকদের এ অভিযোগ তো দীর্ঘদিনের যে, সরকারি দফতরে সেবা পেতে গিয়ে প্রায়ই তাদের এমন আচরণের মুখোমুখি হতে হয়, যেন তারা রাষ্ট্রের নাগরিক নন, বরং ক্ষমতাবান কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অনুগ্রহপ্রার্থী। একটি সনদ, কোনো বৈধ কিছুর অনুমোদন, নামজারি, করসংক্রান্ত কাজ, লাইসেন্স কিংবা সাধারণ কোনো প্রশাসনিক সেবা পেতে মানুষকে কখনো অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, দফতরে দফতরে ঘোরাঘুরি এবং পীড়াদায়ক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়। এমন অভিযোগও অনেক সেবাপ্রার্থীর মুখে শোনা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাজনৈতিক ও অর্থের প্রভাব বেশি কার্যকর।

তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এমন নন। সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে নিরলসভাবে নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন-এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের অবদান অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু কিছু দফতরে নাগরিকের প্রতি কর্তৃত্বমূলক আচরণ, জবাবদিহির ঘাটতি এবং সেবা প্রদানে অনীহার যে অভিযোগ রয়েছে, তাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বলতে দ্বিধা নেই, প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কার্যকারিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে ইতিমধ্যে এ ধারণা প্রবল হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশের আমলারা কি সত্যিই সিভিল সার্ভেন্ট-অর্থাৎ জনগণের সেবক নাকি তারা নাগরিকদের শাসক, আর নাগরিকেরা তাদের নির্দেশ পালন করতে বাধ্য?

‘Civil Servant’ শব্দটির মধ্যেই একটি মৌলিক দায়িত্বের পরিচয় রয়েছে। তারা জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রের কর্মচারী এবং আইনসম্মতভাবে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাঁদের ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব। এই ক্ষমতা ব্যবহারের উদ্দেশ্য নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং আইন অনুযায়ী নাগরিকের অধিকার ও জনস্বার্থ রক্ষা করা।

কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক নিজের পদকে জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত মর্যাদা, প্রভাব কিংবা কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা শুধু অনৈতিকই নয় বরং সরকারি চাকুরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নাগরিকের প্রশ্নকে বিরক্তি হিসেবে দেখা, সাধারণ আবেদনকারীকে তুচ্ছজ্ঞান করা, কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য না দেওয়া কিংবা বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে অযৌক্তিক বিলম্ব করা-এসব আচরণ সেবামূলক চরিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

একজন কর্মকর্তা আইন প্রয়োগ করবেন, প্রয়োজনে নাগরিকের কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যানও করবেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে; কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আপিল বা প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের সংকট বুঝতে হলে প্রশাসনিক কাঠামোর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারও বিবেচনায় নিতে হবে। উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের সময় প্রশাসনের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শাসকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আদায় এবং শাসিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রশাসনের দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তা হলো- জনগণের কল্যাণ, অধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রের পতাকা বদলালেই প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। পদমর্যাদাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা, দাপ্তরিক প্রক্রিয়াকে নাগরিকের সুবিধার চেয়ে বড় করে দেখা এবং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত মনে করা-এসব প্রবণতা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক মানসিকতার ধারাবাহিকতার ফসল।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও যদি একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি দফতরে প্রবেশ করে নিজেকে অসহায় মনে করেন, তাহলে তা শুধু কোনো ব্যক্তির আচরণগত সমস্যা নয়; প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তবে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারকে সব সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে চলবে না। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, জটিল আইন ও বিধি, অদক্ষ প্রক্রিয়া, স্বার্থের সংঘাত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাও সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। নির্বাচিত সরকার নীতি নির্ধারণ করে, আর প্রশাসন সেই নীতি আইন ও বিধি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করে। প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, পেশাগত দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা রাষ্ট্রকে ধারাবাহিকতা দেয়। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানই যদি যথাযথ জবাবদিহি ছাড়া পরিচালিত হয়, তাহলে প্রশাসনিক ক্ষমতা নাগরিকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কোনো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা স্পষ্ট নয়, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা জানা যায় না, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে তা বোঝা যায় না, কিংবা আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয় না-এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকের পক্ষে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা শুধু কঠিনই নয় ; ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে যদি ব্যবসার অনুমোদনের জন্য বারবার অফিসে যেতে হয়, তাহলে তাঁর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। একজন কৃষক জমির কাগজপত্র নিয়ে হয়রানির শিকার হলে তার উৎপাদন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একজন অসুস্থ মানুষ বা বয়স্ক নাগরিককে একটি সাধারণ সেবার জন্য বারবার সরকারি দপ্তরে হাজির হতে হলে তার শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়িক অনুমোদন ও সরকারি ক্রয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ প্রশাসনিক অদক্ষতা কেবল নাগরিকের বিরক্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৫ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদনের কথা জানায়। এর আওতায় পরিসংখ্যান, রাজস্ব প্রশাসন, সরকারি ক্রয়, পরিকল্পনা এবং নিরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং জনআস্থা বৃদ্ধিও রয়েছে। এটি দেখায়, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি সেবার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। বিশেষ করে কোনো বৈধ কাজ সম্পন্ন করতে অঘোষিত অর্থ দাবি, দালালের মাধ্যমে কাজ করানোর চাপ, প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশের ওপর নির্ভরতা কিংবা নিয়মের বাইরে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের ব্যবস্থা করাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

দুঃখজনক বিষয় হলো, যখন নাগরিক অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পান না, অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারেন না, কিংবা অভিযোগ করার কারণে হয়রানির আশঙ্কা করেন। এরূপ অবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে জনগণ কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে অনিয়মের সুযোগ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সরকারি সেবা কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। নাগরিক আইন অনুযায়ী যে সেবা পাওয়ার অধিকারী, তা তাকে নিয়ম মেনে দিতে হবে। সেবা দেওয়ার বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করা হলে তা শুধু নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনগত অপরাধও হতে পারে।

এখানে মনে রাখা দরকার, দুর্নীতি শুধু ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পদের অনিয়মিত ব্যবহার, স্বার্থের সংঘাত এবং অযৌক্তিকভাবে কাউকে সুবিধা দেওয়ার মতো বিষয়ও প্রশাসনিক সততা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা নির্বাচিত সরকারের বৈধ নীতি বাস্তবায়ন করবেন-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারি কর্মচারীর পেশাগত সিদ্ধান্ত যদি আইন ও জনস্বার্থের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পেলে অন্য নাগরিক বঞ্চিত হন। কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট রাখাকে  সাফল্যের প্রধান শর্ত মনে করলে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্বকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।  আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করার প্রবণতাও পেশাদার জনপ্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর।

এ কারণে প্রশাসনকে একদিকে রাজনৈতিক নির্দেশনার সাংবিধানিক ও আইনগত সীমার মধ্যে কাজ করতে হবে, অন্যদিকে অবৈধ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার পেশাগত সততা, সাহসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও থাকতে হবে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চাকরির নিরাপত্তা প্রয়োজন, যাতে তারা বেআইনি চাপের কাছে নতি স্বীকার না করেন। কিন্তু সেই নিরাপত্তা যেন জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল না হয়ে ওঠে। ন্যায়সংগত চাকরির সুরক্ষা এবং অনিয়মের জন্য দায়বদ্ধতা-দুটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো সরকারি কর্মকর্তা নাগরিকের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। অবশ্যই প্রশাসনিক কাজের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার অজুহাতে নাগরিককে প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত করা কিংবা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা না দেওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

নাগরিক জানতে চাইতে পারেন-তার আবেদন কেন আটকে আছে, কোন বিধির কারণে কাজটি হচ্ছে না, কোন কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত, কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা এবং প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে কোথায় প্রতিকার চাওয়া যাবে। এগুলো প্রশাসনের প্রতি অসম্মান নয়; বরং সুশাসনের স্বাভাবিক অংশ।

সরকারি দপ্তরে নাগরিকের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা অসচ্ছল মানুষ যেন পোশাক, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয় বা রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন। রাষ্ট্রের কাছে সবার মর্যাদা সমান-এই নীতিই জনসেবার ভিত্তি হওয়া উচিত।

কর্মকর্তার পদমর্যাদা নাগরিকের মর্যাদাকে ছোট করে না। বরং যত বেশি ক্ষমতা, তত বেশি দায়িত্ব-এই নীতিই প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।

সরকারি সেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল নথি, ই-পেমেন্ট, আবেদন ট্র্যাকিং এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সময়সীমা গণনার মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ ও অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ কমানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তি একাই সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

যদি অনলাইন আবেদন করার পরও নাগরিককে একই কাজের জন্য একাধিক দপ্তরে যেতে হয়, যদি ডিজিটাল ব্যবস্থার অজুহাতে অস্পষ্টতা তৈরি হয়, কিংবা আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে থেকে যায়, তাহলে প্রযুক্তির সুফল সীমিত হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে যেতে পারে।

ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি প্রতিটি দফতরে নাগরিক সনদ কার্যকর করতে হবে। কোন সেবা পেতে কী কী নথি লাগবে, কত টাকা ফি, কত দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এবং অভিযোগ কোথায় করতে হবে-এসব তথ্য সহজ ভাষায় দৃশ্যমান স্থানে ও অনলাইনে প্রকাশ করা জরুরি।

সময়সীমার মধ্যে কাজ না হলে তার কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে। আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ ও দায়িত্ব নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ নেই-এমন মানুষদের জন্য সরাসরি সহায়তা দেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল রূপান্তর যেন নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি না করে।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব করতে হলে ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, সেবার মান পরিমাপ করতে হবে। একজন কর্মকর্তা কতটি ফাইল নিষ্পত্তি করেছেন, সেটিই তার দক্ষতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। কাজের গুণগত মান, সময়ানুবর্তিতা, আইন অনুসরণ, নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতাও মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে। অভিযোগ গ্রহণের পর একটি শনাক্তকরণ নম্বর, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রভাবমুক্তভাবে অভিযোগের তদন্ত করতে হবে। অভিযোগকারী যেন প্রতিশোধমূলক হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা আনতে হবে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে প্রযোজ্য আইন ও বিধির উল্লেখসহ লিখিত কারণ দিতে হবে। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, অনুমোদন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যেখানে আইন অনুমতি দেয়, সেখানে তথ্য প্রকাশ ও নিরীক্ষা জোরদার করতে হবে।

চতুর্থত, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। পদমর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে যথাযথ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা জরুরি।

পঞ্চমত, নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও পেশাগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, সততা, জনসেবার মনোভাব এবং বাস্তব কর্মদক্ষতাকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের ওপর অযৌক্তিক রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত চাপ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়তে হবে।

ষষ্ঠত, নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সরকারি সেবার মান সম্পর্কে নিয়মিত জনমত জরিপ, উন্মুক্ত শুনানি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবাগ্রহীতাদের মতামত গ্রহণ এবং অভিযোগের সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা যেতে পারে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দপ্তরভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার।

সপ্তমত, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। যে তথ্য সরকারের এক দপ্তরে রয়েছে, তা অকারণে নাগরিককে অন্য দপ্তর থেকে সংগ্রহ করে আনতে বাধ্য করা উচিত নয়। অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, একই নথি বারবার জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং পরস্পরবিরোধী বিধি পর্যালোচনা করে কমাতে হবে।

অষ্টমত, সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা ও স্বীকৃতি দিতে হবে। সংস্কার মানে সব কর্মকর্তাকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। যারা সততার সঙ্গে কাজ করেন, অন্যায় চাপ প্রতিরোধ করেন এবং নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করেন, তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আমলাতন্ত্রের সংস্কার কেবল কয়েকটি আইন সংশোধন বা নতুন প্রযুক্তি চালুর বিষয় নয়। এর সঙ্গে প্রশাসনিক মানসিকতা, নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ এবং নাগরিক সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জড়িত।

একজন কর্মকর্তা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার মনে রাখা উচিত-পদটি তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়; এটি জনগণের আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি দায়িত্ব। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত দপ্তরে নাগরিকের প্রতি সম্মান দেখানো কোনো সৌজন্যমূলক অনুগ্রহ নয়; এটি জনসেবার ন্যূনতম শর্ত।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সঠিক তথ্য দিতে হবে এবং কর্মকর্তাদের ওপর বেআইনি চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা একতরফা দায়িত্ব নয়। তবে সরকারি ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত, তাঁদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্বভাবতই বেশি।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো-রাষ্ট্রের প্রশাসন নাগরিককে সেবা প্রদান করবে নাকি নাগরিককে প্রশাসনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে?

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব জনগণের কল্যাণ ও অধিকার রক্ষার জন্য। প্রশাসন রাষ্ট্রের সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই প্রশাসনের সাফল্য কর্মকর্তাদের ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা দাপ্তরিক জাঁকজমক দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং সাধারণ মানুষ কত সহজে, কত কম খরচে, কত কম সময়ে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে সেবা পাচ্ছেন-তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।

যে প্রশাসন নাগরিককে সম্মান করে, তার প্রতি নাগরিকের আস্থা বাড়ে। যে প্রশাসন নিজের ভুল স্বীকার করে, অভিযোগের প্রতিকার দেয় এবং আইন মেনে কাজ করে, সেটিই কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করে। বিপরীতে, যে প্রশাসন নাগরিককে তুচ্ছ করে, প্রশ্নকে অবাধ্যতা মনে করে এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, সে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নিজের বৈধতা ও জনআস্থাকে নড়বড়ে করে ফেলে।

বাংলাদেশের প্রশাসনের সব কর্মকর্তা জনগণের শাসক হয়ে পড়েছেন- মোটাদাগে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়তো সমীচীন হবেনা। তবে সরকারি দপ্তরে সেবা পাওয়ার জন্য নাগরিকদেরকে যদি বারবার ক্ষমতাবানদের অনুগ্রহপ্রার্থী হতে হয় তাহলে সেই বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় জনবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের আমলারা কি কেবল পদমর্যাদা ও কর্তৃত্বের পরিচয়ে পরিচিত থাকবেন, নাকি সত্যিকার অর্থে Civil Servant হিসেবে জনগণের সেবক হয়ে উঠবেন-এ প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় নয়, প্রশাসনিক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দিতে হবে।

জনগণকে শাসন করা নয়, আইন অনুযায়ী জনগণের সেবা করাই জনপ্রশাসনের মূল দায়িত্ব। এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের সংস্কারের দাবি শেষ হবে না।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকারকর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর