রাজধানী ঢাকা মহানগরীর দুটি বহুল পরিচিত এলাকার নাম গুলশান ও গুলিস্তান। একটি কূটনৈতিক পাড়া, অভিজাত আবাসন ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত।
অন্যটি ব্যস্ত সড়ক, গণপরিবহন, ফুটপাতের বাজার ও মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও অবকাঠামোতে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও নামের অর্থের জায়গায় এসে যেন মিলে যায় দুই এলাকা।
গুলশানের নামের অর্থও এর পরিচিতির সঙ্গে যেন এক ধরনের কাব্যিক মিল রয়েছে শুলশানের। ফারসি ভাষায় ‘গুলশান’ বলতে ফুলের বাগান বা পুষ্পবন বোঝানো হয়।
গুলিস্তান নামটিও এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ‘গুল’ অর্থ ফুল এবং ‘স্তান’ অর্থ স্থান বা ভূমি—শব্দটির সামগ্রিক অর্থ ফুলের বাগান বা পুষ্পভূমি।
ঢাকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত গুলশানের আধুনিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬১ সালে। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের (ডিআইটি) উদ্যোগে এখানে গড়ে তোলা হয় গুলশান মডেল টাউন। একসময়কার গ্রামীণ জনপদ ধীরে ধীরে রূপ নেয় পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায়।
সময়ের সঙ্গে গুলশান হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম অভিজাত আবাসিক ও কূটনৈতিক এলাকা। বিদেশি দূতাবাস, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট কার্যালয়, বিলাসবহুল হোটেল ও আধুনিক রেস্তোরাঁর উপস্থিতি এই এলাকার পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
অন্যদিকে, ঢাকার কেন্দ্রস্থলের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তানের নামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে একটি সিনেমা হলের সঙ্গে। ১৯৫৩ সালে উদ্বোধন হওয়া গুলিস্তান সিনেমা হল একসময় ঢাকার আধুনিক বিনোদনজগতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
হলটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, চলচ্চিত্রের কার্যালয় ও নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে সিনেমা হলের নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা।
একসময়কার আধুনিক ও অভিজাত বিনোদনকেন্দ্রটি পরবর্তী সময়ে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত হয়। আজ গুলিস্তানের পরিচয় ফুটপাতের দোকান, বিপুল মানুষের যাতায়াত, গণপরিবহন, যানজট ও নানা ধরনের ব্যবসাকে ঘিরে।
গুলশান ও গুলিস্তানের মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। একদিকে পরিকল্পিত আবাসন, কূটনৈতিক স্থাপনা ও করপোরেট কর্মকাণ্ড; অন্যদিকে ঘন বাণিজ্যিক কার্যক্রম, গণমানুষের চলাচল ও জীবিকার বৈচিত্র্য।
তবে এই পার্থক্যকে শুধু আভিজাত্য ও অনাভিজাত্যের তুলনায় সীমাবদ্ধ রাখলে দুই এলাকার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। গুলশান যেমন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার কেন্দ্র, তেমনি গুলিস্তানও অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
সবশেষে, নামের অর্থে দুই এলাকা যেন একই সূত্রে বাঁধা। গুলশান ও গুলিস্তান দুটিই ফুলের বাগানের অর্থ বহন করে। অথচ নগরজীবনে তাদের রূপ, চরিত্র ও বাস্তবতা আলাদা। গুলশান ও গুলিস্তানের গল্প আসলে এমনই।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী।




