ত্রয়োদশ পর্ব
পারিবারিক ভালোবাসা (Storge)
পারিবারিক ভালোবাসা মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও গভীর অনুভূতির আবেগঘন বাহক। গ্রিক দর্শনে পরিবারকেন্দ্রিক এই সহজাত স্নেহকে ‘স্টোর্জ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এটি রক্ত ও স্বজন সম্পর্কের ভেতর স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে। পিতা-মাতা, সন্তান, ভাইবোন ও আত্মীয়দের পারস্পরিক বন্ধন এই ভালোবাসার মূল ভিত্তি। রোমান্টিক প্রেমের মতো এটি চঞ্চল বা ক্ষণস্থায়ী নয়। বরং দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা দিয়ে এই বন্ধন ধীরে ধীরে সুদৃঢ় হয়। এই স্নেহের মূল শক্তি হলো আনুগত্য, পারস্পরিক সুরক্ষা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং অপরিসীম দায়িত্ববোধ। পারিবারিক ভালোবাসা প্রতিটি মানুষকে জীবনের কঠোর পথচলায় পরম মানসিক প্রশান্তি, নিরাপত্তা ও আত্মপরিচয় দান করে। নিঃশর্ত ক্ষমা, সহনশীলতা এবং ধৈর্যের পরম আশ্রয় পাওয়া যায় এই পারিবারিক গণ্ডির ভেতরেই। পিতামাতার স্নেহে এই অবিনশ্বর ভালোবাসার পূর্ণতম প্রকাশ ঘটে। সন্তানকে নিরাপদে বড় করার জন্য মা-বাবা সানন্দে নিজেদের সুখ ও ইচ্ছা বিসর্জন দেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনেও এই পিতৃহৃদয়ের চিরন্তন ও তীব্র রূপ দেখা যায়। কবি নজরুল ইসলামের পরিবারে সদস্যের অভাব ছিলো না। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে একচ্ছত্র অধিকার ছিলো তার প্রিয় পুত্র বুলবুলের। স্বভাবতই বুলবুল কবির জীবনের সকল আনন্দ ও প্রেরণার মূল উৎস।
১৯২৬ সালের ৯ই অক্টোবর কবি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনকে একটি পত্র লেখেন। সেই পত্রটি ছিলো গভীর অনুরাগে আপ্লুত। জীবনজুড়ে নানা দুঃখ, অভাব ও অপূর্ণতার মাঝেও সন্তান বুলবুলের জন্মের মধ্য দিয়ে নজরুল প্রেম-প্রণয়ের পূর্ণতা অনুভব করেন। কিন্তু পরম মমতার সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বুলবুলের অকালমৃত্যু কবিকে মানসিকভাবে প্রায় উন্মাদ করে তোলে। পুত্রশোকে ব্যাকুল কবির জীবন থেকে যেন স্থায়ীভাবে সব আলো নিভে যায়। নজরুল ও বুলবুলের এই বিচ্ছেদগাথা প্রমাণ করে, পারিবারিক ভালোবাসার টান মানুষের আত্মাকে কতটা গভীর ও চিরন্তনভাবে স্পর্শ করে।
কৃষ্ণনগর
৯-১০-২৬
স্নেহভাজনেষু,
মঈন! আজ সকালে আমাদের একটি খোকা এসেছে। তোর ভাবী ভালো আছে। খোকা বেশ মোটা-তাজা হয়েছে। নাসিরউদ্দীন সাহেবকে খবরটা দিস। চট্টগ্রাম থেকে কোনো কবিতা পেয়েছিস কি আমার? ‘সর্বসহা’ দিবি তো ‘সওগাতে’? নতুন লেখা শীগগীরই দেবো। আমি যশোর-খুলনা ঘুরে আজ ফিরছি। -এইবার গিয়ে শামসুদ্দীন সাহেবকে বইগুলো পাঠিয়ে দেবো। কাল কিংবা পরশু যাব কলকাতা। ৩৭ নম্বরে খবর নিস একবার। ভালোবাসা ও স্নেহাশিস নে। ইতি一
কাজী ভাই
এই পত্রটি কনিষ্ট ভ্রাতাতুল্য বন্ধু খান মুঈনুদ্দীনকে লিখিত পত্র হলেও, এতে বুলবুলের জন্মের ঘটনা রয়েছে, বলেই এটিকে পারিবারিক ভালোবাসা বা Storge এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এই পত্রের সাথে কাজী নজরুল মুরলী ধর বসুকেও লেখেন।
পত্রটি মুরলীধর বসুকে লিখিত। নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’ গানটি এবং ঐ গানের কবিকৃত স্বরলিপি প্রথম বর্ষের ১৩৩৩ আশ্বিন সংখ্যা ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত হয়। ঐ সংখ্যায় তাঁর ‘অনামিকা’ কবিতাও ছিল। প্রথম বর্ষের ভাদ্র সংখ্যা ‘কালিকলমে’ লেখরাজ সামন্ত ছদ্মনামে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ‘শুঁটকি এ ফুপি’ গল্পটি লেখেন।
কৃষ্ণনগর
৯-১০-২৬
প্রিয় মুরলীদা,
আজ সকাল ৬টায় একটি ‘পুত্ররত্ন’ প্রসব করেছেন শ্রীমতি গিন্নি। ছেলেটা খুব হেলদি হয়েছে। শ্রীমতিও ভালো। আমি উপস্থিত ছিলাম না। হয়ে যাবার পর এলাম খুলনা হতে। খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর, বনগ্রাম প্রভৃতি ঘুরে ফিরলাম আজ। শৈলজা কী করছে। প্রেমেন কোথায়?... চিঠি দিও। কবিতাটির ও স্বরলিপিটার প্রুফ পাঠিও, যদি সম্ভব হয়!...
‘শুঁটকি ও ফুপি’ অদ্ভুত-অপূর্ব গল্প হয়েছে।
-নজরুল
নজরুল ইন্সস্টিউট হতে প্রকাশিত নজরুল পত্রাবলির ২৪ নং চিঠি এটি। এই চিঠির শুরুতেই আছে, বাংলাভষার অন্যতম কাব্যসংগীত ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’ এর স্বরলিপির ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে এই গানটি লেখার কিছু প্রেক্ষাপট তৈরি হয় আরো আগেই, যার প্রমাণ পাওয়া যায়, ১০ এপ্রিল ১৯২৬ সালে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত পত্র হতে। সেই পত্রে হিন্দু-মুসলিম দাংগার ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। পত্রটি নিম্নরূপ:
কৃষ্ণনগর
১০-৪-১৯২৬
প্রিয় শৈলজা!
কনফারেন্সের হিড়িকে মরবার অবসর নেই। কনফারেন্সের আর মাত্র একমাস বাকি। হেমন্তদা আর আমি সব করছি এ যজ্ঞের। কাজেই লেখাটা শেষ করতে পারিনি এতদিন। রেগো না লক্ষ্মীটি। আমি তোমাদের লেখা দিতে না পেরে বড় লজ্জিত আছি। ‘মাধবী-প্রলাপ পাঠালুম। বৈশাখেই দিও। দরকার হলে অদলবদল করে নিও কথা-অবশ্য ছন্দ রক্ষা করে। আমি এবার কলকাতায় গিয়েছিলুম-আল্লা... আর ভগবান, ...এর মারামারির দরুন তোমার কাছে যেতে পারিনি। আমি ২/৩ দিন পরে শ্রীহট্ট যুবক সম্মিলনীতে যোগদান করতে যাচ্ছি। ওখান থেকে ফিরে তোমার সঙ্গে দেখা করব।
আজ ডাকের সময় যায়, বেশি লিখব না।... মুরলীদা ও প্রেমেনকে ভালোবাসা দিও। তোমরা নিও।
-নজরুল
কালজয়ী গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ (যা মূলত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ নামেও পরিচিত) রচনার পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। গানটি মূলত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং তৎকালীন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাংগার প্রেক্ষাপটে রচিত হয়। গানটি রচনার সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ কারণ হলো- ১৯২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। উপরে বর্ণিত পত্র হতে এর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল থেকে ১৮ মে পর্যন্ত চলা এই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা কবিকে ভীষণভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে। ভারতমাতার সন্তানরা যখন স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ভুলে নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় হানাহানিতে লিপ্ত, তখন কবি এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও সতর্কবার্তা হিসেবে গানটি লেখেন।
দাঙ্গা শেষ হওয়ার ঠিক পর পরই, ১৯২৬ সালের ২০ মে (৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) নদীয়ার কৃষ্ণনগরে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস’-এর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, দেশের যুবসমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ফিরিয়ে আনা। এই রাজনৈতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে গাওয়ার জন্যই কবি কৃষ্ণনগরে বসে ২০ মে গানটি রচনা করেন বলে, অনেক গবেষক মনে করেন। যদিও কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের আগে এই দাংগা ব্রিটিশ শাসনের ইন্দনে হয়েছিল বলে মনে করা যায়। ব্রিটিশ বেনিয়ারা হিন্দ-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্টের জন্যই এই দাংগায় প্রভাবকের (Catalyst) ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নজরুল রচিত এই গানে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের ডাক ও ‘মানুষ’ পরিচয়কে উর্ধ্বে তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক নেতারা যখন ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করার নোংরা রাজনীতিতে মেতেছিলেন, তখন নজরুল তার গানে এক কালজয়ী বার্তা দেন। গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরণ: ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? কাণ্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’
এখানে কবি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, বিপদের দিনে বা স্বাধীনতার লড়াইয়ে কে হিন্দু আর কে মুসলিম, সেই পরিচয় খোঁজা বা ধর্মীয় পরিচয় খোঁজা মুর্খতা। ডুবন্ত বা নিপীড়িত মানুষজন সবাই একই ভারতমাতার সন্তান এবং তারা প্রত্যেকেই প্রথমে ‘মানুষ’। এই সাম্প্রদায়িক দাংগার কারণে তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যাকে কবিতায় ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল’ বলে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে একযোগে লড়াই করার এবং দেশকে সঠিক পথে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নজরুল তরুণ সমাজ ও যোগ্য নেতাদের (কাণ্ডারী) এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বুলবুলের জন্ম: ৯-১০-১৯২৬ সালে। ১৪ মার্চ ১৯২৭ সালে তথা ৫ মাস বয়সে মুখে ভাত অনুষ্ঠান করা হয়। সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে ব্রজবিহারী বর্মণকে এই পত্রটি লেখেন, কবি। এই পত্র প্রমাণ করে সন্তানের প্রতি পিতার প্রগাঢ় প্রেম। সংসারের বহুমুখি অভাব-অনাটনের মাঝেও বুলবুলের মুখে ভাত অনুষ্ঠান করেন কবি, বেশ ঘটা করেই।
কৃষ্ণনগর
১১-৩-২৭
স্নেহভাজনেষু-
ব্রজ! আগামী পরশু রবিবার রাত্তিরে আমার খোকার মুখে ভাত দেওয়া উপলক্ষে বন্ধু-বান্ধবদের আমন্ত্রণ করছি। কোলকাতার ও স্থানীয় অনেক বন্ধু আসবেন। তুমি সেদিন অবশ্য এস। না এলে দুঃখিত হব। হয় সকালের চট্টগ্রাম মেলে কিম্বা দুপুর ১টা ৩৪ মিনিটের সময় Calcutta মুর্শিদাবাদ প্যাসেঞ্জারে আসবে। এই দুটি ছাড়া আর ট্রেন নেই। এলে অন্যান্য কথা হবে।
তোমার প্রেরিত টাকা চব্বিশটা পেয়েছি। ‘ফণি-মনসা’র প্রুফ পেলাম আজ। স্নেহাশিস নাও। ইতি-
শুভার্থী
নজরুল
লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।




