দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট ঘোষণা হয়েছে এবং অক্টোবর থেকে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছরই মূল্যস্ফীতি ঘটে। অর্থাৎ গত বছর কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে যে টাকা খরচ করতে হয়েছে, এখন সেই একই পণ্য বা সেবা নিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করতে হয়। খাদ্যদ্রব্যসহ সব পণ্যের বাজার সব সময় আগুন। তাছাড়া সন্তানদের লেখাপড়া ও পরিবারের সবার চিকিৎসা খরচ অনেককে ভাবিয়ে তোলে।
তাই যে হারে সব কিছুর দাম বাড়ে, সে হারে মানুষের আয় বা বেতন বাড়া উচিত। নিজেদের আয়-রোজগারের সঙ্গে মিল রেখে সমাজ-সংসার রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো অনেক সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনেও অনেক কষ্টের গল্প তৈরি হয়। তাই নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন তাদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে।
ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ বেড়েছে। ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন বেড়েছে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন এই স্কেলে কর্মরত ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী সুবিধা পাচ্ছে। তাদের সঙ্গে ৯ লাখ পেনশনভোগীরও কিছু সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে শেষ বয়সে বাড়তি কিছু টাকা তাদের জীবনেও কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে। এটা অস্বীকার করার ঊপায় নেই, এই পে স্কেলের যারা সুবিধা পাচ্ছেন, তার বড় অংশই মেধাবী ও সৎ। অনেক সরকারি কর্মজীবী আছেন যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সৎভাবে জীবনযাপন করেন। তাদের জন্য এই নতুন বেতনস্কেল সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত ও অপরিহার্য।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অপর অংশদের নিয়ে, যারা অসৎভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জনে লিপ্ত। এই অংশের সংখ্যা কত তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে নেহাত কম নয়, তা না হলে বাংলাদেশ কয়েক দশকের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি হলো কী করে?
নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের ঘুষ ও দুর্নীতির প্রবণতা কমবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পে-স্কেলের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, অথচ যেসব স্থান থেকে সরকারি সেবা নিতে গেলে নাগরিকদের ঘুষ দিতে হয় বা যেসব স্থানে কমিশন বাণিজ্য হয়, সেখান থেকে এখনো পর্যন্ত তেমন সুখবর পাওয়া যাচ্ছে না। ঘুষ নেওয়া হবে না বা কোনো কমিশন বাণিজ্য হবে না- এমন কোনো নিশ্চয়তার খবর নেই। ঘুষ আদান-প্রদান ও কমিশন বাণিজ্য একটা গোপন ব্যাপার, হাতেনাতে ধরা খুবই কঠিন। তবে ফলাফল একসময় ফুটে ওঠে।
উচ্চ বেতন দুর্নীতির প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে- এমন যুক্তি আছে দীর্ঘদিনের। কেননা জীবনযাত্রার মৌলিক খরচ মেটাতে আর্থিক চাপ কমলে অনেকের ছোটখাটো ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা কমে যেতে পারে।
তবে অনেক বিশ্লেষকদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়- শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯টি পে-স্কেল হয়েছে। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ছিল বড় ধরনের পুনর্গঠন। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল আকর্ষণীয় বেতনকাঠামোর সরকারি চাকরির প্রতি যোগ্য ও দক্ষদের আকর্ষণ বাড়বে, দুর্নীতি কমবে।
কিন্তু বাস্তবতা এই যুক্তির ধারেকাছেও মিলেনি। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৮ থেকে ২৩-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। এর অর্থ, দুর্নীতির দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। আবার অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বেতন-ভাতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকে নিজেকে অনেক বেশি দামি লোক ভেবে আগের চেয়ে ঘুষের বা কমিশনের রেটটা বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনেকের মতে, আমাদের দেশে ঘুষ-দুর্নীতি-কমিশন বাণিজ্য একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তাই বেতন-ভাতা ও সুযোগসুবিধা বাড়লে এগুলো কমবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই নবম পে-স্কেলকে শুধু বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে না দেখে জনপ্রশাসন সংস্কারের একটি অংশ হিসেবে মনে করছেন। সিস্টেমের পরিবর্তন, বিভিন্ন ধরনের সংস্কার, জবাবদিহির নিশ্চিতা ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার উপর অনেকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মজীবী ও পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাব বাৎসরিক ভিত্তিতে হালনাগাদ করে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
ধনী হওয়ার উন্মাদনা
উল্লেখ্য যে, এ দেশের মানুষের মধ্যে সবসময় কোনো না কোনো উন্মাদন কাজ করে। বর্তমান সময়ে এক ধরনের মানুষের মধ্যে যেন ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ দেখা দিয়েছে। তারা অঢেল ধনসম্পদ ও টাকা-পয়সার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খুব দ্রুত সময়ে বিলনিয়ার বা পৃথিবীর অন্যতম একজন ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। তাদের চাহিদার কোনো শেষ নেই। দুর্নীতি করে হোক আর কোনো অপকর্ম করে, তাদের মিশন যেন শেষ হচ্ছে না।
পৃথিবীর অনেক দেশে দুর্নীতি, লুটপাট ও অপকর্ম রয়েছে। কেউ হয়তো দুই-একটি গাড়ি-বাড়ি বানায়, ২০-৫০ বিঘা জমি বানায়; টাকাপয়সা জমা রাখে, যেন নিজের ও সন্তানদের জীবন অনায়াসে চলে যায়। কোনো দেশ বা জাতির কষ্ট হলেও কোনো না কোনোভাবে এটা হয়তো মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু মানুষের অপকর্ম-দুর্নীতি একটা অস্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। আমাদের দেশে এটা পরিণত হয় কাণ্ড বা কেলেঙ্কারিতে। যেমন- বেনজীর কাণ্ড, আজিজ কাণ্ড, পি কে হালদার কাণ্ড, এস আলম কাণ্ড, হলমার্ক কেলেঙ্কারি ইত্যাদি।
কিছুদিন পরপর যাদের নাম আসে, তাদের দেখা যায় হাজার বিঘার ওপরে ভূমি, দেশে-বিদেশে অসংখ্য ফ্ল্যাট, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট। দেশে-বিদেশের ব্যাংক ও কোম্পানিতে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রভৃতি। তারা এমনভাবে অর্থ কুক্ষিগত করে, যেন চৌদ্দ পুরুষ ভোগ করে শেষ করতে না পারে।
বেনজীর আহমেদ, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের আইজি, র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনারের মতো দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন। যিনি রাষ্ট্রের ‘শুদ্ধাচার পুরস্কারেও’ ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি কি না করেননি! শুধু একরাত কাটানোর জন্য বিলাসবহুল বাড়িও বানিয়েছেন। তার মতো ব্যক্তি যখন এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত থাকে, তখন অন্যদের নিয়ে আর কিছু বলার থাকে না।
বর্তমান সময়ে আর এক ধরনের উন্মাদনা কাজ করছে, এখন অনেকে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ পশ্চিমা দেশে বা অন্য কোনো দেশে বসবাস করা বা আসা-যাওয়া অনেক সম্মানের ও আভিজাত্যের ব্যাপার। যাদের ওইসব দেশের নাগরিকত্ব, সার্টিফিকেট ও ব্যবসা আছে, তারা সমাজে অনেক সম্মানিত।
এখন যেন একটা হিড়িক পড়ে গেছে, কীভাবে ওইসব দেশে স্থায়ী হওয়া যায়। তাই দুর্নীতি করে হোক, কোনো অপকর্ম করে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে যেতে হবে। এসব বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল ঘুষ-দুর্নীতি-কমিশন বাণিজ্য কমাতে কতটা ভূমিকা রাখবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
এ দেশের মানুষের শাশ্বত বৈশিষ্ট্য
দুবেলা দুমুঠো ভাতেই বাঙালি খুশি। এটাই এদেশের মানুষের হাজার বছরের চিরন্তন স্বপ্ন। এদেশের মানুষ সারা জীবন দুমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করেছে। রাজা-বাদশা, উজির-নাজির, প্রচুর ধন সম্পদের মালিক বা ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন ছিল খুবই কম। তাইতো বারবার অন্যের দ্বারা শোষিত হয়েছে। বাংলায় কোনো সময় সম্পদের অভাব ছিল না। কিন্তু হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি দুমুঠো ভাতের সংস্থান খুব কম সময়ই হয়েছে। রয়েছে অনেক শোক-গাঁথা ও কষ্টের গল্প।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এ দেশের মানুষের নিয়মিত ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হয়। ব্রিটিশ শাসনের সেরা সময় ধরা হয় ১৮৮১ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত। অথচ, এই সময়ে উপমহাদেশে অনাহারে ও অতিরিক্ত মৃত্যুর পরিমাণ ছিল ১৬১ মিলিয়ন বা ১৬ কোটি ১০ লাখ!
১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মুছে যায়। অর্থাৎ, তিন কোটির মধ্যে এক কোটি মারা যায়। সময়টি বাংলা ১১৭৬ সাল হওয়ায় এই দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই সময় কৃষক গরু ও বীজধান খেয়ে ফেলে, পুত্র-কন্যা বিক্রি করা শুরু করে।
একপর্যায়ে মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে অন্যত্র চলে যেতে থাকল। মাইলের পর মাইল মাঠ ছিল, কিন্তু ছিল না ফসল, শূন্য খাঁ খাঁ। মানুষ প্রাণের তাগিদে ঘাস পাতা, মৃত পশু ও এমনকি, মৃত মানুষের মাংস খেয়েও ক্ষুধা নিবৃত্তি করেছিল। সিয়ার-উল-মুতাকখিরিন উল্লেখ করেছেন, কঙ্কালসার মৃতদেহ রাস্তাঘাটে পড়ে থাকত। মাংসভোজী পশু, পাখিদেরও মনুষ্য মাংসে অরুচি দেখা দেয়। শকুন গাছের মাথায় বসে থাকতো, নিচে নামতো না বা অন্যত্র চলে যাওয়া শুরু করল।
১৯৪৩ সালে বাংলাজুড়ে চলেছিল মহাদুর্ভিক্ষ, যাকে বলা হয় পঞ্চাশের আকাল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, মৃত্যুর সংখ্যা ২০ লাখের বেশি, কারও কারও মতে ৫০ লাখ ছাড়িয়েছিল। বাজারে কোথাও চাল ছিল না। খাবারের আশায় গ্রামের মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরে চলে যায়। শহরের অলিগলি ভরে উঠে গ্রাম থেকে আসা লোকদের ‘একটু ফ্যান দেও গো না, মা’ শব্দে।
গ্রাম থেকে যারা কলকাতায় গিয়েছিল, তারাই এই সময় বেশিরভাগ অনাহারে মারা যায়। আর গ্রামের মানুষ বেঁচেছিল শামুক, গুগলি, ঘাস ও বিভিন্ন গাছের পাতা আর কচু শাক খেয়ে। ভাতের বিকল্প হিসেবে মানুষ বজরা, বুনো আলু ও বিভিন্ন গাছের মূল ও গরু-ছাগলের ভুসি খাওয়া শুরু করে।
তবে কৃষিপ্রযুক্তির উন্নতি, ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও আর্থিক সচ্ছলতার কারণে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ খাদ্যাভাবের সমস্যা থেকে অনেকটা বের হতে শুরু করে। ঠিক এমন সময়ে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে অনেকের কাণ্ড দেখে অবাক হতে হয়!
দেশের অন্যসব মানুষের কথাও ভাবা উচিত
সরকারি চাকরিজীবিদের শুধু নিজেদের কথা ভাবলে হবে না, অন্য পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ, সর্বোপরি দেশের সব মানুষের কথা ভাবা উচিত। নিজের ভালো জামা নেই ভেবে দুঃখ করলে হবে না, যাদের জামাই নেই তাদের কথাটাও ভাবতে হবে।
আমাদের অনেকের ধারণা, জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ও মাথাপিছু গড় আয়কে বাড়িয়ে ফেলতে পারলেই উন্নয়নশীল দেশের সব রোগ নিরাময় হয়ে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৩,০২০ ডলার। কিন্তু বাস্তবে সব পরিবার ও সব মানুষ এই আয় করতে পারে কি না, আর তাদের আয় দিয়ে সংসার চালাতে পারে কি না, সেটা বিবেচনার বিষয়।
অনেকের আয়ের পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকে না। মানুষের আর্থিক অবস্থা দেখার জন্য সব সময় সরকারি, বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান দেখারও প্রয়োজন হয় না। গ্রামগঞ্জ, রাস্তাঘাট, ফুটপথ, হাটবাজার, পার্ক, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন প্রভৃতি স্থানের অসহায় মানুষের উপস্থিতি অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেয়।
দেশের অনেক শিক্ষিত পেশাজীবী মানুষ আছে যাদের কাছে কতটা সুখী জানতে চাইলে বিষয়টি কোনো মতে এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় থাকে না। সংসার চালাতে কষ্ট হয়, কিন্তু সামাজিক অবস্থার কারণে কাউকে বুঝতে দেয় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও কোম্পানিতে চাকরিরত অনেকের অবস্থা প্রায় একই রকম। কিছু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশই বেতন কাঠামো ও নিয়মনীতি অনুসরণ করে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী মনিটারিং না থাকায় তারা ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পরপর নিম্নতম মজুরী পুনর্বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এটা কেউ না মানায় তাদের জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অনেকে যারা কোম্পানিতে কাজ করেন, তারা বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য কিছু অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় মেটানোর জন্য বেতনের প্রায় পুরো অংশটাই মাসের শুরুতে খরচ করে ফেলেন। বাকি পুরো মাসটা অনেক টানাটানি ও কষ্টের মাধ্যমে পার করতে হয়। অনেকে ঢাকায় সংসারের খরচ মেটাতে না পেরে পরিবার এলাকায় পাঠিয়ে দিয়ে মেসবাড়িতে থাকেন।
সারাদেশে এমন অনেক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে, যেগুলো সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। অনেকগুলো আবার সরকারি ভাতা পাওয়ার ও এমপিওভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেখানকার শিক্ষকরা নামমাত্র সামান্য কিছু বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। অনেকে আবার কিছুই পান না। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনরা সমাজের সম্মানী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত, অথচ তাদের বেতন এক অর্থে অসম্মানের। মসজিদ কমিটি থেকে দেওয়া অর্থে তাদের মাস চলে না। অভাব-অনটন সবসময় লেগেই থাকে। অধিকাংশের মসজিদ লাগোয়া একটি ছোট্ট ঘর অথবা মসজিদেই জীবন চলে। দুটি লুঙ্গি, একটি পাজামা আর দুটি পাঞ্জাবিতে বছর পার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৮.৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তার মধ্যে অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে ৫.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকায় আমাদের অবস্থান নিচের দিকে। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১৭ লাখ। এসব মানুষের পরিবারের অন্তত একজন অপুষ্টিতে ভুগছে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে আরও বেশি টাকা ঋণ নিতে হবে। এমনিতেই বাজেটে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়। সরকার পরিচালনায় ব্যাংক থেকে নতুন করে আরও ঋণ নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পাবে না। বেসরকারি খাত ঋণ না পাওয়ার অর্থ কর্মসংস্থান হবে না, মানুষের আয় বাড়বে না এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়বে।
বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষ জাতীয় পে-স্কেল বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারি ব্যয় বাড়ার অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তার কিছুটা তাদেরকেও বহন করতে হবে। বাজারে আগুন লাগলে তার আঁচ সবার গায়ে লাগে। সব আয়ের মানুষের একই বাজার থেকে পণ্য কিনতে হয়। সেই ধাক্কা সকলের কাছে সমান নয়। অনেক মানুষের কাছে মাছ-মাংসসহ প্রাণিজ প্রোটিন সোনার হরিণ, নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
নিজেরা খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকলেও এ দেশের মানুষ চায় এদেশের সরকারি চাকরিজীবীরা বা যারা রাষ্ট্রের সেবা করে, তারা ভালো থাকুক। এ দেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে কোনো কাজের জন্য ঘুষ দিতে হবে না; দালাল খুঁজতে হবে না, পরিচয় বা সুপারিশের প্রয়োজন হবে না এবং একটি ফাইল এগিয়ে নিতে কাউকে ম্যানেজ করতে হবে না।
অর্থনীতিতে একটা কথা আছে, ‘Human wants are unlimited’। একটি প্রয়োজন পূরণ হলে নতুন আরেকটি প্রয়োজন সামনে আসে। এরপরও অল্প নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যায়। অর্থের প্রয়োজন আছে, তাই বলে অবৈধ পথে নয়। অল্পতে তুষ্ট থেকেও কল্যাণ ও সুখী জীবন পাওয়া যায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও মাত্রাতিরিক্ত লোভ কোনোদিন সুখ আনতে পারে না। চরিত্র বদলানোর পথ যে একেবারে বন্ধ এমনটাও নয়, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী



