ছুটির দিনে মানুষের ইচ্ছেগুলো খুব সাধারণ-একটু বেশি ঘুম, এক কাপ চা, বাজারের হিসাবটা কিছুক্ষণ ভুলে থাকা, আর পৃথিবীটাকে অন্তত সকালের নাশতার সময়টুকু শান্তিতে থাকতে দেওয়া। কিন্তু সংবাদপত্রের কোনো ছুটির দিন নেই। সে এসে হাজির হয় মানুষের সব দুশ্চিন্তা বগলদাবা করে। আজকের খবরগুলোও যেন একই প্রশ্নের চারপাশে ঘুরছে-পৃথিবী এত হিসাব শিখল, মানুষকে বুঝতে শিখল কতটা? অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্যের শুল্ক, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চুক্তি-সবকিছুরই অংক আছে। শুধু মানুষের কান্নার কোনো নির্ভুল হিসাব নেই। অথচ সভ্যতার আসল পরীক্ষাটা সেখানেই।
বাংলাদেশে হামের খবর দিয়ে সকাল শুরু করলে চায়ের স্বাদ কিছুটা বিস্বাদ হয়ে যায়। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১,১৪৭; এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত মৃত্যু ১০৪টি। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১,২৬৮ জন। সংখ্যাগুলো কেবল স্বাস্থ্য অধিদফতরের খাতায় কয়েকটি ঘর পূরণ করে না; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার, একটি শূন্য বিছানা, আর কোনো মায়ের সারাজীবনের জন্য বদলে যাওয়া সকাল রয়েছে।
হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ, তাই এই মৃত্যু আমাদের কাছে নিছক দুর্ভাগ্যের সংবাদ হতে পারে না। টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা-সবকিছুর কার্যকারিতা এখানে প্রশ্নের মুখে। রোগের জীবাণু প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষা করে না; শিশুর শরীরেও সে ফাইল চালাচালি বোঝে না। রাষ্ট্রের কাজ তাই মৃত্যুর পর সংখ্যা গোনা নয়, মৃত্যুর আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া।
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। প্রতিপাদ্যের মর্মকথা-মানুষের পরিচয় মানুষ বলেই, অন্য পরিচয়ে নয়। কথাটি শুনতে এত সহজ যে আমরা প্রায়ই এর গুরুত্ব বুঝতে পারি না। শরীর অসুস্থ হলে আমরা চিকিৎসক খুঁজি; মন ক্লান্ত হলে উপদেশদাতা হাজির হয়। কেউ বিষণ্ন হলে বলা হয়, মন শক্ত করুন; উদ্বিগ্ন হলে বলা হয়, এত ভাবেন কেন! যেন মনও কোনো সরকারি দফতর-একটি আবেদন দিলেই পরদিন সুস্থতার আদেশ জারি হয়ে যাবে। অথচ মানুষের মনেরও বিশ্রাম দরকার, সহমর্মিতা দরকার, প্রয়োজনে পেশাদার চিকিৎসা দরকার। একই মানবিক বোধ আমাদের নিয়ে যায় জীবনের শেষ অধ্যায়ে, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের কাছে। এ বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক সত্য, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্যের উচ্ছ্বাসে কখনো আড়াল হয়ে যায়: সব রোগ সারানো সম্ভব নয়, কিন্তু রোগীর কষ্ট কমানো, তার পাশে থাকা এবং মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। চিকিৎসা তখনও শেষ হয়ে যায় না, যখন আরোগ্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়। মানুষ তখনও মানুষ-রোগের নাম, পরিচয়পত্র কিংবা হাসপাতালের শয্যা নম্বরের চেয়ে অনেক বড়।
মানুষের কষ্টের আরেক নাম অর্থনীতি। জাতীয় দৈনিকগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে যে উদ্বেগ উঠে এসেছে, তার ব্যাখ্যা হয়তো আন্তর্জাতিক বাজারে, সরবরাহব্যবস্থায় কিংবা নীতিনির্ধারণের জটিল অংকে। কিন্তু সংসারের খাতায় এসব ব্যাখ্যা লিখে বাজারের বিল কমানো যায় না। প্রবৃদ্ধির হার বাড়ল কি না, রফতানির পরিমাণ কত হলো, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এল কি না-এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রশ্ন করতে হবে, মাসের শেষে একজন বেতনভোগীর হাতে কত টাকা থাকে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কতটা লাভ হয়, আর অনিয়মিত আয়ের মানুষটি কত দিন নিশ্চিন্তে সংসার চালাতে পারেন।
অর্থনীতির রিপোর্ট কার্ডে ভালো নম্বর উঠতে পারে; কিন্তু রান্নাঘরের চুলা যদি হিসাবের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তবে সেই সাফল্যের ব্যাখ্যা আরেকটু দরকার। অর্থনীতির আসল পরীক্ষা পরিসংখ্যানের টেবিলে শেষ হয় না; তার ফলাফল দেখা যায় বাজারের থলিতে, বাড়িভাড়ার খামে এবং মাসের শেষ সপ্তাহে মানুষের মুখে।
এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে আছে প্রতিবেশী ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির প্রশ্ন। স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ ও অশুল্ক বাধা দূর করা এবং বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পেট ফিল্মের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যের আলোচনায় এসব দাবি নিছক কাগজের অনুচ্ছেদ নয়; এর সঙ্গে জড়িত উৎপাদক, শ্রমিক, রফতানিকারক এবং বৈদেশিক আয়ের সম্ভাবনা। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক যেমন জরুরি, তেমনি দরকার বাজারে প্রবেশের ন্যায্য সুযোগ। কূটনীতির ভাষা একটু ঘুরিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে; ব্যবসায়ীর ভাষা তুলনায় সোজা-পণ্য তৈরি করেছি, ক্রেতা আছে, এবার বাজারে পৌঁছানোর পথটি সহজ করুন। প্রতিযোগিতা হোক পণ্যের মানে, দামে ও দক্ষতায়; এমন বাধার গোলকধাঁধায় নয়, যেখানে পণ্য বিক্রির আগেই উদ্যোক্তার ধৈর্য বিক্রি হয়ে যায়। বাণিজ্যের সাফল্য তাই শুধু সমঝোতার ছবি তোলায় নয়, বন্দরের বাস্তব বাধা কমাতেও।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজ রাজনীতি, প্রতিবাদ ও নিরাপত্তা আবার একই মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ ঘিরে ককরোচ জনতা পার্টির প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার খবর এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন; একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্যও জরুরি। অন্যদিকে, সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি হামলা ও তিনজনের মৃত্যুর যে খবর দেওয়া হয়েছে, সেটি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধের খবরের মধ্যে সংখ্যাগুলো দ্রুত চলে আসে, কিন্তু সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো তত দ্রুত দৃশ্যমান হয় না।
একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার মূল্য অর্থে মাপা যায়; একটি প্রাণ হারালে পরিবারের যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার কোনো বাজারদর নেই। এদিকে ট্রাম্প ও পুতিনকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহ ও কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিচিত সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়-বিশ্বের বড় সিদ্ধান্তগুলোতে নীতি ও স্বার্থ প্রায়ই পাশাপাশি বসে। প্রশ্ন হলো, সেই দর-কষাকষির লাভ-ক্ষতি শেষ পর্যন্ত কার ঘরে গিয়ে পৌঁছায়।
দিনের শেষে খবরগুলোকে একসঙ্গে রাখলে মনে হয়, পৃথিবী যেন প্রতিদিন মানুষের জন্য নতুন নতুন ব্যবস্থা বানাচ্ছে, অথচ মানুষকে ভুলে যাওয়ার পুরোনো অভ্যাসটি ছাড়তে পারছে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য শিশুর বেঁচে থাকায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য মানুষের কথা শোনায়, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সাফল্য কষ্টের মধ্যে মর্যাদা রক্ষায়, অর্থনীতির সাফল্য সংসারের স্বস্তিতে, আর কূটনীতির সাফল্য সংঘাত কমিয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায়। বড় বড় সম্মেলন, চুক্তি ও পরিসংখ্যানের নিজস্ব গুরুত্ব আছে; কিন্তু সেগুলোকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখলে রাষ্ট্রের খাতা পূর্ণ হলেও নাগরিকের মন খালি থেকে যায়।
সভ্যতা বেশ দূর এগিয়েছে, এখন মানুষের দিকে তাকানোর বিদ্যেটুকু শিখলেই হয়। চায়ের কাপ ঠান্ডা হতে পারে, সংবাদপত্র ভাঁজ করে রাখা যায়; কিন্তু মানুষের জীবনের প্রশ্নগুলোকে ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখার উপায় নেই। কারণ শেষ বিচারে পৃথিবী কত বড় হলো, তার চেয়ে জরুরি-এই পৃথিবীতে মানুষ কতটা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারল।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।




