বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়ে বিতর্কের অবসান হোক

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

শেয়ার করুন:

বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়ে বিতর্কের অবসান হোক
কোলাজ: ঢাকা মেইল

বায়তুল মোকাররম মসজিদ দেশের সকল School of thought এর মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। 

এখানে কে খতিবের দায়িত্ব পালন করবেন—এটি নিছক একটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামি জ্ঞানের গভীরতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, ধর্মীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, মসজিদের মর্যাদা এবং সাধারণ মুসল্লিদের গভীর আস্থা, আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।

সাম্প্রতিক সময়ে বায়তুল মোকাররমের খতিবকে কেন্দ্র করে যে ধরনের আলোচনা, মতবিরোধ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘায়িত হওয়া কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বিতর্ক যত বাড়বে, জাতীয় মসজিদের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ততই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই এখন প্রয়োজন বিতর্ককে আরও বিস্তৃত না করে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

খতিব নির্বাচনে কী বিবেচনা করা উচিত

জাতীয় মসজিদের খতিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত প্রার্থীর ইলম, তাকওয়া, খুতবা ও বক্তব্য প্রদানের যোগ্যতা, কুরআন-সুন্নাহর গভীর জ্ঞান, সমকালীন বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা।

একজন খতিব শুধু জুমার নামাজের ইমাম নন। তিনি ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয়ে জনগণের সামনে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন। ফলে সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নৈতিক মূল্যবোধ শক্তিশালী হবে। তার বক্তব্য জাতি গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে। যুব সমাজ দেশ ও জাতি গঠনের দীক্ষা গ্রহণ করবেন; স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মনোবাসনা অন্তরে লালন করবেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেশি।

তাই খতিব নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক পরিচয়, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা সাময়িক পরিস্থিতির পরিবর্তে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ যোগ্যতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকুক জাতীয় মসজিদ

বায়তুল মোকাররম কোনো রাজনৈতিক দলের মসজিদ নয়; এটি রাষ্ট্রের জাতীয় মসজিদ। ফলে এর খতিবও কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে জনগণের সামনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভাজন যেন সৃষ্টি না হয় সেসব দিক মাথায় রেখে স্থান কাল বিবেচনায় সত্যের বাণী নির্ভয়ে প্রচার করবেন।

খতিবের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত বা নাগরিক অধিকার অবশ্যই রয়েছে এবং থাকবে তবে তা যেন জাতীয় মসজিদের মিম্বাররে প্রতিফলন না ঘটে তা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কোনো খতিবকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাও কাম্য নয়। তার বক্তব্য, আচরণ, ধর্মীয় জ্ঞান ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।

বিতর্কের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন

বর্তমান বিতর্কের অবসানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। প্রয়োজনে দেশের বিশিষ্ট আলেম, ইসলামি চিন্তাবিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নিরপেক্ষ সিলেকশন কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের ধর্মীয় যোগ্যতা, শিক্ষাগত পটভূমি, খুতবা প্রদানের সক্ষমতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিক অবস্থান এবং জাতীয় মসজিদের দায়িত্ব পালনের উপযোগিতা যাচাই করবেন। একই সঙ্গে নিয়োগের শর্ত, দায়িত্ব, মেয়াদ ও জবাবদিহির বিষয়গুলোও স্পষ্ট করবেন।

এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে, একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যেন একই পদকে কেন্দ্র করে বারবার অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক তৈরি না হয়। প্রয়োজন হলে হারামাইন শারিফাইনের আদলে জাতীয় মসজিদের জন্য চার পাঁচজন খতিব নিয়োগ করা যেতে পারে যারা  প্রধান খতিবের দিকনির্দেশনায় পালাক্রমে একেক জুমায় একেকজন খুতবাহ প্রদান করবেন।

মিম্বার হোক ঐক্য ও নৈতিকতার জায়গা

ইসলামের ইতিহাসে মসজিদের মিম্বার ছিল মানুষের নৈতিক শিক্ষা, সত্যের আহ্বান, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। জাতীয় মসজিদের মিম্বার থেকে সেই ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন জনগণের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের সমাজ আজ নানা মত, পথ ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে জাতীয় মসজিদের খতিবের বক্তব্যে উত্তেজনা বা বিভাজনের পরিবর্তে শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান, দুর্নীতি ও মাদকতার ভয়াবহতা, নৈতিকতা এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হলে ভালো হয়।

খতিবের পদ বা কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বড় ধরণের বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্টি না করে বিষয়টির একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান হওয়া খুবই জরুরি বলে মনে করি। ধর্ম মন্ত্রণালয় যত দ্রুত বিষয়টির নিষ্পত্তি করবে ততই মঙ্গল। ব্যাধি সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়।

বায়তুল মোকাররমের খতিব কে হবেন—এ প্রশ্নের উত্তর যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের ফল না হয়ে যোগ্যতা, সততা, ধর্মীয় জ্ঞান, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তাহলেই জাতীয় মসজিদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং মুসল্লিদের আস্থাও শক্তিশালী হবে।

এখন সময় এসেছে খতিবকে কেন্দ্র করে বিতর্ক দীর্ঘায়িত না করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযম, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর। জাতীয় মসজিদের মিম্বার বিতর্কের নয়—ঐক্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও হেদায়াতের প্রতীক হয়ে উঠুক।

লেখক: ইসলামি চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মী
‎
এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর