একটি দেশের সকাল কখনো শুধু সূর্য ওঠার ঘটনা নয়; খবরের কাগজ খুললেই বোঝা যায়, সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে কতগুলো প্রশ্নও মাথা তুলেছে। আজকের বাংলাদেশের সেই প্রশ্নটির নাম বোধহয়—দেশটা আসলে কার? রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, সঙ্গে থাকছে আট ঘণ্টার ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা; চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালও ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনায় যাওয়ার চুক্তির দ্বারপ্রান্তে। সূর্যের আলো আর সমুদ্রের বন্দর—দুটিই ভবিষ্যতের অর্থনীতির দরজা। দরজার চাবি কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে; কিন্তু দরজাটি যেন শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই খোলে, সেটিই আসল কথা। চাবি বদলাতে পারে, তালা বদলাতে পারে, দরজায় নতুন রংও লাগতে পারে—শুধু ভেতরের ঘরটি যেন জনগণেরই থাকে।
অর্থনীতির ঘরে ঢুকলেই অবশ্য একটু ভুরু কুঁচকে যায়। বিশ্বব্যাংক ২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে এবং আর্থিক খাত, জ্বালানি ও রাজস্ব ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কারের কথা বলেছে। তার মধ্যেই কমলালেবুর আমদানি শুল্ক নিয়ে এমন বিতর্ক উঠেছে যে ফলটিও হয়তো ভাবছে—আমি কি ফল, না রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি? বিলাসবহুল গাড়ি যখন তুলনামূলক স্বস্তিতে সীমান্ত পার হয়, কমলালেবুকে যদি তার চেয়ে বেশি শুল্ক দিয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হয়, তাহলে শুল্কনীতির যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। রাষ্ট্রের রাজস্ব দরকার, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের বুদ্ধিটিও দরকার; নইলে একদিন দেখা যাবে কমলালেবুর ওপর এমন পাহারা বসেছে যে আপেল পাসপোর্ট খুঁজছে, আর কলা সীমান্তে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয়পত্র দেখাচ্ছে। পঞ্চগড় সীমান্তে সাতজনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি—সীমান্তের কাঁটাতার অবশ্য কৌতুক বোঝে না; সেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বটি খুব পরিষ্কার: মাটি, আইন ও মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা।
কিন্তু রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সীমান্ত তো মানুষের ভেতরেই—মর্যাদার সীমান্ত। সেই জায়গাটিতেই আজ সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষকদের বকেয়া বেতন, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও লাঞ্ছনার অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ। যে সমাজ শিক্ষককে সম্মান করতে ভুলে যায়, সে সমাজ পরে নতুন স্কুল ভবন বানাতে পারে, চকচকে চেয়ার কিনতে পারে, উদ্বোধনের ফিতা কাটতে পারে; শুধু শ্রদ্ধাটা বাজার থেকে কিনতে পারে না। শিক্ষককে অপমান করে শিক্ষার উন্নয়ন করা অনেকটা প্রদীপের সলতে খুলে রেখে আলো বাড়ানোর চেষ্টা। একই সময়ে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য যিনি জীবন দিয়েছেন, তাঁর স্মৃতিকে অপমান করার মধ্যে কোনো বুদ্ধি নেই। ইতিহাসের সঙ্গে বিতর্ক করা যায়, রাজনীতির সঙ্গে ঝগড়া করা যায়, কিন্তু আত্মত্যাগের প্রতি ন্যূনতম সম্মানটুকু হারিয়ে ফেললে জাতি নিজের আয়নাটিই ভেঙে ফেলে। মজার ব্যাপার, সেই একই সামাজিক মাধ্যমে এক নারীর ইংরেজি কনটেন্ট তৈরিতে স্বামীর আপত্তির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে, উৎসাহ দিয়েছে। একদিকে জুতার মালা, অন্যদিকে হাততালি—সমাজের আয়নাটা আজকাল বেশ পরিষ্কার। আয়না দোষী নয়; মুখটি আমাদেরই।
এই মুখটির আরেকটি ছায়া দেখা যায় সম্পাদকীয় পাতায়। রাজনীতি ও অপরাধের পুরোনো আঁতাত নিয়ে সতর্কতা যতই দেওয়া হোক, রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধীচক্র জায়গা করে নিলে আইনের শাসন কাগজে থাকে, বাস্তবে পথ হারায়। আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতা, সামাজিক বিভাজন কমানো এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ওপরে রাখার আহ্বান এসেছে। কথাগুলো শুনতে পুরোনো; কিন্তু কিছু সত্য এত পুরোনো যে আমরা তাকে নতুন করে আবিষ্কার করার ভান করি। শায়েস্তা খানের ‘টাকায় আট মণ চাল’-এর গল্পের সঙ্গে আজকের বাজারদর তুলনা করেও তাই একই প্রশ্ন ফিরে আসে—অর্থনীতির বড় বড় সংখ্যা দিয়ে মানুষের জীবন কতটা বোঝা যায়? শায়েস্তা খানকে ফিরিয়ে আনার দরকার নেই; তাঁর চালের গল্পটিকে আজকের বাজারের আয়নায় একবার দেখা যথেষ্ট। কারণ বাজারে চালের দাম বাড়লে শুধু হিসাবের খাতা ভারী হয় না, রান্নাঘরের হাঁড়িও একটু নিচু স্বরে ফুটতে থাকে। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যানটি শেষ পর্যন্ত মানুষের থালাতেই লেখা থাকে।
দূরের পৃথিবীও আজ সেই একই মানবিক হিসাবের খাতা খুলেছে। আর্জেন্টিনার হয়ে বেনিনের বিপক্ষে ৩–০ জয়ের ম্যাচে লিওনেল মেসি শেষবার জাতীয় দলের জার্সি পরে মাঠে নেমেছেন; ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষে ৩৯ বছর বয়সে তাঁর বিদায়। মেসির পায়ে বল থাকলে পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য সহজ হয়ে যেত—গোলপোস্ট, প্রতিপক্ষ, মহাকর্ষ সবাই যেন তাঁর সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে নিত। এখন জাতীয় দলের জার্সি খুলে রাখবেন তিনি; ফুটবল তাঁকে অবসর দিল, স্মৃতি দিল না। আর আফ্রিকায় কেনিয়া প্রথম নিশ্চিত ইবোলা আক্রান্ত রোগী ও তাঁর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে; কঙ্গো থেকে ফেরা ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ২৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। একই দিনে একদিকে স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়, অন্যদিকে হাসপাতালের করিডরে নতুন সতর্কতা জ্বলে ওঠে। মানবসভ্যতা বোধহয় এমনই—আনন্দ ও আশঙ্কা পাশাপাশি বসে খবরের কাগজ পড়ে।
সবশেষে বরফের নিচ থেকে একটু আলো তুলে নেওয়া যাক। ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন—অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে IceCube পর্যবেক্ষণাগারের মাধ্যমে মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার কাজে তাঁর অবদানের জন্য। এই ‘ভূতুড়ে কণা’ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে প্রায় নির্বিকারভাবে চলে যায়; তাকে ধরতে মানুষ বরফের দেড়–দুই কিলোমিটার নিচে চোখ বসিয়েছে। এক হাতে বাজারের ব্যাগ, অন্য হাতে নক্ষত্রের মানচিত্র—মানুষ একই সঙ্গে কমলালেবুর শুল্ক নিয়েও চিন্তা করে, আবার মহাবিশ্বের অদৃশ্য কণার পেছনেও ছুটে। এই দুই মানুষকে আলাদা করা যায় না। তাই আজকের সকালটির কথাও খুব কঠিন নয়: বড় পৃথিবীটাকে বুঝতে হলে ছোট পৃথিবীটাকে আগে একটু ঠিকঠাক রাখতে হবে—যেখানে বিদ্যুতের আলো থাকবে, বন্দরের গতি থাকবে, বাজারে যুক্তি থাকবে, শিক্ষক মর্যাদা পাবেন, বীরের স্মৃতি নিরাপদ থাকবে এবং রাজনীতি অপরাধের আশ্রয় হবে না। ছোট পৃথিবীটি যদি গোছানো যায়, বড় পৃথিবীর দিকে তাকানোর সময়ও একদিন পাওয়া যাবে।




