বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকার সড়ক কি শুধু খোঁড়াখুঁড়ির জন্য?

আমির সোহেল
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ঢাকার সড়ক কি শুধু খোঁড়াখুঁড়ির জন্য?

আজ ওয়াসা, কাল গ্যাসের লাইন বসাতে আরেক সংস্থা, পরদিন বিদ্যুৎ বা টেলিকম একের পর এক রাস্তা খুঁড়ছে। তারপর মেরামত, আর কিছুদিন পর ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেলসহ  নতুন প্রকল্পের নামে আবার কাটাকাটি। ঢাকাবাসীর কাছে এ দৃশ্য এত পরিচিত যে খোঁড়াখুঁড়ির সঙ্গে যানজট, ধুলা, জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ প্রায় একাকার হয়ে গেছে।

সমস্যাটা আসলে ‘কোন সংস্থা রাস্তা কাটল’ তা নয়। সমস্যা নগর অবকাঠামো পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাব। এটি দুই দশকেরও বেশি পুরোনো, আর প্রতিবারই সংস্থাগুলোকে ‘সমন্বয়ের উদ্যোগ’ নিতে হয়, অথচ ফল মেলে না।

বিশ্বের অনেক শহর এই সমস্যার সমাধান খুঁজেছে রাস্তার নিচে সব সেবার জন্য একটি সমন্বিত পথ তৈরি করে, যাকে বলা হয় কমন সার্ভিসেস টানেল বা ইউটিলিটি টানেল।

সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে-তে প্রায় ২০ কিলোমিটার কমন সার্ভিসেস টানেল আছে, যেখানে বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিকমের লাইন একই কাঠামোতে রাখা হয়েছে। সেখানে টানেলের ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবাদাতাদের দায়িত্ব আইনে স্পষ্ট করা আছে। ভবিষ্যতের জন্য বাড়তি জায়গাও রাখা হয়।

জাপানে ১৯২৩ সালের কান্তো ভূমিকম্পের পর টোকিওতে ভূগর্ভস্থ সমন্বিত পথের ধারণা জোরালো হয়। পরে ১৯৬০-এর দশকে এ নিয়ে আলাদা আইন হয়। বড় সড়কে কাজ করা হয়েছে সরকারি উদ্যোগে, আর সেবা সংস্থাগুলো ব্যবহারের খরচ ভাগ করে নেয়।

চীন গত এক দশকে গুয়াংজু, সাংহাইসহ বহু শহরে ‘আরবান ইউটিলিটি টানেল’ নির্মাণ জাতীয় নীতির অংশ হয়েছে, যাতে ‘রোড জিপার’ নামে পরিচিত বারবার রাস্তা কাটার সমস্যা কমে।

প্যারিসের ভূগর্ভস্থ গ্যালারি ব্যবস্থা দেড় শতকেরও বেশি পুরোনো, যেখানে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও ক্যাবল একসঙ্গে চলে। হেলসিঙ্কিতেও ভূগর্ভস্থ সার্ভিস টানেলের নেটওয়ার্ক শহরের অবকাঠামো পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখে।

এই উদাহরণগুলো আমাদের একটি জায়গায় এনে দাঁড় করায়: রাস্তার নিচে কী যাবে, তা আগে ঠিক করতে হবে, রাস্তা বানানোর পরে নয়। ঢাকার প্রতিটি রাস্তার নিচে মানুষ ঢোকার মতো টানেল বানানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর সম্ভবও নয়। তাই ধাপে ধাপে এগোতে হবে।

নতুন বড় সড়ক, প্রধান সংযোগ সড়ক, নতুন পরিকল্পিত নগর এলাকা ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ইন্টিগ্রেটেড ইউটিলিটি করিডোর বাধ্যতামূলক করা, যেখানে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিকম/ফাইবার, ড্রেনেজ ও spare duct আলাদা compartment-এ থাকবে। পুরোনো ঘনবসতি এলাকায় ছোট shared duct বা ক্যাবল ডাক্ট ব্যবহার করা। যেখানে কিছুই সম্ভব নয়, সেখানে অন্তত সব সংস্থার কাজ একসঙ্গে করা।

রাস্তা নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণের আগে ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, তিতাস, টেলিকম ও রাজউককে বাধ্যতামূলকভাবে একসঙ্গে বসতে হবে। সবার আগামী ৫–১০ বছরের কাজের পরিকল্পনা এক জায়গায় এনে সিদ্ধান্ত হবে যে সব কাজ একসঙ্গে সেরে ফেলা হবে এবং তারপর রাস্তাটি নির্দিষ্ট সময় আর কাটা যাবে না। কাটার অনুমতি চাওয়ার সময় শুধু ‘এখন কেন’ নয়, ‘পরবর্তী কয়েক বছরে আর কী লাগতে পারে’ তাও যাচাই করতে হবে।

রাস্তা কাটার চেয়েও বড় সমস্যা অনেক সময় যথাযথভাবে পুনঃস্থাপন না করা। নিয়মটি হওয়া উচিত খুবই সহজ- যে সংস্থা রাস্তা কাটবে, নির্ধারিত মান অনুযায়ী সেই সংস্থাকেই রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। রাস্তা মেরামতের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এর গুণগত মানের দায়ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেই নিতে হবে। কাজের মান খারাপ হলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাস্তা নষ্ট হয়ে গেলে তাদের জামানত বা কার্যসম্পাদন নিশ্চয়তা (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। গর্তে ইট-মাটি ফেলে চলে যাওয়াকে ‘মেরামত’ বলা যায় না।

আমি মনে করি, ঢাকার জন্য একটি শক্তিশালী “সমন্বিত ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ” বা “সমন্বিত ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনা সেল” গঠন করা প্রয়োজন। এর প্রধান কাজ হবে-

  • মাটির নিচে থাকা সব পাইপ, ক্যাবল ও অন্যান্য ইউটিলিটি লাইনের একটি একক ডিজিটাল মানচিত্র ও তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
  • সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার আগামী ৫–১০ বছরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা।
  • একই সড়ক বারবার কাটার অনুমতি না দিয়ে, প্রয়োজনীয় সব কাজ সমন্বয় করে একসঙ্গে সম্পন্ন করা।
  • জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বর্ষাকালে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি নিষিদ্ধ রাখা।
  • রাস্তা কাটার আগে ও কাজ শেষে ছবি ও ভিডিওসহ ডিজিটাল পরিদর্শন ও নথিভুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করা।
  • নতুন সড়ক নির্মাণের সময় ভবিষ্যৎ ইউটিলিটির জন্য সমন্বিত ইউটিলিটি করিডোর ও সংরক্ষিত খালি ডাক্ট রাখা।
  • জনগণের জন্য অনলাইনে প্রকাশ করা, কোন রাস্তা কেন, কারা কাটছে এবং কবে স্বাভাবিক হবে।

রাস্তা কাটতে হবে, কখনো কখনো অবশ্যই কাটতে হবে, কারণ পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নাগরিক জীবনের অপরিহার্য সেবা। কিন্তু একই রাস্তা যদি পাঁচটি সংস্থা পাঁচবার কাটে, তা উন্নয়ন নয়, পরিকল্পনার ব্যর্থতা।

সিঙ্গাপুর, জাপান বা চীনের মতো দেশগুলো দেখিয়েছে, শুরুতে খরচ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে বারবার খোঁড়ার খরচ, যানজট ও জনদুর্ভোগ অনেক কমে। ঢাকার প্রতিটি নতুন রাস্তা তাই শুধু আজকের গাড়ির জন্য নয়, আগামী ৩০–৫০ বছরের শহরের কথা ভেবে বানাতে হবে।

‘একবার খুঁড়ব, সব কাজ করব, তারপর বহু বছর আর খুঁড়ব না।’ এটাই হোক ঢাকার নগর অবকাঠামো উন্নয়নের মূলনীতি।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর