সকালের চায়ের কাপ হাতে আজ বাংলাদেশের দিকে তাকালে মনে হয়, দেশটি একই সঙ্গে দুই দিকে হাঁটছে-এক পা মাটিতে, আরেক পা ভবিষ্যতের আকাশে। একদিকে দশটি নতুন বিমান কেনার আয়োজন, অন্যদিকে ঘরের চুলায় আগুন জ্বালাতে এলপিজি সিলিন্ডারের খোঁজ। সরকার দাম বেঁধে দিয়েছে, বাজারও সেই দাম শুনেছে; কিন্তু বাজারের নিজের কান আছে, নিজের অঙ্কও আছে-ফলে কোথাও কোথাও সরকারি দামের সঙ্গে চার-পাঁচশো টাকা যোগ করে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ। সরবরাহ সংকটের নাম করে এই অরাজকতা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সেই মানুষের রান্নাঘরে, যিনি অর্থনীতির তত্ত্ব বোঝেন না, শুধু জানেন-আজ সন্ধ্যায় ভাত বসাতে হবে। উন্নয়নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি বোধহয় এখানেই: আকাশে ওঠার আগে মাটির চুলাটিও যেন জ্বলে।
এই কারণেই শিশুদের নিয়ে আজকের কথাটি বেশ ভালো লাগে। প্রতিটি শিশুর মেধা ও প্রতিভা বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; খেলাধুলা, সংগীত, শিল্প-সংস্কৃতি, ভাষা-সবকিছুর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু মেধাবী নয়, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কথাটি শুনতে সহজ, কাজটি মোটেই সহজ নয়। কারণ আমরা বড়রা প্রায়ই শিশুকে বলি, “ভালো করে পড়ো”; খুব কমই বলি, “ভালো মানুষ হও।” অথচ পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়া যায় বছরে একবার, মানুষ হওয়ার পরীক্ষা চলে সারাজীবন। শিশুর হাতে বই দেওয়ার পাশাপাশি যদি একটু মাঠ, একটু গান, একটু আকাশ আর একটু দয়া দিতে পারি-তাহলেই হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের চেয়ে একটু ভালো পৃথিবী বানাবে।
আর ভবিষ্যৎকে বুঝতে গেলে মাঝে মাঝে অতীতের দরজায় কড়া নাড়তে হয়। রাজশাহীর সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল থেকে বিজিবির উদ্ধার করা ১,৮১৮টি ঐতিহাসিক মুদ্রা ও ২৬টি প্রাচীন পাথরের ভাস্কর্য জাতীয় জাদুঘরে হস্তান্তর হয়েছে। সপ্তম শতকের ‘রেবন্ত’, নবম-দশম শতকের জৈন তীর্থঙ্কর, একাদশ-দ্বাদশ শতকের অপরাজিতা ও নটরাজ-পদ্মার চর থেকে উঠে আসা এসব নিদর্শন যেন মাটির ভেতর থেকে আমাদের একটু লজ্জা দিয়ে বলে, “ভদ্রলোকেরা, তোমরা ভাবছ দেশটা তোমরাই আবিষ্কার করেছ?” না, আমাদের আগে মানুষ ছিল, শিল্প ছিল, সভ্যতা ছিল, সৌন্দর্যবোধ ছিল। মাটির নিচে পড়ে থাকা সেই পাথরগুলো আজও সাক্ষ্য দেয়-বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের সৃষ্টিরও ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাসের পাথর আমরা যত্ন করে জাদুঘরে তুলছি, বর্তমানের মানুষটিকে কি ততটা যত্নে রাখছি? সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভাঙচুরের ভিডিও সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নই সামনে এনেছে। রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত চাই, ক্ষতিপূরণ চাই, জবাবদিহি চাই-কিন্তু হাসপাতাল ভাঙচুর কোনো বিচার নয়। একইভাবে চিকিৎসকও দেবতা নন; ভুল হলে তাকেও জবাব দিতে হবে। কিন্তু আইন যখন আছে, তখন ইটের টুকরোকে বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া সভ্যতার খুব উন্নত লক্ষণ নয়। সাংবাদিকের ওপর হামলা, চিকিৎসকের ওপর হামলা কিংবা হাসপাতাল ভাঙচুর-সব ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত একই কথা: অন্যায় প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমরা যেন নিজেরাই আরেক অন্যায়ের জন্ম না দেই।
চলনবিলের ‘কিল্লা ঘর’-এর গল্পটিও তাই কেবল পাখি শিকারের গল্প নয়। কৃত্রিম কুঁড়েঘর, পোষা পাখিকে টোপ বানিয়ে বক শিকার-ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিন শিকারি আটক হয়েছেন। বেচারা বক মানুষের সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি; সে জানত না, তারই জাতভাইকে সামনে বসিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। আমরা শিশুকে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাতে চাই, অথচ বড় হয়ে পাখিকে টোপ বানাই-এই বৈপরীত্যটুকু একটু বিব্রতকর। মানবিকতা যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লক্ষ্য হয়, তবে তার প্রথম পাঠ হতে পারে খুব সাধারণ: যে প্রাণীটি প্রতিবাদ করতে পারে না, তার প্রতিও একটু দয়া।
আজকের লেখায় ভেতরেও যেন এই একই সুর। শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা, এলপিজি বাজারের অরাজকতা বন্ধ করা, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা-বিষয়গুলো আলাদা, কিন্তু রোগটি এক: রাষ্ট্রের সেবা যখন নাগরিকের কাছে পৌঁছায় না, তখন আস্থার জায়গাটি ফাঁকা হয়ে যায়। সেই ফাঁকা জায়গা কখনো দখল করে বাজারের কারসাজি, কখনো জনতার ক্ষোভ, কখনো সামাজিক মাধ্যমের গুজব। রাষ্ট্রের শক্তি তাই শুধু আইন প্রয়োগে নয়; মানুষ যেন মনে করে, “আমার কথা কেউ শুনবে”-এই বিশ্বাস তৈরি করাতেও।
এদিকে পৃথিবীটাও খুব শান্তিতে নেই। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার হুমকি বিশ্ববাণিজ্যের গলায় আরেকটি অদৃশ্য হাত রেখেছে। আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স সতর্ক করেছে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা শুধু জ্বালানি নয়, সার ও খাদ্য সরবরাহেও বড় ধাক্কা দিতে পারে। যুদ্ধের মজার ব্যাপার-যারা যুদ্ধ করে, তারা সাধারণত মানচিত্রে সীমান্ত দেখে; কিন্তু যুদ্ধের আসল বিলটি আসে সীমান্তের বহু দূরে। তেলের দাম বাড়ে, সারের দাম বাড়ে, তারপর একদিন বাংলাদেশের কৃষক বাজারে দাঁড়িয়ে হিসাব করেন-এই যুদ্ধটি আমার জমিতে এসে পৌঁছাল কী করে? পৃথিবী যতই বিশ্বায়িত হয়েছে, মানুষের রান্নাঘরও ততই আন্তর্জাতিক হয়ে গেছে।
তাই আজকের প্রভাতবার্তার শেষ কথাটি খুব বড় কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়। আমরা বিমান কিনব, অবশ্যই কিনব; শিশুর প্রতিভা বিকশিত করব, অবশ্যই করব; মাটির নিচ থেকে সভ্যতার স্মৃতি তুলে আনব, সেটিও করব। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে-চুলায় গ্যাস আছে, হাসপাতালে নিরাপত্তা আছে, সাংবাদিক সত্য বলেও বাড়ি ফিরতে পারেন, শিক্ষক সম্মান নিয়ে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াতে পারেন, পাখি নির্বিঘ্নে আকাশে উড়তে পারে। কারণ উন্নয়নের আসল মাপকাঠি আকাশে কত দূর উড়লাম, তা নয়; মাটিতে থাকা মানুষটি কতটা নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারল। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, অর্থনীতি, যুদ্ধ, বিমান, জাদুঘর-সবকিছুর হিসাব এসে মেলে সেই এক জায়গায়: মানুষের জীবনে। আর মানুষটি যদি হাসতে পারে, নিরাপদে ঘুমাতে পারে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু স্বপ্ন দেখতে পারে-তবেই তো সত্যিকার অর্থে বলা যাবে, সকাল হয়েছে।
লেখক: সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব




