সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

মানুষের স্বস্তিই উন্নয়নের শেষ কথা

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

মানুষের স্বস্তিই উন্নয়নের শেষ কথা

ঢাকার মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্য কোনটি—কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথ বলবেন, কেউ জীবনানন্দ; ঢাকাবাসী একটু ভেবে বলবেন, ‘যানজট’। সেই মহাকাব্যের নতুন অধ্যায়ে সরকার ইনার সার্কুলার রিং রোডের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। শহরের চারদিকে রাস্তা ঘুরবে—আশা করি একদিন মানুষকেও আর একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে হবে না। উন্নয়নের আসল সৌন্দর্য বোধহয় সেখানেই: রাস্তা শুধু গাড়িকে নয়, মানুষকেও এগিয়ে নেবে।

রাষ্ট্রের আরেকটি রাস্তা অবশ্য পিচের নয়—মানুষের শরীর দিয়ে তৈরি। দেশে হামের প্রকোপ ঠেকাতে ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে বিশেষ ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। একই দিনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী পে-ফিক্সেশনও শুরু হচ্ছে; অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একদিকে শিশুর শরীরে প্রতিরোধের ব্যবস্থা, অন্যদিকে কর্মজীবী মানুষের সংসারে একটু আর্থিক স্বস্তি—রাষ্ট্রের দায়িত্বের সংজ্ঞা শেষ পর্যন্ত খুব জটিল নয়: মানুষকে নিরাপদ রাখা এবং তার জীবনটাকে একটু সহজ করা।

কিন্তু রাষ্ট্র কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; রাষ্ট্রের ভেতরে মানুষের পরিচয়ও থাকে। সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং শ্রমিক অধিকারকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দেওয়ার দাবি উঠেছে। এই দাবিগুলোকে কেবল ‘আরও কিছু দাবি’ বলে সরিয়ে রাখলে ভুল হবে। সংবিধান আসলে দেশের সবচেয়ে বড় আয়না—সেখানে যত বেশি মানুষ নিজের মুখ দেখতে পান, রাষ্ট্র তত বেশি নিজের বলে মনে হয়। আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যদি বলেন, ‘আমাকে তো দেখা যাচ্ছে না’, তখন আয়নাটিকেই একটু পরীক্ষা করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ।

সামাজিক মাধ্যমও আজ রাষ্ট্রের এক অদ্ভুত সংসদ—এখানে বক্তৃতার সময়সীমা নেই, স্পিকারের হাতুড়ি নেই, আর মাঝে মাঝে যুক্তিরও ছুটি থাকে। তবু সেখানেই ১৭ বছরের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালিভানের আমেরিকান পেশাদার ফুটবলে ইতিহাস গড়ার খবর নিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের উচ্ছ্বাস বেশ আনন্দের। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে জন্ম নেওয়া একটি ছেলে কী করে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আপন হয়ে যায়—জাতীয়তার এই নরম, সুন্দর দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিপরীতে সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের গ্রেফতার ও তাঁর পুরোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের তফাত নিয়ে চলছে তুমুল ট্রল। রাজনীতির স্মৃতি বড় বিচিত্র জিনিস—ইন্টারনেট তাকে কিছুতেই ভুলতে দেয় না; পুরোনো ভিডিওরও বোধহয় আজকাল পেনশন হয় না।

আজকের সম্পাদকীয়গুলোর সুরেও রাষ্ট্রের দুই প্রান্ত পাশাপাশি এসেছে। একদিকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে পুরোনো ‘দাতা-গ্রহীতা’ সম্পর্কের বাইরে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে আগ্রহী—এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে মর্যাদার এবং সম্ভাবনার খবর। অন্যদিকে যশোরের ভবদহে বর্ষা শেষ হওয়ার পরও দুই শতাধিক গ্রামের মানুষের দীর্ঘ জলাবদ্ধতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি নিজের নাগরিকের জন্য একটি শুকনো উঠানও নিশ্চিত করতে হয়। আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ নিয়ে সম্পাদকীয়গুলোর উদ্বেগটিও একই জায়গায় এসে মেলে—রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হবে, মানুষের কথা বলার জায়গাটিও তত নিরাপদ হওয়া চাই।

আন্তর্জাতিক দুনিয়া অবশ্য আমাদের একটু অন্য শিক্ষা দিচ্ছে। মদিনার বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হুতিদের ড্রোন হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নিন্দা দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের আগুন এখন আর কোনো দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের উত্তাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা একসঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। পৃথিবী যেন এক বিশাল রান্নাঘর—কোথাও আগুন বেশি, কোথাও তেল কম, আর দামটা শেষ পর্যন্ত দিতে হয় পাশের টেবিলে বসা নিরীহ লোকটিকেও।

তাই আজকের সকালটির কথাটা খুব সরল। আমরা একই দিনে একটি শহরের যানজট কমাতে রাস্তা বানাচ্ছি, শিশুকে হাম থেকে বাঁচাতে টিকা দিচ্ছি, কর্মচারীর বকেয়া মেটানোর ব্যবস্থা করছি, সংবিধানে আরও মানুষের পরিচয় খুঁজছি; আবার একই সঙ্গে ভাবছি সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন, ভবদহের মানুষ কবে পানি থেকে উঠবে, আর পৃথিবীর যুদ্ধ আমাদের বাজারে এসে কতটা ধাক্কা দেবে। একটি দেশ আসলে এভাবেই এগোয়—বড় বড় বক্তৃতায় নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে। রাস্তা বানানো জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো দেশের মানুষ যেন সেই রাস্তায় নিরাপদে, মর্যাদায় এবং একটু হাসিমুখে হাঁটতে পারে। এইটুকু হলেই প্রভাতটা সার্থক।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর