রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়-বিশ্বখাতের দূরত্ব ঘোচাতে জাতীয় কৌশল চাই

অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

শেয়ার করুন:

বিশ্ববিদ্যালয়-বিশ্বখাতের দূরত্ব ঘোচাতে জাতীয় কৌশল চাই
কোলাজ: ঢাকা মেইল

৩ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত Dhaka University Public Administration International Conference 2026-এর Education, Governance and Policy অধিবেশনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের এক মৌলিক সংকট সামনে এনেছে।

গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল Developing a National Strategy for Minimizing Academia-Industry Gaps in Bangladesh: Institutional Dynamics and Policy Frameworks for Higher Education। অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয় অধ্যাপক সৈয়দ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ মেমোরিয়াল কনফারেন্স হলে। 

অধ্যাপক ড. শরিফুল আলম ও অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলামের যৌথভাবে উপস্থাপিত এই গবেষণাপত্রটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রশ্ন নিয়ে।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, ডিগ্রি অর্জনের সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ডিগ্রি কি কর্মজীবনের বাস্তব প্রস্তুতি তৈরি করছে? গবেষণাটি দেখিয়েছে, সমস্যা শুধু দক্ষতার ঘাটতি নয়; এটি গভীরভাবে একটি শাসনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মন্ত্রণালয় অনেক সময় সমান্তরাল পথে চলে; কিন্তু যৌথ লক্ষ্য, জবাবদিহি, অর্থায়ন, পাঠ্যক্রম সংস্কার ও কর্মসংস্থানের ফলাফলকে একই কাঠামোয় আনতে পারে না।

গবেষণায় প্রাথমিকভাবে ৪৫০ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ, ৪২ জন একাডেমিক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকের সাক্ষাৎকার এবং নীতিপত্র, উচ্চশিক্ষার তথ্য ও শ্রমবাজার-সংক্রান্ত দলিল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই মিশ্র পদ্ধতি গবেষণাটিকে শুধু মতামতভিত্তিক রাখেনি; বরং সমস্যার পরিধি, কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান একত্রে বোঝার সুযোগ দিয়েছে।

জরিপের তথ্য উদ্বেগজনক। ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও চাকরির প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে অসামঞ্জস্য আছে। ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী সীমিত ইন্টার্নশিপ বা কাজভিত্তিক শেখার সুযোগকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। ৭৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুকূল ও শিক্ষণবান্ধব পরিবেশের ঘাটতির কথা বলেছেন। ৮৫ শতাংশ মনে করেন, নন-সায়েন্স বা সামাজিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার্থীরা দক্ষতার অমিলের কারণে শ্রমবাজারে তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়েন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোগে চাকরির প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় নন; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দুর্বল।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় বার্তা আছে। শিক্ষার্থীরা যদি নিজের খরচে, নিজের চেষ্টায়, বিভিন্নভাবে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী? উচ্চশিক্ষা কি শুধু পরীক্ষা, সনদ ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ডিজিটাল দক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত করবে?

গবেষণাটি তাত্ত্বিকভাবে ট্রিপল হেলিক্স ধারণা, স্কটের প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ এবং পথনির্ভরতার বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছে। সহজ ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে; কিন্তু শুধু বৈঠক, সমঝোতা স্মারক বা কমিটি গঠন করলেই সহযোগিতা তৈরি হয় না। নিয়ম, পেশাগত মূল্যবোধ, অর্থায়ন, প্রণোদনা এবং পারস্পরিক আস্থার সংস্কৃতি না বদলালে সহযোগিতা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।

সাক্ষাৎকারে একজন একাডেমিক প্রশাসক বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমঝোতা স্মারক সই করতে আগ্রহী; কিন্তু এরপর প্রশ্ন আসে, কাজটি অনুমোদন করবে কে, সমন্বয়ের খরচ দেবে কে, আর দায়িত্ব নেবে কে? এই বক্তব্য বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বাস্তব দুর্বলতা তুলে ধরে। আমাদের নীতি আছে, কমিটি আছে, সেল আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত, বাজেট, দায়িত্ব ও ফলাফল যাচাইয়ের ব্যবস্থা দুর্বল।

আরেকজন শিক্ষক বলেছেন, ইন্টার্নশিপ তদারকি বা নিয়োগদাতার সঙ্গে যোগাযোগে সময় দিলে তা পদোন্নতিতে বিশেষ মূল্য পায় না। ফলে শিক্ষক কেন শিল্পখাতের সঙ্গে কাজ করবেন? বিশ্ববিদ্যালয় যদি গবেষণা, পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজের বাইরে শিল্প-সংযোগ, শিক্ষার্থী প্লেসমেন্ট, কারিকুলাম কো-ডিজাইন ও প্রয়োগমুখী গবেষণাকে মূল্যায়ন না করে, তাহলে সহযোগিতা টেকসই হবে না।

শিল্পখাতের দিক থেকেও সমস্যা আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি জোগানদাতা হিসেবে দেখে, আর বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পখাতকে অনেক সময় শুধু মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মনে করে। এই পারস্পরিক ধারণাগত দূরত্ব আস্থা কমায়। 

অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে জ্ঞান, দক্ষতা ও উৎপাদন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পোশাকশিল্প, আইসিটি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, আর্থিক খাত ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি, বিশ্লেষণ, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় দেখানো হয়েছে, লিয়াজোঁ অফিস, অ্যাডভাইজরি বোর্ড বা সমঝোতা স্মারক কার্যকর হতে পারে; কিন্তু তা তখনই অর্থবহ, যখন এগুলো পাঠ্যক্রম, বাজেট, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও প্লেসমেন্টের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। অন্যথায় এগুলো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বাংলাদেশে অনেক সংস্কার উদ্যোগ দৃশ্যমান কাঠামো তৈরি করে, কিন্তু আচরণগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। এটিই ceremonial compliance—দেখানোর জন্য সংস্কার, কিন্তু সিদ্ধান্তে পরিবর্তন নেই।

এ অবস্থায় দরকার একটি জাতীয় কৌশল। সেই কৌশল বিভিন্ন প্রকল্পনির্ভর হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক ও খাতভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। প্রথম ধাপে নিয়ম, তথ্যভিত্তি, পাইলট নির্বাচন, খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার ও ডেটা গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট কলেজ ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানে ভিন্নধর্মী পাইলট চালু করতে হবে। তৃতীয় ধাপে যাচাইযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে বিস্তৃতি ঘটাতে হবে।

এই কৌশলে কয়েকটি সূচক বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত: মানসম্মত ইন্টার্নশিপের সংখ্যা, নিয়োগদাতার সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্নাতকদের কর্মসংস্থানের মান, শিক্ষকের শিল্পখাত-সম্পৃক্ততা, শিল্পখাত-অর্থায়িত গবেষণা, আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তি এবং গবেষণার ফলাফলের ব্যবহার। শুধু কতজন পাস করল তা নয়, তারা কী ধরনের কাজ পেল, কত দ্রুত পেল, তাদের দক্ষতা কতটা কাজে লাগল—এসবও মূল্যায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নন-সায়েন্স বা সামাজিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, আইন, ব্যবসায় শিক্ষা, গণযোগাযোগ, বাংলা, ইংরেজি বা ইতিহাসের শিক্ষার্থীরা শুধু সরকারি চাকরির অপেক্ষায় থাকবেন—এমন ধারণা আর বাস্তবসম্মত নয়। ইউজিসির তথ্য অনুসারে, প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী নন-সায়েন্স গ্রুপে অধ্যয়ন করেন। তাঁদের জন্য তথ্য বিশ্লেষণ, নীতি বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, গবেষণাপদ্ধতি, ডিজিটাল টুল, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করতে হবে।

এখানে সরকার, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও পেশাজীবী সংগঠনকে সমন্বিত কাঠামোয় আনতে হবে। পাঠ্যক্রম অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও নমনীয় করতে হবে। শিক্ষার মূল্যায়নে শিল্প-সংযোগ ও প্রয়োগমুখী গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার সেবা, ইন্টার্নশিপ ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগদাতার সঙ্গে সংলাপকে প্রশাসনিক প্রান্তিক কাজ হিসেবে নয়, মূল একাডেমিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণার প্রধান বার্তা হলো: বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের দূরত্ব কমাতে আলাদা আলাদা প্রকল্প নয়, জবাবদিহিমূলক সহযোগিতা-ইকোসিস্টেম দরকার। ডিগ্রি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ডিগ্রি যদি দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, কর্মপ্রস্তুতি ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবার জন্য অপূর্ণ বিনিয়োগ হয়ে থাকে।

অতএব এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: উচ্চশিক্ষাকে আমরা কি সনদ উৎপাদন ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে রূপ দেব? সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও রাষ্ট্রকে একই টেবিলে বসিয়ে শুধু কথা নয়, ফলাফলভিত্তিক কাঠামো তৈরি করার। কারণ বাংলাদেশের তরুণদের সমস্যা আগ্রহের অভাব নয়; তাঁদের সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক পথের অভাব। সেই পথ তৈরি করাই এখন উচ্চশিক্ষানীতির সবচেয়ে জরুরি কাজ।

লেখক: গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস এক্সপার্ট এবং অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

এমএইচএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর