রোববারের সকালটির একটা মায়া আছে-ছুটির শেষ আলস্যটুকু তখনও বিছানার চাদরে লেগে থাকে, অথচ রাষ্ট্রের অফিসে ফাইলগুলো বেশ ভোরেই ঘুম থেকে উঠে যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রেরও নিশ্চয় মানুষের মতো মন আছে; দুদিন ছুটি কাটিয়ে আজ হয়তো সে-ও একটু হাই তুলে বলছে, ‘চলুন, দেখি আজ কী করা যায়।’
খবরের কাগজ খুলে অবশ্য মনে হলো, কাজের তালিকা বেশ লম্বা। কোথাও শুল্কের খাতা, কোথাও চায়ের বাগান, কোথাও হাসপাতালের করিডর, কোথাও বাজারের সিন্ডিকেট-আর এক কোণে বইমেলা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সকালটি বেশ বিচিত্র; এক হাতে হিসাবের খাতা, অন্য হাতে বই।
বে-অব-বেঙ্গল কনভারসেশনে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বক্তব্যটি এই সকালের সবচেয়ে ভারী কথাগুলোর একটি। তার মতে, শক্তিশালী দেশগুলো শুল্ককে এখন কেবল রাজস্ব আদায়ের যন্ত্র হিসেবে নয়, দুর্বল দেশকে চাপে রাখার অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করছে-আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যেন আবার ঔপনিবেশিক ছকটির দিকে হাঁটছে।
কথাটি শুনতে একটু পুরোনো ইতিহাসের মতো, কিন্তু কৌশলটি বেশ আধুনিক: আগে কামান দিয়ে ভয় দেখানো হতো, এখন কখনো কখনো ট্যারিফের নোটিশই যথেষ্ট। বাংলাদেশের জন্য তার পরামর্শ-প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে, আঞ্চলিক বাজারকে কাজে লাগাতে হবে। সম্পাদকীয়ও প্রায় একই সুরে বলছে, বড় শক্তির একক শুল্কনীতির মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং রফতানি-বৈচিত্র্য এখন আর সাজসজ্জার বিষয় নয়। পৃথিবীর বাজারে সবাই যদি নিজের দরজা শক্ত করে বন্ধ করে, আমাদের অন্তত প্রতিবেশীর দরজায় কড়া নাড়ার অভ্যাসটা ভালো হওয়া চাই।
বড় অর্থনীতির এই তত্ত্বের নিচেই ছোট অর্থনীতির বড় কান্না। দেশের চা শিল্পকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনর্গঠনের প্রস্তাব-৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদ, বাগান পুনরোপণে দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড এবং কারখানা আধুনিকায়নে সাত বছর মেয়াদি অর্থায়ন-সুতরাং নিছক ব্যাংকিং খবর নয়। ২০১৯ সাল থেকে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে চায়ের বিক্রয়মূল্য কম; অর্থাৎ বাগান আছে, পাতা আছে, শ্রমিক আছে, চায়ের কাপও আছে-শুধু হিসাবের খাতাটি একটু অভিমান করে বসে আছে। অথচ চা-বাগানের লোকসান শেষ পর্যন্ত মালিকের ব্যালান্সশিটে থেমে থাকে না; তার ঢেউ গিয়ে লাগে শ্রমিকের সংসারে। অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটি বোধহয় এটাই-একটি সংখ্যার পেছনে কতগুলো মানুষের মুখ লুকিয়ে থাকে।
ঢাকার আবর্জনাও আজ বেশ উচ্চাভিলাষী হয়েছে। এতদিন তাকে আমরা নাক সিঁটকে ‘ময়লা’ বলেছি; এখন প্রযুক্তি তাকে বলছে- ‘সম্পদ’। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প তাই পরিচ্ছন্নতার গল্পের পাশাপাশি অর্থনীতিরও গল্প। যে জিনিসটি সকালে ডাস্টবিনে ফেলে নিশ্চিন্ত হই, সন্ধ্যায় সেটিই যদি বিদ্যুতের আলো হয়ে ঘরে ফেরে, তাহলে নাগরিক সভ্যতার সঙ্গে একটু আপস করা যায়। কিন্তু বাজারের গল্পে আলো ততটা উজ্জ্বল নয়। জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসা পাচ্ছে।
মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না-দোকানে পণ্য থাকবে, দামটা অকারণে লাফাবে না, আর গুদামের দরজার ভেতরে কোনো অদৃশ্য ‘সিন্ডিকেট-দেবতা’ বসে বাজারের ভাগ্য লিখবে না। বাজার স্বাধীন হোক, অবশ্যই; তবে মানুষের পকেটটিও যেন স্বাধীন থাকে।
হাসপাতালের খবরটি আরও অস্বস্তিকর। রোগীর স্বজনের উৎকণ্ঠা সত্য, চিকিৎসকের ভুল হলে তার জবাবদিহিও চাই; কিন্তু চিকিৎসককে হেনস্তা করে হাসপাতালকে নিরাপদ করা যায় না। সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও হাসপাতাল প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি তাই যথার্থ। অসুস্থ মানুষের বাড়ির লোক স্বভাবতই উদ্বিগ্ন-মাথার ভেতর তখন যুক্তির চেয়ে ভয় একটু বেশি কাজ করে। কিন্তু হাসপাতাল যদি সেই ভয়কে বিশৃঙ্খলায় পরিণত হতে দেয়, তাহলে সবচেয়ে অসহায় মানুষটিই শেষ পর্যন্ত বিপদে পড়ে। চিকিৎসক নিরাপদ থাকবেন, রোগী সম্মান পাবেন, প্রশাসন দায়িত্ব নেবে-এই তিনটি একসঙ্গে না হলে হাসপাতাল কেবল ভবন থাকে, চিকিৎসালয় হয় না।
তারপর হঠাৎ বই। রাজাপুরসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব শুরু হয়েছে। খবরটি পড়ে মনে হলো, রাষ্ট্রের ব্যস্ত মুখের পাশে কেউ যেন নরম করে একটি বই রেখে দিয়েছে। সম্পাদকীয়র সতর্কতাটিও মনে রাখার মতো-বইমেলা যেন শুধু সস্তা কাটতির বইয়ের দোকান না হয়ে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্যের জায়গা হয়। সব বই সমান নয়, যেমন সব খাবারকে ‘ভোজ’ বলা যায় না। কোনো বই হয়তো রাত জাগায়, কোনো বই মানুষ বদলায়; আর কোনো কোনো বই শুধু টেবিলের ওপর পড়ে থাকে এবং ধুলো সংগ্রহ করে। প্রকাশকের দায়িত্ব তাই শুধু বই ছাপা নয়-কোন বই মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেটিও ভাবা।
রাজনীতি অবশ্য বইয়ের পাতায় বসে থাকে না; সে নিজেই খবর হয়ে বেরিয়ে আসে। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার জানিয়েছেন, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এর নির্দিষ্ট কোনো ডেডলাইন নেই। সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে যতই উত্তাপ থাকুক, প্রত্যর্পণ কোনো ফেসবুকের স্ট্যাটাস নয় যে রাত বারোটায় পোস্ট দিয়ে সকালে রায় দেওয়া যাবে। এর নিজস্ব আইন আছে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে, সময় আছে। রাষ্ট্রের পরিপক্বতার একটি লক্ষণ হলো-আবেগ যত দ্রুত ছুটুক, প্রতিষ্ঠান তার চেয়ে একটু ধীরে হাঁটে।
দূরের পৃথিবীও আজ আমাদের খুব কাছের। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারকে অস্থির করছে; যুদ্ধের আগুন যেখানে জ্বলে, তার তাপ অনেক সময় পৌঁছে যায় এমন দেশেও, যারা যুদ্ধে অংশ নেয়নি। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো বলছে, উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত অর্থায়নে এখনও যথেষ্ট এগোয়নি। বাংলাদেশের জন্য দুটি বিষয়ই পরিচিত-তেলের দাম বাড়লে বাজারে তার ঢেউ আসে, আর জলবায়ু বদলালে নদী-উপকূলের জীবনে তার খেসারত দিতে হয়। পৃথিবীর বড় বড় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আর ছোট দেশগুলো মাঝে মাঝে তার বিলটা হাতে পায়-এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রসিকতাটি অবশ্য মোটেই হাসির নয়।
তবু রোববারের সকালে হতাশ হয়ে বসে থাকার কোনো কারণ নেই। একই দিনের খবরেই তো দেখা যাচ্ছে-শুল্কের দাপটের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা হচ্ছে, চা শিল্পকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে, আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ বানানোর পরিকল্পনা এগোচ্ছে, বাজারের কারসাজির বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ কথা বলছে, আর দূর-দূরান্তে বই নিয়ে ঘুরছে ভ্রাম্যমাণ মেলা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতে সমস্যার তালিকা যেমন আছে, সমাধানের সরঞ্জামও আছে। শুধু চাবিটা ঠিক তালায় ঢোকাতে হবে। আর চাবি ঘোরানোর সময় একটা কথা মনে রাখা ভালো-রাষ্ট্রযন্ত্র যত বড়ই হোক, তার ইঞ্জিনের আসল জ্বালানি মানুষ। মানুষ স্বস্তিতে থাকলে রাষ্ট্র চলে; মানুষ হাঁপিয়ে উঠলে সবচেয়ে চকচকে যন্ত্রটিও একদিন কাশতে শুরু করে।
লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক




