শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

‘ছোট মাছ ধরতে আমরা খুব ব্যস্ত, জালটা কে ফেলেছে সে প্রশ্নে ঘুম পায়’

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

‘ছোট মাছ ধরতে আমরা খুব ব্যস্ত, জালটা কে ফেলেছে সে প্রশ্নে ঘুম পায়’

শুভ সকাল। শনিবারের সকালটির চরিত্রই আলাদা। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে অ্যালার্ম ঘড়ি এমনভাবে চেঁচায়, যেন রাষ্ট্রের যাবতীয় দায়িত্ব আজ আপনার একার ঘাড়ে। শনিবারে সে-ই আবার একটু ভদ্র হয়ে আসে—চোখ মেলে দেখেন, সূর্য উঠেছে, কিন্তু আপনার ওঠার তাড়া নেই। চায়ের কাপটিও যেন আজ একটু বেশি সময় নিয়ে ঠোঁটে আসে। 

কিন্তু খবরের কাগজের সে সৌভাগ্য নেই; পৃথিবী শনিবারেও খবর তৈরি করে। আর আজকের খবরগুলো পড়তে গিয়ে মনে হলো—আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বোধহয় উন্নয়ন নয়, ন্যায্যতা। কে কতটুকু পাবে, কে কতটুকু বলবে, কার ঘাম কত দামে বিকোবে, আর কার জমি কে দখল করবে— সভ্যতার যাবতীয় দর্শন শেষ পর্যন্ত এসে এই হিসাবের খাতাতেই বসে।

এই হিসাবের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী পাতাটি আজ নারীদের শ্রম নিয়ে। দেশের নানা খাতে নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন; কিন্তু মজুরির খাতায় এসে যেন অদৃশ্য কোনো কেরানি কলমটা একটু বাঁকিয়ে দেন। নারীদের মজুরি বৈষম্য ও শ্রমবাজারে অসমতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের ভিডিও ফেসবুক-ইউটিউবে তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা একে বলবেন ধিমব মধঢ়; সংসারের মানুষ বলবে— ‘একই কাজ, টাকা কম কেন?’ কথাটি খুব ছোট, কিন্তু তার ভেতর দিয়ে একটি সমাজের আয়নাটি বেশ বড় হয়ে যায়। যে নারী একই রোদে পোড়েন, একই ঘাম ঝরান, একই উৎপাদন বাড়ান- তার মজুরির বেলায় কেন যেন হিসাবরক্ষকের চোখে একটু কুয়াশা নামে!

ন্যায্যতার সেই কুয়াশা জমির ক্ষেত্রেও কম নয়। ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বাড়ি-দোকান ও খাসজমি দখলের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। সম্পাদকীয় পাতাতেও একই সুর— দখলের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, প্রশাসনের নিস্পৃহতা কাটাতে হবে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে হবে। জমি দখল আর মজুরি বঞ্চনা দেখতে আলাদা দুই কাহিনি; কিন্তু ভেতরের অঙ্কটি আশ্চর্য রকম একই— যার শক্তি বেশি, তার দাবি যেন একটু বেশি জোরে শোনা যায়। দুর্বল মানুষের সমস্যা হলো, তার কণ্ঠস্বর সাধারণত মাইক্রোফোন পায় না; সে শুধু দীর্ঘশ্বাস পায়।

আর শক্তির সেই ছোট সংস্করণটির নাম যেন আজকাল ‘কিশোর গ্যাং’। মহানগরের গলি পেরিয়ে উপজেলা-গ্রামেও কিশোর অপরাধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্পাদকীয়গুলো প্রশ্ন তুলেছে, এই কিশোরদের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’দের ভূমিকা নিয়েও কেন সমান কঠোরতা দেখা যাবে না? ছেলেটির হাতে থাকার কথা বই, ব্যাট কিংবা ফুটবল; সেখানে যদি অস্ত্র এসে বসে, তাহলে শুধু ছেলেটিকে ধরে ছবি তুললেই তো গল্প শেষ হয় না। বড় ভাই যদি ছাতা হন, তবে বৃষ্টির দায় শুধু ছাতার নিচে দাঁড়ানো ছেলেটির নয়। আর আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত অভ্যাস— ছোট মাছ ধরতে আমরা খুব ব্যস্ত, জালটা কে ফেলেছে সে প্রশ্নে মাঝে মাঝে একটু ঘুম পায়।

আইনের এই প্রতিদিনের পরীক্ষার মধ্যেই বিমানবন্দরের একটি ঘটনা সামনে এসেছে। সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, দায়িত্ব পালনরত এক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই আইন ও আদালতের বিষয়। কিন্তু ঘটনাটি অন্তত একটি পুরনো সত্যকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়— বিমানবন্দরের দরজায় পাসপোর্টের সঙ্গে যদি আরেকটি কাগজ দেখাতে হতো, তার নাম হওয়া উচিত ‘আইনের কাছে সবাই সমান।’ কাগজটি কাল্পনিক, কথাটি কিন্তু একেবারে বাস্তব।

দূরের পৃথিবীও আজ খুব শান্তিতে ঘুমোচ্ছে না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘খুব ভালো প্রস্তাব’ রয়েছে। যুদ্ধের পৃথিবীতে শান্তির কথা শুনলেই ভালো লাগে— যদিও যুদ্ধ বন্ধ করা অনেকটা বিয়ের পাকা কথা বলার মতো নয়; এখানে বর-কনের বদলে থাকে সীমান্ত, ক্ষেপণাস্ত্র আর ইতিহাসের বহু পুরোনো অভিমান। অন্যদিকে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানিয়েছেন। সমুদ্রের পানি অবশ্য কোনো দেশের ভিসা চায় না; তাই জলবায়ুর বিপদও পাসপোর্ট দেখে আসে না। একই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নও আবার উচ্চারিত হয়েছে—অর্থাৎ পৃথিবীর বড় সমস্যাগুলোও শেষ পর্যন্ত মানুষের ছোট্ট একটি নিরাপদ ঘর চাওয়ার গল্প।

আজকের শনিবারের খবরগুলো তাই শেষ পর্যন্ত এক জায়গাতেই এসে বসে—ন্যা য্যতার টেবিলে। নারীর শ্রমের দাম, কৃষকের জমি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, কিশোরের ভবিষ্যৎ, একজন সরকারি কর্মীর মর্যাদা কিংবা সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দেশের অস্তিত্ব— সবকিছুর মূলে একই প্রশ্ন: শক্তিশালী কে, আর ন্যায্য কে? 

শনিবার বলে প্রশ্নটির উত্তর আজই দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আজ বরং চায়ের কাপটি আরেকটু ধীরে শেষ হোক। খবরের কাগজটি একটু ভাঁজ করে পাশে রাখা যাক। তারপর নিজের মনকে জিজ্ঞেস করা যাক— আমরা কি সত্যিই এমন একটি দেশ বানাতে পারছি, যেখানে মানুষের ঘাম, জমি, সম্মান আর ভবিষ্যৎ—কোনোটির দামই তার দুর্বলতার কারণে কমে যাবে না? 

উত্তরটি হয়তো আজ পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্নটি জেগে থাকাই ভালো। কারণ সভ্যতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিন সেই দিন, যেদিন মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, আর প্রশ্ন করতেও তার আলসেমি লাগে।

লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট ও বিশ্লেষক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর