মানবজীবন চক্রাকারে আবর্তিত হয়। জীবচক্রের শেষ ধাপ বার্ধক্য। এটি অবশ্যম্ভাবী ও চিরন্তন সত্য। গতিশীল পৃথিবীতে মানুষ বয়সকে কেউ ধরে রাখতে পারে না। প্রত্যেকেই ক্রমাগত বয়স অতিক্রম করছে। বয়সের সাথে সাথে মানুষ নির্দিষ্ট বয়সসীমা পার হয় এবং শিশুকাল, শৈশব, কৈশোর, যৌবন, পরিণত বয়স পার হয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়। কিন্তু জীবনচক্রের ধাপ অনুসারে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হয় ভিন্ন ভিন্ন। একজন মানুষ পরিণত বয়সে তার দক্ষতা, সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতার প্রয়োগ করে। সক্ষম বয়সেই মানুষ পরিবার ও দেশের তরে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে। দীর্ঘ বয়স অতিক্রম করে আজ যারা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে, তারাই আজ প্রবীণ হিসেবে গণ্য। আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান প্রবীণেরা জীবনশক্তি উৎসর্গ করেছে। আজ অনেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। তারা আমাদেরই অতি আপনজন। তথা: দাদা-দাদি, নানা-নানি, পিতা-মাতা ইত্যাদি। আবার পেশাজীবী অনেকেই আজ প্রবীণ, যেমন: শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কৃষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী প্রমুখ। বর্তমান প্রবীণেরাই আধুনিক সমাজের রূপকার এবং সমাজের শ্রদ্ধেয় গুরুজন। সময়ের আবর্তে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবীণ সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। প্রবীণ ব্যক্তির জীবন প্রত্যাশা পূরণ সময়ের দাবি। প্রবীণ সেবায় প্রয়োজনীয় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আজ ০১ অক্টোবর, বিশ্ব প্রবীণ দিবস। প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রবীণবিষয়ক সচেতনতা জোরদারকরণের লক্ষ্যে এ দিবসের আয়োজন। ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ০১ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রবীণ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ০১ অক্টোবর হতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives’ (‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’)। বার্ধক্য মানবজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। যারা আজ প্রবীণ এবং বার্ধক্যে উপনীত, তারাই আধুনিক সমাজের প্রণেতা। তাদের উৎসর্গিত জীবনের চরম সুবিধাভোগী বর্তমান সমাজ। কিন্তু আধুনিক সমাজে তারা অসহায় ও অক্ষম।
বার্ধক্যে পৌঁছানোর পর থেকে প্রবীণরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন: ক্ষুধামন্দা, অনিদ্রা, ওজন হ্রাস, শারীরিক দুর্বলতা, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য, বিষণ্ণতা, স্মৃতিভ্রষ্টতা, পড়ে যাওয়া, প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা, চোখের ছানি, পানি শূন্যতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা। বর্তমান সময়ে প্রবীণরা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন। তারা পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অজ্ঞতা ও বৈষম্যের শিকার।
জাতিসংঘ ঘোষণা ও প্রবীণবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিকে প্রবীণ বলে অভিহিত করা হয়। চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি ও প্রবীণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে দেশে প্রবীণ সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে বর্তমান প্রবীণ সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লক্ষ, যা মোট জনসংখ্যার ৯.৪৩ শতাংশ। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা তথ্য মতে, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৯.২৮ শতাংশ। জনসংখ্যাবিদদের ধারণা, ২০৫০ সালে দেশে প্রবীণ সংখ্যা হবে ৪.৫০ কোটি। ২০৫০ সালে প্রবীণ সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ২০৬১ সালে প্রবীণ সংখ্যা হবে ৫ কোটি ৪৫ লাখ, যা হবে মোট জনসংখ্যার ২৪.৮১ শতাংশ। কোনো দেশের প্রবীণ সংখ্যা যদি মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ হয়, তবে ওই দেশকে বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ বলা হয়। ১৯৭১ সালে দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল পুরুষদের ৪১ বছর এবং নারীদের ৪৩ বছর। ২০২৪ সালে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৭৩ বছরে পৌঁছেছে। দেশের বর্তমান গড় আয়ু ৭২.৩ বছর। এ হিসাবে বাংলাদেশ এখন বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান আধুনিক বিশ্ব দীর্ঘায়ুর যুগে ধাবিত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সভ্যতার উৎকর্ষতায় মানুষের বয়স বাড়ছে। কিন্তু বাড়তি জীবনে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এক নয়। ধরা যাক, ৬৫ বছর বয়সী একজন মানুষ অনায়াসে হাঁটছেন, সিঁড়ি ভাঙছেন, নতুন কিছু শিখছেন, স্মৃতি ধরে রাখছেন, পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখছেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছেন। অপরদিকে একই বয়সের আরেকজন হয়তো একাধিক রোগে আক্রান্ত, দুর্বল, ধীরগতির এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বয়স বিবেচনায় দু’জনের বয়স একই। কিন্তু জৈবিক ও কার্যকর সক্ষমতা ভিন্ন। এ ক্ষেত্রে মানুষের Intrinsic Capacity বা অন্তর্নিহিত সক্ষমতা নামক নতুন ধারণার উদ্ভব হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ The New York Times-এ প্রকাশিত Dana G. Smith-এর প্রতিবেদনে ইহা দীর্ঘায়ু বা Intrinsic Capacity গবেষণার সম্ভাব্য নতুন মাপকাঠি হিসেবে আলোচিত হয়েছে। প্রকাশিত এ প্রতিবেদনের মূল বিষয় হচ্ছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীর ও মনের সক্ষমতা কতটুকু অক্ষুণ্ণ আছে, সেটাই হবে ভবিষ্যৎ সুস্থ বার্ধক্য পরিমাপের কার্যকর মাপকাঠি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুসারে, অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বা Longevity হলো একজন ব্যক্তির হাতে থাকা সমস্ত শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সমষ্টি। যা পাঁচটি সূচক দ্বারা পরিমাপন করা যায়। যথা: চলাফেরার সক্ষমতা (Locomotor Capacity), চিন্তা ও স্মৃতির সক্ষমতা (Cognitive Capacity), মানসিক সক্ষমতা (Psychological Capacity), দৃষ্টি ও শ্রবণ সক্ষমতা (Sensory Capacity) ও প্রাণশক্তি (Vitality)।
বর্তমান জনমিতিক তথ্য মতে, বাংলাদেশ ক্রমেই Ageing Society-এর দিকে এগোচ্ছে। ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা শুধুমাত্র রোগ শনাক্তকরণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বরং একজন ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তির মানসিক ক্ষমতা স্থিতিশীল রাখার সূচকসমূহ বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই জনসংখ্যার Ageing নিয়ে পরিকল্পনা করতে শুধু “কতজন প্রবীণ” তা জানা যথেষ্ট নয়। জানতে হবে কতজন প্রবীণ কার্যকরভাবে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে। Intrinsic Capacity-এর মৌলিক দর্শন, মানুষের জীবনের মূল্য কেবল আয়ুতে নয়, বরং স্বাধীনতা ও সক্রিয়তার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। কারণ দীর্ঘজীবনের (longevity) মৌলিকত্ব যদি কেবল দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা হয়, তা হবে অসম্পূর্ণ। বরং সুস্থ, স্বাধীন ও অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকাই প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাই বর্ধিত বয়সে প্রবীণদের জন্য সকল উদ্যোগের যোগান দিতে হবে। প্রবীণ সেবায় গড়তে হবে নতুন পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থা।
বার্ধক্য দেশের একটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা। বর্তমান সমাজে প্রবীণেরা সর্বাধিক অবহেলার শিকার। সমাজে আদর্শিক শিক্ষা, মূল্যবোধগত সংশয় ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব বিরাজমান। দেশের বৃদ্ধ পিতা-মাতা কত যে অসহায় জীবনযাপন করছেন, তা উপলব্ধি করা যায় না। পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনায় অপমান ও অসহায়ত্বের কথাগুলো অতিসচেতনভাবে গোপন রাখছে। তথাপি ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ বাবা-মাকে আলাদা রাখা, বাড়ি পাহারা, বাজার করানো, সন্তানকে দেখাশোনা ও স্কুলে পাঠানো, ধমক দিয়ে কথা বলা, অপমানজনক আচরণ, চিকিৎসা হতে বঞ্চিত, পেনশনের টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, জমি-বাড়ি জোর করে লিখে নেওয়াসহ নানান অভিযোগ প্রতিনিয়ত শোনা যায়। WHO-এর তথ্য মতে, বিশ্বে বর্তমানে প্রতি ৬ জনে ১ জন প্রবীণ নির্যাতনের শিকার, যা সংখ্যায় ১৪ কোটির বেশি। বর্তমান সময়ে প্রবীণ ব্যক্তির অন্যতম সংকট একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্ণতা। যার অন্যতম কারণ: যৌথ পরিবারের অবসান, একক পরিবারের আধিপত্য, অধিক হারে নারীর কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য সন্তানদের বিদেশ গমন ইত্যাদি।
প্রবীণ ব্যক্তির মর্যাদায় সকল পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ইহা প্রবীণ সমাজের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। বর্তমান জনস্বাস্থ্যের অন্যতম তত্ত্ব হচ্ছে: মমতাময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যাতে প্রবীণবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। প্রত্যেককেই প্রবীণ সেবায় নিবেদিত করতে হবে। যা দেখে নিজ সন্তান ও নবীনরা ভবিষ্যতে প্রবীণ সেবায় উৎসাহিত হয়। বর্তমান প্রজন্মকে যদি প্রবীণ সেবার গুরুত্ব বিষয়ে দীক্ষা প্রদান করা যায়, তবেই প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠন করা সম্ভব। এ বিশ্ব সাজিয়েছে যারা এবং গড়েছে যারা, বর্তমান সমাজ তাদের কাছে ঋণী। প্রবীণেরা আজ প্রতিদান প্রত্যাশী নয়, বরং মর্যাদার দাবিদার। দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বিবেচনায়। যাতে দীর্ঘজীবীদের জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও শান্তিময়।




