রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘ক্যাশলেস সোসাইটি চাই, চাই পেপারলেস প্রশাসন’

মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

‘ক্যাশলেস সোসাইটি চাই, চাই পেপারলেস প্রশাসন’

বাংলাদেশকে আধুনিক, গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনছি। ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার উদ্যোগও এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন লেনদেন ও ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার মানুষের আর্থিক লেনদেনকে ধীরে ধীরে সহজ ও দ্রুত করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— অর্থনৈতিক লেনদেন ক্যাশলেস হলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কি একইভাবে আধুনিক হয়েছে?

যদি একজন নাগরিক অনলাইনে আবেদন করেন, অনলাইনে ফি দেন, কিন্তু তার আবেদন শেষ পর্যন্ত কাগজের ফাইলে পরিণত হয়ে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে থাকে, তাহলে সেটিকে পুরোপুরি ডিজিটাল প্রশাসন বলা যায় না। তাই ক্যাশলেস সোসাইটির পাশাপাশি বাংলাদেশকে এখন পেপারলেস প্রশাসনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

ফাইলের জটিলতায় আটকে যাচ্ছে প্রশাসনের গতি

আমাদের প্রশাসনে এখনো বহু ক্ষেত্রে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফাইল তৈরি হয়, এক কর্মকর্তার টেবিল থেকে অন্য কর্মকর্তার টেবিলে যায়, মতামত নেওয়া হয়, অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করে এবং কখনো কখনো একটি ছোট সিদ্ধান্তের জন্যও অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

এর ফলে শুধু সরকারি কাজের গতি কমে না, নাগরিকের সময় ও অর্থেরও অপচয় হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, নির্মাণ, সেবা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর মানুষের নির্ভরতা রয়েছে।

একটি ফাইল কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে কিংবা কখন নিষ্পত্তি হবে— এসব তথ্য জানতে নাগরিককে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করতে হয়। এখানেই তৈরি হয় অনিশ্চয়তা এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির সুযোগ।

ই-ফাইলিং হতে পারে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার

এই বাস্তবতা পরিবর্তনে ই-ফাইলিং ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি ফাইলের জন্ম থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া যদি ডিজিটাল করা যায়, তাহলে প্রশাসনের কাজের গতি অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

ই-ফাইলিং ব্যবস্থায় একটি ফাইল কখন তৈরি হয়েছে, কখন কোন কর্মকর্তার কাছে গেছে, কতক্ষণ সেখানে অবস্থান করেছে, কী মন্তব্য করা হয়েছে এবং কখন সিদ্ধান্ত হয়েছে— এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

অর্থাৎ ফাইল আর অদৃশ্য কোনো বস্তু থাকবে না। তার প্রতিটি ধাপের একটি ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে। এতে প্রশাসনের জবাবদিহিতা বাড়বে এবং কোনো ফাইল অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে তার কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে।
 
দুর্নীতির সুযোগও কমতে পারে

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে দুর্নীতির ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। যখন একটি আবেদন বা ফাইলের অবস্থান সম্পর্কে নাগরিকের কাছে স্পষ্ট তথ্য থাকে না, তখন কাজটি কত দিনে হওয়ার কথা এবং কেন বিলম্ব হচ্ছে— তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

ডিজিটাল ফাইলিং ব্যবস্থায় এই অস্বচ্ছতা অনেকটাই কমানো সম্ভব

প্রতিটি পদক্ষেপের ডিজিটাল অডিট ট্রেইল থাকলে কে কখন ফাইলটি গ্রহণ করেছেন, কখন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং কোথায় বিলম্ব হয়েছে—তা পরবর্তীতে যাচাই করা যাবে।

তবে ই-ফাইলিং চালু করলেই দুর্নীতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে— এমন দাবি করা ঠিক হবে না। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা, নিয়মিত অডিট, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

নাগরিকের হাতে দিতে হবে ফাইলের তথ্য

পেপারলেস প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার।

একজন নাগরিক অনলাইনে দেখতে পারবেন—

* তার আবেদন গ্রহণ হয়েছে কি না;
* বর্তমানে কোন দফতর বা কর্মকর্তার কাছে রয়েছে;
* কোনো অতিরিক্ত তথ্য বা নথি প্রয়োজন কি না;
* নির্ধারিত সময়সীমা কত;
* আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে কি না।

এমন ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি দপ্তরে বারবার গিয়ে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। একইসঙ্গে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতার সুযোগও কমতে পারে।

পেপারলেস মানে শুধু কাগজ বাদ দেওয়া নয়

পেপারলেস প্রশাসন বলতে শুধু কাগজের ফাইলকে স্ক্যান করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করাকে বোঝালে চলবে না। পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেই ডিজিটালভাবে পুনর্গঠন করতে হবে।

আবেদন, নথি যাচাই, মতামত, অনুমোদন, ডিজিটাল স্বাক্ষর, ফি প্রদান, সিদ্ধান্ত, নোটিশ এবং নথি সংরক্ষণ— সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

একই তথ্য যেন নাগরিককে বারবার দিতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একটি সরকারি দপ্তরের কাছে থাকা প্রয়োজনীয় তথ্য আইন ও নিরাপত্তার সীমার মধ্যে অন্য সংশ্লিষ্ট দফতর যাতে ব্যবহার করতে পারে, সেই আন্তঃদপ্তর তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

নির্ধারিত সময়ে সিদ্ধান্ত চাই

ই-ফাইলিংয়ের সঙ্গে প্রতিটি প্রশাসনিক কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। কোনো আবেদন সাত দিনে নিষ্পত্তিযোগ্য হলে তা অনির্দিষ্টকাল আটকে থাকার সুযোগ থাকা উচিত নয়। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা এবং প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এসকেলেশন হওয়া উচিত। এতে প্রশাসনে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি হবে—ফাইল কতক্ষণ আমার কাছে আছে’ নয়, ‘কাজটি কত দ্রুত শেষ করতে হবে’—সেটিই হবে মূল বিষয়।

প্রশাসন হবে তথ্যনির্ভর

পেপারলেস প্রশাসনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ। কোন দফতরে কত আবেদন জমা পড়ছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে, কোথায় বেশি বিলম্ব হচ্ছে এবং কোন ধরনের সেবায় নাগরিকের অভিযোগ বেশি— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

অর্থাৎ ই-ফাইলিং শুধু ফাইল ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যতে ডেটাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।

নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ

পেপারলেস প্রশাসন গড়তে গিয়ে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। সরকারি নথি, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল স্বাক্ষর, ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, ব্যাকআপ, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। কারণ কাগজের ফাইল হারানোর ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি ডিজিটাল নথির অননুমোদিত প্রবেশ বা পরিবর্তনের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এখনই জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দরকার

বাংলাদেশে পেপারলেস প্রশাসন বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমে মন্ত্রণালয় ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরে পূর্ণাঙ্গ ই-ফাইলিং নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

প্রতিটি দফতরের জন্য নির্ধারণ করতে হবে

কত শতাংশ কার্যক্রম ডিজিটাল হবে, কত সময়ের মধ্যে হবে এবং কে তার জন্য দায়ী থাকবেন। একইসঙ্গে কাগজের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ‘ডুয়াল সিস্টেম’ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে মূল ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে।

সরকারের প্রতিটি দফতরে যদি আলাদা আলাদা ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকে কিন্তু তারা পরস্পরের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করতে না পারে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তাই প্রয়োজন আন্তঃসংযুক্ত ও সমন্বিত সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো।

ক্যাশলেস সোসাইটির সঙ্গে পেপারলেস প্রশাসন

ক্যাশলেস সোসাইটি শুধু অর্থের লেনদেনের পরিবর্তন নয়; এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ। একইভাবে পেপারলেস প্রশাসন শুধু কাগজ কমানোর প্রকল্প নয়; এটি প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

আমরা যদি চাই নাগরিককে দ্রুত সেবা দিতে, বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে, সরকারি কাজে গতি আনতে এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়াতে—তাহলে কাগজনির্ভর দীর্ঘসূত্রতা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।

রাষ্ট্রের কাছে এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত— একটি ফাইল কতটি টেবিল ঘুরল, তা নয়; একটি সিদ্ধান্ত নিতে কত সময় লাগল। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক ও গতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে তাই আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত— ‘ক্যাশলেস সোসাইটি চাই, চাই পেপারলেস প্রশাসন’।

ক্যাশলেস অর্থনীতি মানুষের লেনদেনকে সহজ করবে, আর পেপারলেস প্রশাসন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে পারে। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব বাংলাদেশ।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর