বর্তমানে বাংলাদেশে যতগুলো সমস্যা রয়েছে, তার ভেতরে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে কিশোরদের ভয়াবহ অপরাধ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গা ছম ছম করা অন্ধকার জগতে অনুপ্রবেশ। আজকের শিশু আগামীকালের জাতির কর্ণধর। অথবা শিশু কিশোরদেরকেই একটি জাতির মেরুদণ্ড বলা যেতে পারে। কারণ প্রত্যেক জাতির শিশু-কিশোরাই ধীরে ধীরে পড়ালেখা করে বড় হয়ে সরকারি চাকরিজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দেশ সুরক্ষা সশস্ত্র বাহিনী, মন্ত্রী মিনিস্টার, এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত হয়ে থাকেন।
অতএব শিশু কিশোরদেরকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা পিতামাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। শিশুর সংজ্ঞা যেটা বলা হয়, আমাদের দেশে তা পরিবর্তন করা জরুরি। কারণ এখন ১২-১৩ বছরের শিশুও হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
আমাদের দেশ ছোট। কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি। এই স্বল্পায়তনের দেশে জনসংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার কারণে এর কুপ্রভাব সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষা-দীক্ষা, খাদ্য, পরিবেশগত, চিকিৎসা-স্বাস্থ্য, বাস্তুসংস্থানের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে জনসংখ্যার মারাত্মক কুপ্রভাব পরিলক্ষিত হয়। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে দরিদ্রতা, অভাব বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী।
এছাড়া প্রতিনিয়তই নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটছে জনসংখ্যাধিক্যির কারণে। ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বেশি। বস্তির সংখ্যা বেশি। ফলে অপরাধ প্রবণতা ও মারাত্মক রূপ লাভ করছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির অন্যতম কারণ হচ্ছে পতিত ফ্যাসিস্ট বাহিনী। তারা তাদের প্রভুদেশ ভারতে বসে গত ১৭ বছরের বাংলাদেশ থেকে যে সমস্ত টাকাপয়সা পাচার করেছে, সেই টাকার মাধ্যমে বাংলাদেশের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই নিয়ন্ত্রণের অন্যতম তুরুপের তাস হচ্ছে কিশোর গ্যাং। প্রত্যেকটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছে অনেক বড় বড় দাগী সন্ত্রাসী। আন্ডারগ্রাউন্ডের টপ-টেরর। মূলত এই টপ-টেরররা টাকা পাচ্ছেন ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে। তারপর সেই অর্থ চলে যাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে।
এখানে সুপরিকল্পিতভাবে মাদকের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে, যাতে কিশোর যুবকরা মাদকাসক্ত হলে তাদের টাকা প্রয়োজন হয়। সেই নেশার টাকা উপার্জন করতে গিয়ে তারা যেন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সেই অপরাধ বহুপদী। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন এসবই তারা করছে। এছাড়া মাদকের টাকা দেওয়ার নামে টপ-টেরররা কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করছে। কিশোর গ্যাংয়ের যারা নেতৃস্থানীয় তাদেরকে ডেকে নিয়ে আ. লীগের ভারতে বসে প্রদেয় টাকা স্থানীয় আন্ডারগ্রাউন্ডের সন্ত্রাসীরা অপরাধীদের হাতে দিচ্ছে এবং নেশাদ্রব্য সরবরাহ করছে। বিনিময়ে তাদের একটি কথা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতেই হবে। ফলে তারা ছিনতাই করতে মহোৎসবে নেমে পড়ছে।
আওয়ামী লীগের গডফাদারদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বেশ বৈজ্ঞানিক ও পদ্ধতিগত বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তারা আজ কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদেরকে টাকা পয়সা দিয়ে ছিনতাই করার জন্য পাঠায়। তখন সন্ত্রাসী ছিনতাইকারী দল মনে করে ছিনতাই করতে পারলে ডাবল লাভ, না পারলেও লাভ। ছিনতাই করতে না পারলেও গডফাদারদের কাছ থেকে যে টাকা পেয়েছে, সেটা তো থাকলই। আবার ছিনতাইয়ের টাকা যোগ করলে ডাবল লাভ। ছিনতাই করতে গিয়ে যদি ব্যর্থ হয়, অথবা পালিয়ে আসে তাতেও ক্ষতি নেই। কারণ তারা তো ছিনতাইয়ের পূর্বেই টাকা পেয়েছে। অর্থাৎ এই ধরনের অপকর্ম দুষ্কর্ম করার জন্য তারা প্রিপেইড। শিশু কিশোর তরুণেরা ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে না। তাদের দিকনির্দেশনা যারা দেবে তাদের উপরেই নির্ভর করে তাদের গতিপথ। সরকারি পর্যায়ে থেকে তাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনার প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেসব জায়গায় তারা যান না। বরং তারা নিজের এলাকার বড় ভাইদের মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ডে ও টপ-টেরর ও গডফাদারদের শরণাপন্ন হয়। এতে তারা ভালো না হয়ে বরং অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে।
সামনের দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের আরও বেশি ভয়াবহ পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ এখন দেশের গ্রাম গঞ্জ থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত সর্বত্র নেশাদ্রব্য বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নেশাদ্রব্য অনেক ক্ষেত্রে বিনা পয়সায় বিতরণ করছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা। এ জাতিকে নেশাসক্ত করতে পারলেই তরুণ কিশোরদের নেশাসক্ত করতে পারলেই তাদের দিয়ে খুন ধর্ষণ করানো সহজ হবে। কারণ আমাদের দেশের শিশুর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ১৮ বছর বয়সের নিচে যারা রয়েছে তারা সকলেই শিশু। বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ও অধিকারের মূল ভিত্তি হলো শিশু আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ২৪ নং আইন), যা পুরানো ১৯৭৪ সালের শিশু আইন রহিত করে প্রণয়ন করা হয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-অনুযায়ী, শিশুর সংজ্ঞা: এই আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি যেকোনো ব্যক্তিকে ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সুতরাং, ১৭ বছর বয়স যার, এমনকি ১৭ বছর ৬ মাস যার বয়স, সেও যদি ধর্ষণ করে বা খুন করে তাহলে সেটাকে শিশু অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। আওয়ামী লীগ ও তাদের সন্ত্রাসী গডফাদাররা এই সুযোগটাই গ্রহণ করছে। কার্যত বয়সে ফাঁকি দেওয়া এই সমস্ত এডাল্ট কিশোররাই সারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরম অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
শীতপ্রধান দেশে বয়ঃপ্রাপ্তি হতে ১৫-১৬ বা ১৭-১৮ বছর প্রয়োজন হয়। এই কারণে তাদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ১০-১২ বছর বয়সেই শিশুরা কিশোর কিশোরীতে পরিণত হয়ে যায়। তারা তখন সন্তান জন্মদান করার মতো বয়সে উপনীত হয়ে যায়। সুতরাং তাদেরকে তখন আর যাই হোক শিশু বলা যায় না। হরমোনাল কারণে তাদের ভেতরে এক ধরনের ম্যাচিউরিটি চলে আসে। যে কারণে আমাদের দেশের কিশোরদের অপরাধের ধরন বড় মানুষের মতো। বয়স্ক মানুষের মতো অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক।
এই সমস্ত কারণে কিশোর গ্যাং সারা বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্টে অক্টোপাসের মতো ধরে আছে। তারা স্কুল কলেজে পড়ালেখা করতে যায় না। গেলেও সেখানে মারামারি করে, বাজারঘাট দোকানপাটে যত্রতত্র মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে। দেশীয় অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র তারা ব্যবহার করছে। শহরে বিভিন্ন প্রকল্প দখল, নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া, মারণাস্ত্র প্রদর্শন করা, চাঁদাবাজি করা, চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া, অথবা সন্তানকে অপহরণের ভয় দেখানো, বা ধর্ষণ করার মতো বড় বড় বেপরোয়া ঘটনা তাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংয়ের সকলকে তো গুলি করে হত্যা করাও সমীচীন নয়। কারণ তাদেরকে ভালো ও সঠিক পথে আনার জন্য মোটিভেশনাল কাজ করে দেশের কল্যাণের মূল স্রোতে ফেরত আনতে হবে। এর জন্য দুটি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। মোটিভেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করা আর একদিকে আইনের নিরপেক্ষ এবং সঠিক প্রয়োগ করা। যেসব অপরাধপ্রবণ শিশু-কিশোর স্কুল কলেজে যায় না, তাদের পিতা-মাতাকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের বলতে হবে, আপনাদের সন্তান খারাপ পথে গেলেই থানাকে যেন তারা অবগত করে। যদি তারা অবহিত না করে, তাহলে এই অপরাধকে তারা প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হবে।
এলাকায় সরকার এবং বিরোধী দল কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। যে সমস্ত এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত রয়েছে, সেসব এলাকায় গ্রাম ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করা। সামাজিকভাবে শাস্তি বিধান করা। আইনের হাতে তুলে দেওয়া এবং স্থানীয় সামাজিক বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল কিশোর-কিশোরীকে স্কুল বা কলেজে বা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা বাধ্যতামূলক করা। শিশু আইনকে পরিমার্জন করা এবং ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বলে সংজ্ঞায়িত করা। কিশোর গ্যাংয়ের উৎস মূল খুঁজে বের করা এবং সেই উৎস মূলকে উৎপাটন করা ।
মাদক নির্মূলে জয়েন্ট কমিশন গঠন করা। যে কমিশনের প্রধান একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হতে পারেন। তার অধীনে পুলিশ, এসআরবি, ডিবি, এসবি এবং মাদকদ্রব্য অধিদফতরের কর্মকর্তা থাকবেন। গ্রামগঞ্জ ও শহরের প্রত্যেকটি জায়গা পর্যবেক্ষণের মধ্যে নিয়ে আসা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। প্রত্যেকটি দলের উচিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নির্বাচন পর্যন্ত নেতা-নেত্রী বাছাইয়ের জন্য ডোপ টেস্ট করা এবং ডোপ টেস্টে উত্তীর্ণ না হলে তাদের মনোনয়ন না দেওয়া। বাংলাদেশের সকল মসজিদ থেকে একযোগে খতিবগণ মাদকের ভয়াবহতা, কিশোর গ্যাং ও আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য যারা দায়ী, তাদের ব্যাপারে নিয়মিত খুতবা দেবেন। মানুষকে সচেতন করবেন এবং সামাজিকভাবে এগুলো নির্মূলের জন্য নেতৃত্ব দেবেন।
সর্বোপরি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিশোর গ্যাং ও মাদকের ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য যারা দায়ী তাদের ব্যাপারে যে গোয়েন্দা সংস্থা কঠোরভাবে কাজ করছে এবং তার উপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হবে, সে বিষয়টি বারবার প্রচার করা।
একইসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যিনি দায়িত্ব রয়েছেন, সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য দৃশ্যমান বড় বড় কাজগুলোর প্রশংসা করবেন এবং পুরস্কৃত করবেন। এতে আইনশৃঙ্খলা সংস্থার বাহিনী আরও অনুপ্রাণিত হবে এবং কঠোরভাবে কাজ করবে।
আসুন আমরা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে কিশোর গ্যাং ও মাদক নির্মূলে সহযোগিতা করি। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
লেখক: কবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক




