শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় হতে হবে

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ এএম

শেয়ার করুন:

অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় হতে হবে

বিশ্ব এখন এক গুরুতর অস্থির সময় অতিক্রম করছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মানবিক বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি,  আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক ইত্যাদি বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠছে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ কি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে?

জাতিসংঘের বিকল্প কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এখনো গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর ১৯৪৫ সালে যে আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা। আজ আট দশক পরও সেই লক্ষ্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বরং বর্তমান বিশ্বের নানামুখী অস্থিরতা ও জটিলতা জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলেছে।

২০২৬ সালের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এই বাস্তবতার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”—জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব উদ্বোধনী বক্তব্যে সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে এবং যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি। তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে শক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সংলাপ ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

জাতিসংঘের ভূমিকা শুধু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শান্তিরক্ষী পাঠানো বা মানবিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সংঘাতের কারণ চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা উচিৎ।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, শান্তিরক্ষা মূলত একটি রাজনৈতিক উপকরণ; এটি রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—যেখানে শান্তি নেই, সেখানে শুধু শান্তিরক্ষী দিয়ে শান্তি টিকিয়ে রাখা যায় না; শান্তির পথে যেতে হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

অতএব, জাতিসংঘের কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অতীতের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। সংঘাতের আগেই মধ্যস্থতা, আলোচনার উদ্যোগ, তথ্য-অনুসন্ধান, আস্থা তৈরির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষ দূত নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক আইন।
কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এক নীতি এবং দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অন্য নীতি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি ক্রমেই আস্থার সংকট তৈরি করছে।

তাই জাতিসংঘের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। তারই ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিনের গাজা, ইউক্রেন, ইরান, মায়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় উঠে এসেছে।
এ কথা বলাই বাহুল্য, আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তার প্রয়োগ হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নীতিনিষ্ঠ ও বৈষম্যহীন।

জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের বিদ্যমান কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান অঙ্গ। এর ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য ভেটো ক্ষমতা রাখে। এই কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অনেক সদস্য রাষ্ট্র মনে করে।

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধ চায় না। তারা নিরাপদ জীবন, উন্নয়ন, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার চায়।
যে কোনো যুদ্ধের সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। বিশেষত নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষকে যুদ্ধের নির্মমতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শিকার হতে হয়। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, মানুষ উদ্বাস্তু হয় এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা জাতিসংঘের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

মানবিক সহায়তার মাধ্যমে যেন আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায়—এসব বিষয়ে জাতিসংঘকে আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অমানবিক আচরণ এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সামরিক সমাধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ এসব সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

জাতিসংঘ মহাসচিব ৮১ তম সাধারণ পরিষদে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের জন্য সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন এবং গাজা ও বৃহত্তর অঞ্চলে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এখানে জাতিসংঘের ভূমিকা হতে পারে পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসানো, যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি করা এবং মানবিক সহায়তার পথ উন্মুক্ত করা। এসব উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

জাতিসংঘকে ভবিষ্যতে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে preventive diplomacy বা প্রতিরোধমূলক কূটনীতিকে।
কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট যখন সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়, তখন তা শুধু ওই দেশের সমস্যা থাকে না। শরণার্থী সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্র পাচার, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মাধ্যমে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

তাই সংকট ছোট থাকতেই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া, জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন, বিশেষ দূত, আঞ্চলিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী আগাম সতর্কতা ও মধ্যস্থতা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তার বৈশ্বিক বৈধতা ও বহুপাক্ষিক চরিত্র। বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্র একই টেবিলে বসে কথা বলার সুযোগ পায়।
কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি গুরুত্বপূর্ণ সংকটে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে মানুষের আস্থা কমতে পারে। ফলে জাতিসংঘকে শুধু নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করলেই হবে না; সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশনের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার, কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। তাই বিশ্বশান্তির প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু নীতিগত নয়, বাস্তবতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘের সংস্কার, শান্তিরক্ষা, সংঘাত প্রতিরোধ, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগের পক্ষে ধারাবাহিক ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করা।

বর্তমান পৃথিবীতে কোনো দেশই একা নিরাপদ নয়। একটি অঞ্চলের যুদ্ধ অন্য অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য, অভিবাসন, জলবায়ু ও প্রযুক্তি—সবকিছুই এখন আন্তঃসম্পর্কিত। তাই বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা স্বীকার করে সহযোগিতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

জাতিসংঘকে সেই সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তবে এর জন্য শুধু জাতিসংঘের সংস্কার যথেষ্ট নয়; সদস্যরাষ্ট্রগুলোকেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তাদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার পথে অচলাবস্থা তৈরি না করে, সে বিষয়ে তাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

আজ বিশ্বে শান্তির প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তাই জাতিসংঘকে শুধু সভা, বিবৃতি ও প্রস্তাবের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়—সংঘাত প্রতিরোধ, সংলাপের আয়োজন, মানবিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জাতিসংঘকে বিশ্বশান্তির জন্য আরও সক্রিয়, নিরপেক্ষ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতেই হবে। কারণ শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার জন্য জাতিসংঘের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি—বরং আজ তার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।

এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর