সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ধর্ম নিয়ে জাতির সঙ্গে জামায়াতের মশকরা

মেশকাত সাদিক 
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ধর্ম নিয়ে জাতির সঙ্গে জামায়াতের মশকরা

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইতিহাসের বিভিন্ন ক্রান্তিকাল পার করেছে দলটি। তবুও তারা যে নামে বিরোধীতা করেছিল, সেই নামটি পরিবর্তন করেনি। পরিবর্তন না করার পেছনে এক কোটি কারণ থাকতে পারে। তবে পরিবর্তন করা উচিত ছিল একটি কারণে। সেটি হলো, একটি দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা। 

দলটি বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে আসি ইসলাম প্রসঙ্গে। 

বাংলাদেশের কওমি ঘরানোর অধিকাংশ আলেম মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী বস্তুত কখনোই সহীহ আলেম দ্বারা পরিচালিত দল ছিল না। অথবা, জামায়াতের আকিদাগত সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা মনে করতো না। কারণ, আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এই দলটিতে যোগদান করার পর আশির দশকের পর থেকে এই দলটি ইসলামভিত্তিক দলে রূপান্তরিত হতে থাকে। 

এর আগেও তারা ইসলামের বিষয়গুলো নিয়েই রাজনীতি করতো। তবে তা যতটা ধর্মভিত্তিক ছিল, তার থেকে ধর্ম দ্বারা পরিচালিত ছিল বেশি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যদি কখনো কোনো অবদান থেকে থাকে বা গর্ব করার বিষয় থেকে থাকে, তবে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বজনগ্রাহ্য অসীম জনপ্রিয় অবিসংবাদিত আলেম আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। যার দাওয়াতে বা যার কারণে তিনি জামায়াতে যোগদান করেছিলেন, তিনিই নিঃসন্দেহে বড় মাপের দার্শনিক। 

বাস্তবতা হলো, আল্লামা সাঈদীর আদর্শ, তার চলন-বলন, ইসলামে তার খেদমত, ইসলামের সহীহ-শুদ্ধ ব্যাখ্যা, দ্বীন প্রচার এবং সমগ্র বিশ্বে ইসলামকে অনিন্দ্যরূপে প্রকাশ-প্রচার তারই অবদান। যার সমস্ত ভাবমূর্তি ও অবদানকে নিয়ে এই দলটি আশির দশকে ঘুরে দাঁড়ায়। 

আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ মাহফিল শুনে শিবির নামক সংগঠনটি ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে সৎ চরিত্র নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। তরুণ যুবকের মাঝে ইসলামের এই বুনিয়াদি শক্তি সত্যিকার অর্থেই মানুষকে মানবিক করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ধীরে ধীরে অনেক মন্দ মানুষও সরাসরি অথবা ক্যাসেটে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ শুনে ও বুঝে ইসলামের প্রতি দয়াদ্র হতে থাকে। অনেক নাস্তিকও সাঈদীর ওয়াজ শুনে আস্তিক হয়ে যায়। অনেক অমুসলিমও মুসলিম হয়ে যায়। 

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আল্লামা সাঈদীর আদর্শ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাই আল্লামা সাঈদী আর বর্তমান জামায়াতে ইসলামী এক নয়। বর্তমান জামায়াতে ইসলামী ধর্মটাকে শতভাগ না হলেও সিংহভাগ ভোটের মাঠের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। ইসলামী লেবাস-পোশাক থাকলে এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করে বেশি। অনেক সময় ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। তারই সুযোগ গ্রহণ করছে এই দলটি। 

এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে যে নারী এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না, মাথায় কাপড়ও দেয় না, সেই নারী মাথায় টুপিওয়ালা হুজুর এলেই মাথায় কাপড়টা টেনে দেন। যে ছেলেটি খিস্তি খেওড় ছাড়া কথা বলে না, যে মানুষটি নিষিদ্ধ পানশালায় যায়, সেই মানুষটিও মাদরাসার হুজুর দেখলে একটা সালাম ঠুকে রাস্তার সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়। এই সুযোগটাই বর্তমান জামায়াতে ইসলামী নিচ্ছে। 

প্রথমত হলো, দেশের প্রধান ইসলামী দল হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করার কথা, তা করার যোগ্যতা-দক্ষতা কোনোটাই এদের নাই। এদের অধিকাংশই সংসদ সদস্য, সংবিধান কী তা জানেন না। কেউ কেউ জানলেও বোঝেন না। সত্যিকার অর্থে বর্তমান বিশ্বের চাহিদা মোতাবেক সমালোচনামূলক বক্তব্য, গঠনমূলক বক্তব্য, সরকারকে ব্যস্ত রাখার মতো বক্তব্য দেওয়ার কোনো সক্ষমতা এদের নেই। যে কারণে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

অন্যান্য সাধারণ দলের মতোই তারাও চাঁদাবাজি-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। নারীলিপ্সাতে তারা এখন ব্যাপকভাবে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। অবশ্যই এর জন্য শুধু জামায়াত দায়ী না। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে পর্যায়ে নেমে গেছে, তাতে সরকারের উপরেও মানুষ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। 

একটা হলো চেষ্টা করে বিফল হওয়া, আরেকটা হলো চেষ্টা না করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, রাহাজানি, খুন-খারাবি- এগুলো বন্ধে সেরকম শক্তিশালী উদ্যোগে দেখা যাচ্ছে না। ফলে এসব অত্যন্ত বস্তনিষ্ঠ কারণে আওয়ামী লীগ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। মানুষ যখন বিরক্ত হয়ে ওঠে, মানুষের মনে যখন উদ্বেগ থাকে, বাইরে বের হলে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে কি না, এমন উদ্বেগ- তখন বিএনপি বা জামায়াত কর্মীরাও চুপ থাকে না। আর বিরোধীরা তখন প্রচন্ড রকম সক্রিয় হয় সরকারের বিরোধিতায়। এমনই একটি অনুকূল অবস্থা আওয়ামী লীগের দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ও নতুনভাবে উত্থানের প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হবে। 

জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলাম মেয়েলি কাণ্ডে দলটিকে ডুবিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি নিহত হলো। হত্যা না আত্মহত্যা এখনই বলা সমীচীন নয়। তবে যেটিই ঘটুক না কেন, গাজী নজরুল ইসলাম দায় এড়াতে পারেন না। অথচ এই সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করার পরে জাতিকে সচেতন এবং সতর্ক করার বিষয়ে জামায়াত কোনো সাংবাদিক সম্মেলন করে বিস্তৃতভাবে কিছু জানায়নি। এটা কি শান্তির ধর্ম ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? 

সারাদেশের এতিমখানা, মসজিদ, মাদরাসা, বিভিন্ন জায়গায় বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে। বললেই অনেকেই বলে এগুলো অপপ্রচার। যেহেতু দেশের সব থেকে বড় রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং এখন প্রধান বিরোধী দলের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছে। সুতরাং তাদের দায়িত্ব ছিল, যেসব জায়গায় এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, সে জায়গাগুলো অনুসন্ধান করা, তদন্ত করা এবং জাতিকে জানানো। এসব কিছু না করে সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চ করে বেড়াচ্ছে। 

লংমার্চ করে জাতির কী হাসিল হবে? মানুষ যে না খেয়ে থাকছে, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নাই দেশে, এগুলোর কোনো উন্নতি হবে? এসবের কিছুই হবে না। এর থেকে বরং তারা যদি সংসদে আল্লামা সাঈদীর মতো ১০ জন সংসদ সদস্য নিতে পারতো, তাহলেই বরং জাতির উপকার হতো। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ভবিষ্যতে অনেক ধার্মিক মানুষ আর জামায়াত ইসলামী করবে না। এমনিতেই অনেক বিচক্ষণ উচ্চশিক্ষিত মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা ওপরে এই দলটির নাম পরিবর্তন না করার কারণে তাদের উপরে চরমভাবে ক্ষুব্ধ। 

এর পরও তারা মনে করে, ইসলাম ধর্মকে সামনে রেখেই রাজনীতি করে যাবে। অদূর ভবিষ্যতে তা আর হয়তো সম্ভব হবে না। কারণ, ধীরে ধীরে আল্লামা সাঈদীর স্মৃতিও যুবক তরুণের হৃদয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সে ধরনের ওয়াজ মাহফিলও আর হয় না। ওয়াজ মাহফিল যা হয়, তার মধ্যে আমির হামজা সাহেবরা, সেখানে ফায়সা কথাই বলেন বেশি। মানুষ এসবের উপরে বড়ই ক্ষুব্ধ। 

জানি না প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হলে দেশের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কী হবে! তবে যুবক-তরুণদের উচিত, নতুন প্লাটফর্মে নতুন ইসলামিক দল খোলা। দলের নাম এমন হতে পারে- বাংলাদেশ প্রগ্রেসিভ ইসলামিক পার্টি (বিপিআইপি) বা বাংলাদেশ ইসলামিক ডেমেক্রেটিক পার্টি (বিআইডিপি) অথবা, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ ইনসাফ পার্টি (বিআইপি)। এ রকম অনেক নাম হতে পারে। কারণ, আগামীতে নতুন প্রজন্ম পুরনো বন্দোবস্ত একেবারেই মানবে না।

লেখক: কবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর