ইন্টারনেটকে একসময় বলা হতো তথ্যের মহাসড়ক। এখন এটি শুধু তথ্যের মহাসড়ক নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনোদন, যোগাযোগ, সরকারি সেবা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইন্টারনেটকে শুধু ব্যবসায়িক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিন্তু এই ইন্টারনেটের বিশাল জগতের একটি অন্ধকার দিকও তৈরি হয়েছে। অনলাইন জুয়া, বেটিং, পর্নোগ্রাফি, ফিশিং, প্রযুক্তি স্ক্যাম, ভুয়া বিনিয়োগ, পরিচয় চুরি, ম্যালওয়্যার, সাইবার প্রতারণা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সামনে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—চীন যদি তার জাতীয় ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন তার নাগরিকদের ক্ষতিকর ও অপরাধমূলক অনলাইন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষিত রাখতে আরও কার্যকর ও আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে চীনের ‘Great Firewall’ হুবহু অনুসরণ করতে হবে—এমন কথা বলা হচ্ছে না। চীনের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সামাজিক কাঠামো বাংলাদেশের সঙ্গে এক নয়। বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।
কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি, ফিশিং, আর্থিক প্রতারণা কিংবা সাইবার অপরাধকে এক করে দেখারও কোনো সুযোগ নেই।
চীন কীভাবে পারছে?
চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী জাতীয় ফিল্টারিং ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সহজে ব্যবহারযোগ্য Facebook, YouTube, Google-এর মতো অনেক বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম চীনের মূলধারার ইন্টারনেট ব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশযোগ্য নয়। DNS filtering, IP blocking, URL filtering, ট্রাফিক পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করে সেখানে ইন্টারনেট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
চীনের এই ব্যবস্থা নিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং তথ্যপ্রবাহের প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্ক রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এটি কোনোভাবেই সরাসরি অনুসরণযোগ্য মডেল নয়।
তবে চীন একটি বিষয় প্রমাণ করেছে—একটি রাষ্ট্র চাইলে তার ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই হওয়া উচিত—আমরা কেন সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি না?
আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়?
লাদেশে অনলাইন জুয়া এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। অনলাইন জুয়া, বেটিং এবং সংশ্লিষ্ট প্রচারণা বন্ধে রাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগও নিয়েছে। বিটিআরসিও অনলাইন জুয়া, বেটিং এবং পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একটি ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একই ধরনের নতুন ডোমেইন চালু হয়ে যায়। একটি লিংক বন্ধ হলে আরেকটি লিংক তৈরি হয়। একটি অ্যাপ সরানো হলে অন্য নামে নতুন অ্যাপ আসে। এভাবে শুধু ওয়েবসাইট ব্লক করে অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধের পুরো নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করা।
কোন ডোমেইন থেকে মানুষকে জুয়ার ওয়েবসাইটে নেওয়া হচ্ছে? কোন বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার হচ্ছে? কোন পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা যাচ্ছে? কোন মোবাইল নম্বর বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে? কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রচারণা করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে শুধু একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করে খুব বেশি লাভ হবে না।
অনলাইন জুয়া এখন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা
অনলাইন জুয়া এখন আর কয়েকটি ওয়েবসাইটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, অ্যাফিলিয়েট লিংক, বিভিন্ন অ্যাপ, ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম বা মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম—সবকিছু ব্যবহার করে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি ভয়ংকর।
একজন তরুণ মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি বেটিং অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। তারপর মোবাইল ব্যাংকিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে—যে রাষ্ট্র মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট লেনদেন শনাক্ত করতে পারে, সেই রাষ্ট্র কি জুয়ার অর্থপ্রবাহ শনাক্ত করতে পারবে না? অবশ্যই পারবে—যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকে।
শুধু বিটিআরসির ওপর দায়িত্ব চাপালে হবে না
অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু বিটিআরসির একার দায়িত্ব হতে পারে না। বিটিআরসি, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ISP এবং IIG—সব পক্ষকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
ধরা যাক, বিটিআরসি একটি জুয়ার সাইট শনাক্ত করে। শুধু সাইট বন্ধ করার নির্দেশ দিলেই কাজ শেষ নয়। একই সময়ে অর্থ লেনদেনের চ্যানেল শনাক্ত করতে হবে, বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ প্রয়োজন— Block + Track + Trace + Enforce. শুধু Block করলে অপরাধী নতুন ঠিকানায় চলে যাবে।
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণেও নতুন চিন্তা প্রয়োজন
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু হাজার হাজার নতুন ওয়েবসাইট তৈরি হওয়া ঠেকানো কঠিন। তাই প্রয়োজন automated content intelligence।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, machine learning, domain intelligence এবং threat intelligence ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইটের ধরন শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট, অবৈধ পর্নোগ্রাফি এবং মানবপাচার বা শোষণের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে এখানে একটি বড় সতর্কতা রয়েছে। কনটেন্ট ফিল্টারিংয়ের নামে বৈধ কনটেন্ট বন্ধ করা যাবে না।
অপতথ্য আর ভিন্নমত এক নয়
দেশের বিরুদ্ধে অপতথ্য, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা নিঃসন্দেহে একটি সমস্যা। কিন্তু এর সমাধান করতে গিয়ে যদি সরকারের সমালোচনাকে অপতথ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে সেটি হবে আরও বড় বিপদ। সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। ভিন্নমত অপরাধ নয়। একটি সংবাদ সরকারের পছন্দ না হলেই সেটিকে ব্লক করা যাবে না। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, আর্থিক প্রতারণা বা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করার চেষ্টা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সীমারেখা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন যাচাই, স্বচ্ছ নীতিমালা, কারণ দর্শানোর সুযোগ এবং আপিলের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রযুক্তি স্ক্যাম সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা হুমকি
অনলাইন জুয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বড় বিপদ হলো প্রযুক্তি স্ক্যাম। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, ভুয়া বিনিয়োগ, ফিশিং, OTP প্রতারণা, ভুয়া ব্যাংকিং ওয়েবসাইট, ই-কমার্স প্রতারণা, ক্রিপ্টোকারেন্সির নামে প্রতারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও কণ্ঠস্বর—সবকিছু মিলিয়ে সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
একজন প্রতারক বিদেশে বসে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ করতে পারে। একটি ডোমেইন বিদেশি সার্ভারে থাকতে পারে। বিজ্ঞাপন আসতে পারে অন্য দেশ থেকে। টাকা যেতে পারে অন্য একটি অ্যাকাউন্টে। তাহলে শুধু স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই অপরাধ মোকাবিলা করা কঠিন। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী threat intelligence system।
বাংলাদেশে কি জাতীয় ডিজিটাল কনটেন্ট সেফটি সেন্টার হতে পারে?
আমাদের দেশে একটি সমন্বিত **National Digital Content Safety and Threat Intelligence Centre** গঠন করা যেতে পারে।

এই কেন্দ্রের কাজ হবে ক্ষতিকর কনটেন্ট সেন্সর করা নয়; বরং আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে ডিজিটাল অপরাধ শনাক্ত, শ্রেণিবদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠানো। এখানে কয়েকটি স্তর থাকতে পারে।
প্রথমত, automated domain monitoring।
দ্বিতীয়ত, online gambling ও phishing database।
তৃতীয়ত, malicious IP ও domain intelligence।
চতুর্থত, payment fraud intelligence।
পঞ্চমত, social media threat monitoring।
ষষ্ঠত, citizen complaint ও rapid response mechanism।
সপ্তমত, ভুলভাবে ব্লক হওয়া কনটেন্ট পুনর্বিবেচনার স্বাধীন ব্যবস্থা।
এর ফলে কোনো ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল সেবাকে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে বন্ধ করার ঝুঁকি কমবে।
কেন শুধু ‘ব্লক’ যথেষ্ট নয়?
ইন্টারনেটে একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই সেটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় না। অপরাধীরা domain পরিবর্তন করে। IP পরিবর্তন করে। mirror site তৈরি করে। নতুন অ্যাপ তৈরি করে। VPN ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নতুন লিংক ছড়িয়ে দেয়। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হতে হবে dynamic। আজ যে সাইটটি ক্ষতিকর, আগামীকাল সেটি অন্য নামে আসতে পারে। আবার আজ যে ওয়েবসাইট বৈধ, ভবিষ্যতে সেটি ক্ষতিকর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। সুতরাং তালিকা একবার তৈরি করে রেখে দিলে হবে না। সেটিকে নিয়মিত আপডেট করতে হবে।
জবাবদিহিও জরুরি
রাষ্ট্র যদি বলে হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়েছে, তাহলে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে—কী ধরনের ওয়েবসাইট বন্ধ হয়েছে, কতগুলো পুনরায় ফিরে এসেছে এবং ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে।
প্রতিবছর একটি Digital Safety Transparency Report প্রকাশ করা যেতে পারে।
সেখানে থাকতে পারে—
* অনলাইন জুয়া সাইট শনাক্ত ও বন্ধের সংখ্যা;
* ফিশিং ও স্ক্যাম ডোমেইনের সংখ্যা;
* পর্নোগ্রাফিক ও শিশু-ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা;
* সাইবার প্রতারণার অভিযোগ;
* ভুলভাবে ব্লক হওয়া সাইটের সংখ্যা;
* পুনর্বিবেচনার পর খুলে দেওয়া সাইটের সংখ্যা;
* আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত পেমেন্ট চ্যানেল বন্ধের তথ্য।
এতে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে।
‘Great Firewall’ নয়, প্রয়োজন ‘Great Digital Safety’
বাংলাদেশের জন্য চীনের Great Firewall গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি মডেল যেখানে ইন্টারনেট থাকবে মুক্ত, কিন্তু অপরাধের জন্য থাকবে কঠিন।
একদিকে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা, পর্নোগ্রাফি, ফিশিং, ম্যালওয়্যার এবং সংগঠিত ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে বাংলাদেশের আসল চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করতে থাকি, অপরাধী নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করবে। আমরা যদি শুধু অ্যাপ বন্ধ করি, নতুন অ্যাপ আসবে। আমরা যদি শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করি, নতুন অপরাধী তৈরি হবে। কিন্তু যদি পুরো ডিজিটাল অপরাধের ecosystem শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
শেষ কথা, ইন্টারনেট বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। আবার অপরাধীদের জন্য ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে দেওয়াও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ।
চীন দেখিয়েছে, রাষ্ট্র চাইলে ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশকে চীনের রাজনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে হবে না; কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের জায়গায় আমাদের পিছিয়ে থাকারও কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে—
অপরাধী ওয়েবসাইট দ্রুত শনাক্ত হবে, অবৈধ জুয়ার অর্থপ্রবাহ থামবে, প্রযুক্তি স্ক্যামারের নেটওয়ার্ক ধরা পড়বে, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ হবে, অপতথ্য যাচাই হবে, কিন্তু নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
কারণ ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কত দ্রুত ইন্টারনেট দিতে পারে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে—সেটিই হবে আগামী দিনের বড় মাপকাঠি। সুতরাং এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—বাংলাদেশ কি চীনের মতো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
প্রশ্ন হওয়া উচিত— বাংলাদেশ কি তার নাগরিকদের জন্য এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, যেখানে ইন্টারনেট থাকবে মুক্ত, কিন্তু অপরাধের জন্য থাকবে কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন




